করোনায় আক্রান্ত মায়ের বুকের দুধের মাধ্যমে শিশু সংক্রমিত হয় না।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের স্ত্রীরোগ ও প্রসূতি বিভাগের চিকিৎসক জাকিয়া আক্তার তিনবার কোভিডে আক্রান্ত হয়েছেন। প্রথমবার গত বছরের ১৮ এপ্রিল অন্তঃসত্ত্বা এক নারীর অস্ত্রোপচারের পাঁচ দিন পর তিনিসহ তিন চিকিৎসক আক্রান্ত হন। এ বছর জানুয়ারি ও মে মাসেও আক্রান্ত হন তিনি। প্রথমবার আক্রান্তের সময় তাঁর দ্বিতীয় সন্তানের বয়স ছিল আট মাস। তিনি সন্তানকে চার দিন বুকের দুধ পান করানো থেকে বিরত ছিলেন।
জাকিয়া আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, শুরুর দিকে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বেশি কাজ করেছে সবার মধ্যে। তাঁরও ছিল। অন্য খাবারও খেতে পারত বলে সংক্রমণের প্রথম চার দিন তিনি সন্তানকে বুকের দুধ পান করাননি। পঞ্চম দিনে মাস্ক পরে দুধ পান করিয়েছেন। পরে তাঁরা নিশ্চিত হয়েছেন, করোনায় আক্রান্ত মায়ের বুকের দুধের মাধ্যমে শিশু সংক্রমিত হয় না।
নুসরাত জাহান নামের এক মা প্রথম আলোকে বলেন, গত ৫ জুলাই তাঁর সন্তান জন্ম নেয়। এক সপ্তাহ পর তিনি কোভিড পজিটিভ হোন। এখন সুস্থতার দিকে। তবে চিকিৎসকের পরামর্শে স্বাস্থ্যবিধি মেনে তিনি সন্তানকে বুকের দুধ পান করাচ্ছেন।
দেশের চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদেরা জানিয়েছেন, করোনায় আক্রান্ত মায়ের দুধ সন্তানকে খাওয়ানো যাবে। সে ক্ষেত্রে মায়ের সেবাদানকারী বা পরিবারের সদস্যদের কেউ দুধ চেপে বা গেলে কাচের বাটিতে নিয়ে সংরক্ষণ করতে পারেন।
গতকাল রোববার থেকে বিশ্বব্যাপী বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ শুরু হয়েছে। তবে আমাদের দেশে আজ সোমবার থেকে বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহের কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। আজ এর উদ্বোধর করবেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। এবারের প্রতিপাদ্য ‘মাতৃদুগ্ধ দানের সুরক্ষা: আমাদের সমন্বিত দায়িত্ব।’
রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা ফজিলাতুন নেছা গত ২৩ জুলাই কন্যাসন্তানের জন্ম দেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, তিনি সন্তানকে বুকের দুধ পান করাচ্ছেন। তবে করোনাকাল হওয়ায় সন্তান নিয়ে তাঁর উদ্বেগ কাজ করে।
হাত ধুয়ে, পরিচ্ছন্ন হয়ে ও মাস্ক পরে কোভিডে আক্রান্ত মা সন্তানকে বুকের দুধ পান করাতে পারেন। এমনকি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন মায়ের দুধও পান করানো যাবে।ফাতেমা আক্তার, কর্মসূচি ব্যবস্থাপক, জাতীয় পুষ্টিসেবা
গত বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে এ বছরের জুলাই মাস পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্রেস্টফিডিং ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রে সরাসরি ও অনলাইনে ৪১৮ জন দুগ্ধদানকারী মা নানা সমস্যার সমাধান চাইতে যোগাযোগ করেছেন। সংস্থার পরিচালক পুষ্টিবিদ খুরশীদ জাহান প্রথম আলোকে বলেন, ‘দেশে করোনার সংক্রমণ শুরুর প্রথম দুই মাস আমরাও বুঝতে পারছিলাম না, কোভিডে আক্রান্ত মায়েদের দুধ খাওয়ানোর পরামর্শ দেওয়া যায় কি না।’
জাতীয় পুষ্টিসেবার কর্মসূচি ব্যবস্থাপক ফাতেমা আক্তার বলেন, হাত ধুয়ে, পরিচ্ছন্ন হয়ে ও মাস্ক পরে কোভিডে আক্রান্ত মা সন্তানকে বুকের দুধ পান করাতে পারেন। এমনকি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন মায়ের দুধও পান করানো যাবে। দুধ পান করাচ্ছেন, এমন মায়েরা করোনার টিকাও নিতে পারবেন।
আইসিইউতে থাকা মায়েদের অবস্থা স্থিতিশীল থাকলে এবং মায়ের জ্ঞান থাকলে দুধ খাওয়ানো সম্ভব বলে প্রথম আলোকে জানিয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গাইনি কোভিড ইউনিটের চিকিৎসক ফারজানা মাহমুদ। এ সপ্তাহে গাইনি কোভিড ইউনিটে সন্তান জন্ম দেওয়া আট মা চিকিৎসাধীন। তাঁদের মধ্যে চারজন আইসিইউতে। হাসপাতালের পরামর্শক তামান্না রহমান বলেন, চারজনের অবস্থা গুরুতর। ফলে বাধ্য হয়ে ফর্মুলা দুধ কাচের বাটিতে করে চামচ দিয়ে পান করানোর পরামর্শ দিয়েছেন। তবে অন্য চার মা স্বাস্থ্যবিধি মেনে দুধ দিচ্ছেন সন্তানকে। তিনি আরও বলেন, মায়ের যদি জ্ঞান থাকে, শরীরে যথেষ্ট পুষ্টি থাকে এবং অক্সিজেনের চাহিদা কম থাকে, তবে তাঁর দুধ চেপে নেওয়া সম্ভব।