বন্যার্তদের পাশে দাঁড়াতে রং-তুলির আঁচড়

বন্যার্তদের পাশে দাঁড়াতে চিত্রাঙ্কন কর্মশালা উদ্বোধন করছেন শিল্পী রফিকুন নবী। বাঁ থেকে আনিসুজ্জামান, জামাল আহমেদ, নিসার হোসেন, রফিকুন নবী, এম এ রহিম, মোহাম্মদ ইকবাল ও শিশির ভট্টাচার্য্য। রোববার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে।
ছবি: তানভীর আহাম্মেদ

‘কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই’ গাইছিল ছেলেমেয়েরা। সামনে দাঁড়িয়ে একমনে ছবি আঁকছিলেন তাঁদের শিক্ষক রফিকুন নবী। এক বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে রোববার দুপুরে তুলির ছোঁয়া দিয়েছেন ক্যানভাসে। এ যেন ক্যানভাসের দিকে হাত বাড়ানো নয়, দুর্গত মানুষের জন্য বাড়িয়ে দেওয়া মানবতার হাত।

ছবি আঁকা হবে। সেই ছবি বিক্রির টাকায় সিলেট ও রংপুরের বন্যার্তদের জন্য কেনা হবে ত্রাণসামগ্রী। এ কার্যক্রমেরই সূচনা করেছেন রফিকুন নবী, ‘র. নবী’ নামে যাঁর বিপুল পরিচিতি। কর্মকাণ্ডে যুক্ত আছেন দেশের একদল প্রতিষ্ঠিত শিল্পী—সৈয়দ আবুল বার্‌ক্‌ আলভী, জামাল আহমেদ, শিশির ভট্টাচার্য্য, ফরিদা জামান, শেখ আফজাল, আনিসুজ্জামান, মোহাম্মদ ইকবাল।

এসব শিল্পীর অনেককেই রোববার দুপুরে দেখা গেল চারুকলার অঙ্কন ও চিত্রায়ণ বিভাগের কক্ষে। দেখা গেল সংগ্রাহক মোহাম্মদ আবদুর রহিমকেও। ডিবিএল গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান তিনি। শিল্পীদের সঙ্গ পছন্দ করেন, ভালোবাসেন চিত্রকর্ম সংগ্রহ করতে। এই উদ্যোগের শুরুতেই হাজির হয়েছেন মানবতার ডাকে সাড়া দিতে।
শিক্ষার্থীদের উৎসাহও কম নয়। তাঁরাও সুযোগ বুঝে যে যাঁর ছবি এঁকে ফেলবেন। তারপর জমা দেবেন শিক্ষকদের কাছে। বড়দের সঙ্গে ছোটদের ছবিগুলোও চলে যাবে সংগ্রাহকদের কাছে। বন্যার্তদের জন্য আসবে অর্থ।

প্রথমে শিক্ষার্থীরা কণ্ঠে তুলে নিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান, ‘আমার খোলা হাওয়া’। গাইতে গাইতে উৎসাহ দিচ্ছিলেন শিক্ষকদের। এ সময় একটি কাপড়ের ক্যানভাসে রফিকুন নবী আঁকছিলেন একটি গরু। বন্যার হাঁটুজলে অসহায় গরুটির পিঠে একটি কাক। রফিকুন নবীর পেছনে লেখা দেখা গেল ‘আসুন বন্যার্তদের পাশে দাঁড়াই’।
তন্ময় নামের এক শিক্ষার্থী হঠাৎ বাঁশের বাঁশিতে সুর তুললেন। এ রকম দৃশ্যে যে কারও হঠাৎ মনে পড়ে যাবে শিল্পী এস এম সুলতানের কথা। ছবি আঁকতে আঁকতে যিনি বাঁশিও বাজাতেন। শিক্ষার্থীদের প্রতিভায় মুগ্ধ শেখ আফজাল বলে উঠলেন, ‘তোমাদের দেখছি সার্টিফিকেট দিতে হবে সংগীত বিভাগ থেকে।’ এমন উৎসাহ পেয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়।

সব কালে, সব সংগ্রামে, দুর্যোগে শিল্পীরা দাঁড়িয়েছেন দুর্গত মানুষের পাশে। যেমন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, শিল্পগুরু সফিউদ্দীন আহমেদ। দুদিন আগে চারুকলায় আয়োজন করা হয় সফিউদ্দীন আহমেদের জন্মশতবর্ষ উৎসব। এই শিল্পী ছিলেন ভীষণ শিল্পসচেতন, পাশাপাশি রাজনীতিসচেতনও। সহজে নিজের ছবি বিক্রি করতে চাইতেন না। পাছে, ছবি এমন কারও হাতে গিয়ে পড়ে, যে চিত্রকর্মই বোঝে না! বন্যাদুর্গতদের সাহায্য করার জন্য সেই সফিউদ্দীন আহমেদও ও নিজের ছবি বের করে দিয়ে বলতেন, ‘যাও, বিক্রি করে কিছু সাহায্য পাঠাও।’

রফিকুন নবী সেই প্রসঙ্গেই বললেন, ‘দেশে যখনই দুর্যোগ আসে, শিল্পীরা এগিয়ে যায়। এবারের ভয়াবহ বন্যাতেও কর্মশালার মাধ্যমে শিল্পীরা বিপন্ন মানুষের দাঁড়াচ্ছে। আমরা দুস্থ মানুষের পাশে থাকতে চেয়েছি। পাশে থাকা মানে যতটুকু তাদের সম্ভব সহায়তা করা। এ ছাড়া আমাদের মতো শিল্পীদের শক্তি আর কতটুকু? শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের সময় থেকেই শিল্পীরা দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। নিজেদের অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতার চেষ্টা করেছেন। অন্য মাধ্যমের শিল্পীদেরও এমন দুর্যোগে এগিয়ে আসা উচিত।

চারুকলার ডিন শিল্পী নিসার হোসেন বলেন, এই কর্মশালার ছবি দিয়ে প্রদর্শনী হবে না। এগুলো সরাসরি চলে যাবে সংগ্রাহকদের কাছে। সেখান থেকে আসবে টাকা। এ ছাড়া নববর্ষের মঙ্গল শোভাযাত্রার জন্য আঁকা কিছু ছবি এখনো বিক্রি হয়নি। সেগুলোও বিক্রির জন্য পাঠানো হবে। এরপর গণমাধ্যমে দেখে খোঁজ নেওয়া হবে কোথায় ত্রাণ পৌঁছাচ্ছে না। সে অনুযায়ী ত্রাণসহায়তা পাঠানো হবে।

নিসার হোসেন বলেন, ‘যেসব জায়গায় এখনো ত্রাণ পৌঁছায়নি, সে রকম কয়েকটি জায়গা চিহ্নিত করে আমরা ত্রাণ সহায়তা পৌঁছে দেব। এমনও হতে পারে, আমরা হয়তো দুটি গ্রামের মানুষকে পুরো এক মাসের প্রয়োজনীয় খাবার ও জিনিসপত্র দিয়ে এলাম।’