
মারণ ভাইরাস করোনার ভয়ংকর ছোবলে বিশ্বজুড়ে মানুষ এখন ভীত সন্ত্রস্ত। এর ত্রাহি রূপ ধীরে ধীরে গ্রাস করে নিচ্ছে পুরো পৃথিবীকে। ইতিমধ্যেই ১৮৫ দেশের ২৭ লাখেরে বেশি মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে এবং মৃতের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার ছাড়িয়েছে।
উদ্ভূত এ পরিস্থিতিতে ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা এড়াতে বিশ্বের অধিকাংশ দেশকে লকডাউনের আওতায় আনা হয়েছে। বাংলাদেশ তার ব্যতিক্রম নয়। গত ২৬ মার্চ থেকে বন্ধ রাখা হয়েছে অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কলকারখানা। শিল্পকারখানা, ইটের ভাটায় চলছে ছুটি। সব গণজমায়েত নিষিদ্ধ। এ ছাড়া গণপরিবহন বন্ধ, যানবাহন চলাচল সীমিত রাখা হয়েছে। কমেছে মানুষের আনাগোনা।
তবে আমার আলোচ্য বিষয় করোনা প্রেক্ষাপটের কিছুটা বিপরীতে। প্রকৃতি কীভাবে তার দৃশ্যপট পাল্টাচ্ছে এবং কীভাবে তার পরিবেশগত পুনরুদ্ধারের আয়োজন করছে, সেই বিষয়ে আলোকপাত করছি।
যেখানে পুরো বিশ্ব ব্যস্ত করোনায় আক্রান্ত ও মারা যাওয়া মানুষের হিসাব নিয়ে, সেখানে প্রকৃতি যেন তার উল্টো হিসাবে ব্যস্ত। সে যেন বিন্দুমাত্র উদ্বিগ্ন নয়। মনুষ্য তাণ্ডবের আড়ালে আবডালেই চলছে তার হঠাৎ জাগরণের খেলা। নীরব, নির্জন, কোলাহলমুক্ত পরিবেশে মায়াময় প্রকৃতি নিজের সুষমা, সৌন্দর্যরাশি যেন একের পর এক তুলে ধরছে।
গত ১৮ মার্চ থেকে প্রবেশের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে সব পর্যটনকেন্দ্রে। নিষেধাজ্ঞার এ সারণিতে রয়েছে পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতও। কোলাহলপূর্ণ সৈকত যেন আজ হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছে। সৈকত রাজ্যের এ সুনসান নীরবতায় সবুজ গালিচা তৈরিতে মাতোয়ারা হয়ে উঠেছে সাগরলতা। সবুজ এ জালের মধ্যে ফুটছে অগণিত জাতের নাম জানা না-জানা বাহারি রঙের সব ফুল। কোলাহলমুক্ত সৈকত পেয়েই সাগরলতা ডালপালা মেলে দিয়ে শান্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন দীর্ঘদিন ধরে কক্সবাজারের পরিবেশ নিয়ে কাজ করা সেন বাঞ্চু।
সাগরলতা (Ipomea pes-caprae) একটি লতানো ও দ্রুত বর্ধনশীল উদ্ভিদ। এর ইংরেজি নাম রেলরোড, যার বাংলা অর্থ ‘রেলপথ লতা’। একটি সাগরলতা ১০০ ফুটের বেশি লম্বা হতে পারে। বিশিষ্ট পরিবেশবিজ্ঞানী রাগিবউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘সাগরলতা সৈকতের অন্য প্রাণী যেমন কাঁকড়া ও পাখির টিকে থাকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর সবুজ পাতা মাটিকে সূর্যের কিরণ থেকে এমনভাবে রক্ষা করে, যাতে সূর্যের তাপ মাটি থেকে অতিরিক্ত পানি বাষ্পীভূত করতে না পারে। এতে তারা মাটির নিচের স্তরের উপকারী ব্যাকটেরিয়াসহ অন্য প্রাণীর জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করতে সক্ষম হয়। উন্নত বিশ্বে সাগরলতাকে সৌন্দর্যবর্ধনের সঙ্গে সঙ্গে সৈকতের মাটির ক্ষয় রোধ ও সংকটাপন্ন পরিবেশ পুনরুদ্ধারের কাজে লাগানো হচ্ছে।
সাগরলতার জালে শুকনো উড়ন্ত বালুরাশি আটকে তৈরি হচ্ছে বালিয়াড়ি, যা সাগরের রক্ষাকবচ নামেও পরিচিত। পরিবেশবিজ্ঞানী ড. আনসারুল করিম বলেছেন, তিন দশক আগেও কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সমুদ্র তীর ধরে প্রায় ২০ থেকে ৩০ ফুট উঁচু পাহাড়ের মতো বড় বড় বালিয়াড়ি দেখা যেত। সাগরলতার সঙ্গে সঙ্গে বালিয়াড়ি হারিয়ে যাওয়ার কারণে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের প্রায় ৫০০ মিটার ভূমি বিলীন হয়ে গেছে। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসের সময় উপকূলকে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করতে সক্ষম এসব বালিয়াড়ি।
এ পসরায় সাগরপাড়ে আরও যুক্ত হয়েছে কচ্ছপের অবাধ বিচরণ। বিনা বাধায় সমুদ্রের বিশাল বালুকা বেলাভূমিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে কচ্ছপের দল। ইতিমধ্যে ডিম পাড়াও শুরু করেছে তারা। বিপন্ন প্রজাতির তালিকায় থাকা সামুদ্রিক এ কচ্ছপ সামুদ্রিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়, বিশেষ করে খাদ্যশৃঙ্খল বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ ছাড়া সাগরের ময়লা-আবর্জনা খেয়ে পানি পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে তারা।
অন্যদিকে বহু বছর পর লোকালয়ের একদম কাছে এসে ডিগবাজিতে মেতেছে ডলফিনের দল। দেশের এ ক্রান্তিলগ্নেও ডলফিনের এ মনোমুগ্ধকর নৃত্য যেন অপার মহিমাভরা পরিবেশ-প্রকৃতির জাগরণে মেতে ওঠার প্রামাণিক তথ্য।
শুধু কি কক্সবাজারের নিরুপদ্রব সমুদ্র আনন্দ খেলায় মেতেছে? মোটেই না! সাগরকন্যা খ্যাত পর্যটননগরী কুয়াকাটাও তার সৌন্দর্য উন্মোচনে ব্যস্ত। এঁকেবেঁকে পুরো বেলাভূমিতে লাল কাঁকড়ার আলপনা আকার দৃশ্য তারই নজির, যেন দীর্ঘদিন পর সৈকত নিজেদের দখলে পাওয়ার আনন্দ উপভোগে ব্যস্ত তারা।
যদি পরিবেশদূষণের বিষয়টি লক্ষ করা হয়, সে ক্ষেত্রেও পরিদৃষ্ট হবে নিম্নগামী সূচক। দেশের প্রাণকেন্দ্র ‘ঢাকা’ হতে পারে তার উদাহরণ। ছয় মাস ধরে দিনের বেশির ভাগ সময় শীর্ষস্থান দখল করে থাকা ঢাকার বায়ুমান এখন অনেকটা উন্নয়নের দিকে। গত ৩১ মার্চ সন্ধ্যায় যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্বের বায়ুমান যাচাই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এয়ার ভিজ্যুয়ালের বায়ুমান সূচক (একিউআই) ইনডেক্সে ২৩ নম্বরে নেমে এসেছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদিও সূচক ৫০-এর মধ্যে থাকা স্বাস্থ্যকর, তবুও যে সূচক ছিল ৪০০/৫০০-এর ওপরে, তা এখন নেমে এসেছে ১০০-এর কোটায়। এটি অবশ্যই আমাদের জন্য খুশির খবর। তবে আশঙ্কা করা যাচ্ছে, পরিস্থিতি আবার আগের মতো হলে বৈশ্বিক হিসাবে এ সূচক পুনরায় ঊর্ধ্বগামী হবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আবদুল মতিন বলেছেন, টেকসই উন্নয়ন প্রকল্প ও ব্যক্তিগত সচেতনতাই কেবল পারে দূষণের মাত্রা কমিয়ে রাখতে।
সমগ্র বিশ্ব করোনার আক্রমণে পর্যুদস্ত, অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়েই কেটে যাচ্ছে একেকটা দিন। তবে এরই মধ্যে নিরুদ্বিগ্ন প্রকৃতি একের পর এক নিদর্শন দেখিয়েই চলেছে। জীববৈচিত্র্যে ভরপুর আমাদের বাংলাদেশ। তবে মানুষের স্বভাবগত স্বার্থের কারণে আজ তা বিঘ্নিত এবং অরক্ষিত। যেখানে মানবকেন্দ্রিক ব্যবহার না করে ‘আমি প্রকৃতির, প্রকৃতি আমার’ এটা হওয়া উচিত, সেখানে আমরা প্রতিনিয়ত পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করেই চলেছি। প্রকারান্তরে আমরা নিজেরা নিজেদেরই হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছি। যে আঁধার আমাদের ঘিরে ধরেছে তা একদিন কেটে যাবেই, ইনশা আল্লাহ। তবে আমাদের চাপে প্রকৃতি আবার যেন প্রাণ হারিয়ে না ফেলে, সেদিকে আমাদের লক্ষ রাখতে হবে। যেহেতু সুস্থ, সুন্দর ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য পরিবেশগত উৎকর্ষ সাধনের বিকল্প নেই, সেহেতু টেকসই প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে পরিবেশেগত উন্নয়নে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নজর কামনা করছি।
*লেখক: শিক্ষার্থী, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ।