অন্যের বাড়িতে থালা বাসন ধোয়া আর ঘর মোছার কাজ করে যা পেতেন সেটা দিয়েই সাতজনের সংসার চালাতেন আলেয়া জান্নাত নামের এক নারী। শুধু ওই কাজই নয়, বাড়তি কিছু রোজগারের আশায় যেকোনো দাওয়াতেও করতেন থালাবাটি পরিষ্কারের কাজ। তাতে রোজগারের পাশাপাশি মাছ-মাংসও জুটত তাদের কপালে। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার থেকে পঙ্গু স্বামী আর পাঁচ সন্তানকে নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে না খেয়ে দিন কাটছে আলেয়াদের।
রোববার দুপুর ২টার দিকে কুরুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কক্ষে দেখা হয় আলেয়া জান্নাতের পরিবারের সঙ্গে। বিদ্যালয়টি সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলা কুরুয়া বাজার এলাকায় অবস্থিত। সেখানেই বারান্দায় হুইলচেয়ারে বসে ছিলেন আলেয়ার স্বামী আবুল কালাম। তিন বছর আগে কাজের সময় নলকূপের পাড়ে পা পিছলে পড়ে গিয়েছিলেন। তখন কোমরের কাছে পায়ের একটি হাড় ভেঙে গিয়ে তিনি পঙ্গু হয়ে যান।
আলেয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘বইন্যার পানি বাড়ার সময় খানির লাগি ঘরতন কোনতা আনতাম পারছি না। তখন ঘরো কোনতা খাবারো আছিল না।’ শুক্রবার এক ব্যক্তি কিছু শুকনো খাবার দিয়ে যান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘হকলে মিইলা হুকনা ছিড়া খাইয়া দুইদিন (শুক্র ও শনিবার) পার করিলাইছি। শনিবার ইগুনো হেস অইগেছে।’ পরে সেদিন সন্ধ্যায় পরিচিত এক মুদি দোকান থেকে ২ কেজি চাল, ২৫০ গ্রাম ডাল, ৩০ টাকার সয়াবিন তেল বাকিতে কিনে আনেন তিনি। সেটাই সকালে রান্না করেছেন বলেও জানালেন।
কুরুয়া মাইঝপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আলেয়া জানান, তাঁদের ঘরটি টিনের ছাউনি ও মাটির দেয়ালের। বন্যার পানি নামতে দেরি হওয়ায় এখনো ঘরের সামনে উঠানে প্রায় কোমর সমান পানি জমে রয়েছে। পানিতে ভিজে থাকায় ঘরের মাটির দেয়ালও এখন ধসে পড়ার ঝুঁকিতে।
আলেয়ারাসহ ওই বিদ্যালয়ে ৪২টি পরিবার বুধবার দুপুর পর্যন্ত আশ্রয় কেন্দ্রে ছিল। রোববার ওই কেন্দ্রে ৫টি পরিবার নতুন করে আশ্রয় নিয়েছে। বাকিদের কেউবা গত শুক্রবার কিংবা শনিবারে সেখানে উঠেছেন।
আশ্রিতরা বলছেন, বন্যার পানি অনেক ধীর গতিতে নামছে। গত দুদিনে (শুক্র ও শনিবার) ওসমানি নগরের বিভিন্ন এলাকায় মাত্র আড়াই থেকে ৩ ইঞ্চি পানি কমেছে। অন্যদিকে পানি নামতে দেরি হওয়া অনেকের ঘরের ভিটার মাটি নরম হয়ে ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে। বাঁশের খুঁটির ঘরও মাটি নরম হওয়ায় হেলে গেছে। কারও ঘরের মাটির দেয়াল আংশিক ধসে গেছে। তাই অনেকেই পুরোপুরি পানি কমে না যাওয়া পর্যন্ত কেন্দ্রেই থাকছেন। কেউবা ঝুঁকি দেখে ঘর ছেড়ে আশ্রয়ের জন্য কেন্দ্রে যাচ্ছেন।
ওই কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া আমির হোসেন গাজীর ঘরের মাটি নরম হয়ে হেলে গেছে। পাশে থাকা একটি কাঁঠাল গাছে সেটি এখন আটকে রয়েছে। গাছ না থাকলে পুরো ঘর ভেঙে যেত বলেও জানান তিনি। তাঁর ঘরের দেয়াল অর্ধেক মাটির, অর্ধেক টিনের বেড়ার। আর খুঁটি ছিল বাঁশের। গত পাঁচ দিন ধরে তাঁর বাড়ির উঠানে প্রায় কোমর সমান পানি জমে আছে। আর ঘরের ভেতর ছিল বিছানা ছুঁই ছুঁই পানি।
বন্যার পানি নামতে দেরি হওয়ার বিষয়ে সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আসিফ আহমেদ প্রথম আলোকে মুঠোফোনে বলেন, সিলেটের পানি সুনামগঞ্জ এলাকা দিয়ে নামে। কিন্তু সেখানেই এখনো বন্যার পানি আছে। তাই সিলেটের পানি ধীর গতিতে নামছে। ওসমানীনগর উপজেলার বিভিন্ন এলাকার পানি নামতে আরও কিছুদিন সময় লাগবে।
ওসমানিনগর উপজেলার ৮টি ইউনিয়ন বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। এই পানি নামতে আরও সময় লাগবে বলে জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।
পানি ধীর গতিতে নামছে জানিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নীলিমা রায়হানা প্রথম আলোকে বলেন, ‘যত দূর শুনেছি কুশিয়ারা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ার পর নামতে সময় লাগে। তাই পানি নামতে আরও ১০-১২ দিন সময় লাগতে পারে।’
উপজেলা প্রশাসনের সূত্রে, ৬৫টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ৬ হাজার ৭৬০ জন বন্যা দুর্গত মানুষ অবস্থান করছেন। প্রায় ৩০ হাজার পরিবার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত ৯৮ মেট্রিকটন চাল, নগদ সাড়ে ১০ লাখ টাকা ও ৫০০ প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ পাওয়া গেছে। এগুলো বিতরণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি ঘরবাড়ি হারানো মানুষের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে।
বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে উপজেলার দয়ামীর এলাকার সদরুন্নেসা উচ্চ বিদ্যালয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার রাস্তায় এখনো হাঁটু সমান পানি। আর বিদ্যালয়ের নিচতলায় পানি রয়েছে প্রায় গোড়ালি সমান।
আশ্রয়কেন্দ্রটির দায়িত্বে থাকা আশিক মিয়া প্রথম আলোকে জানান, ওই কেন্দ্রটিতে ৪১টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছেন। আশ্রিতদের মোট সংখ্যা ১৭১ জন। এই পরিবারগুলো জালালপাড়া, কোনাপাড়া, রাইকগাও, দয়ামীর, আতাউল্লাহ এলাকার। কেন্দ্রটিতে ৪১ জন পুরুষ, ৫৯ জন নারী ও ৭১ জন শিশু ও কিশোর রয়েছে। রোববারও ওই কেন্দ্রে ৬টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিদ্যালয়টির সফিউল্লাহ গনি ওসমানি ভবনের চারটি তলার পাঁচটি কক্ষে বন্যার্তরা আশ্রয় নিয়েছেন। এই ভবনের ৩য় ও ৪র্থ তলায় বন্যার্ত মানুষ থাকলেও নির্মাণাধীন হওয়ায় শৌচাগার ব্যবহার উপযোগী হয়নি। পাশের প্রশাসনিক ভবনের আরও ৫টি কক্ষে বন্যার্ত মানুষেরা থাকছেন। এখানে শৌচাগার থাকলেও ওপরে পানির সরবরাহ নেই। বিদ্যালয়ে ৪টি নলকূপ রয়েছে। তবে বন্যার পানির কারণে ৩টি ব্যবহারের অনুপযোগী।
ওই কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া বন্যার্তরা জানান, প্রতি দিনই স্থানীয় কোনো না কোনো ব্যক্তি কিংবা সংগঠনের পক্ষ থেকে তাঁদের ১ বেলা করে অন্তত ডাল ভাত দিচ্ছে। কখনো বিরিয়ানি কিংবা খিচুড়ি। গতকালও স্থানীয় এক ব্যক্তির উদ্যোগে ওই কেন্দ্রের আশ্রিতদের জন্য ডাল, ভাত ও আলু দিয়ে রান্না মুরগির তরকারি দেওয়া হয়।
বিদ্যালয়টির প্রশাসনিক ভবনের পাঠাগারের কক্ষে ৪টি পরিবারের ২৩ জন আশ্রয় নিয়েছেন। কক্ষের ভেতরে ঢুকে দুটি এলপিজি গ্যাসের সিলিন্ডার দেখা যায়। সেখানে রান্নাও করছিলেন আশ্রিত পরিবারগুলো।
ওই কক্ষে আশ্রয় নেওয়া দীপা বেগম বলেন, আশ্রয়কেন্দ্রে শৌচ কাজে কষ্ট হচ্ছে। নারী-পুরুষ একই শৌচাগার ব্যবহার করছে। শৌচ কাজের জন্য পানি আনতে হচ্ছে নিচে থেকে। তবে খাদ্য সহায়তা পাচ্ছেন জানিয়ে তিনি বলেন, এক সপ্তাহ ধরে অবস্থান করছেন। এর মধ্যে দুবার চাল, ডাল, আলু, পেঁয়াজ, সয়াবিন তেল প্রভৃতি ত্রাণ পেয়েছেন। এ ছাড়া ৩ বার পেয়েছেন চিড়া-মুড়ির মতো শুকনো খাবার।