
নিউইয়র্কের বাংলাদেশি আমেরিকান চিকিৎসক ফেরদৌস খন্দকার করোনাভাইরাসে আক্রান্ত বাংলাদেশি কমিউনিটিকে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে যারা রোগের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে যেতে চান না, তাদের সেবা দিচ্ছেন। ফোনে অথবা প্রয়োজনে বাসায় গিয়েও স্বাস্থ্যসেবা দেন।প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে এ নিয়ে তার ব্যস্ততা। মহামারির এ সময়ে প্রতিদিন ১৪ থেকে ১৬ ঘন্টা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন তিনি।এমনকি অসহায় ব্যক্তিদের ঘরে খাবার পৌঁছে দিচ্ছেন। নিজস্ব তহবিল থেকে নানা সহযোগিতা নিয়ে এগিয়ে আসছেন।
ডা. ফেরদৌস খন্দকার বলেন, ‘এ সময়ে আমরা যে যেভাবে পারি, মানুষের সহযোগিতায় এগিয়ে আসতে হবে। ছোট্ট ছিলাম বলে দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগ দেওয়ার সুযোগ আমার হয়নি। করোনা আমাকে সে সুযোগ করে দিয়েছে। যুদ্ধের সময়ে কোন কিছুর তোয়াক্কা না করেই দেশের জন্য, মানুষের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ে। এতে নিজের জীবন বিপন্ন হলেও যুদ্ধ থেকে সরে দাঁড়ানোর কোন অবকাশ নেই।
বাংলাদেশি আমেরিকান এই চিকিৎসক জানেন, এই মহামারির সময়ে তাঁকে নিজের কমিউনিটির লোকজন আগের থেকে তাঁকে বেশি প্রয়োজন। এমন অনেক রোগী আছেন, যারা ভাষা না জানার কারণে করোনা সংক্রমণ নিয়ে বাসায় বসে আছেন। এখানে বয়স্ক প্রবাসীদের ক্ষেত্রে ভাষা একটি বড় বাধা। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর থেকে আসা প্রবাসীদের চিকিৎসাসেবা দিতে তিনি পাঁচটি ভাষা শিখে নিয়েছেন।এ সময়ে প্রবাসী বয়স্কদের মধ্যে একটি ভয় কাজ করছে, করোনায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে গেলেই বুঝি মৃত্যুর ঝুঁকি আছে! এমন পরিস্থিতিতে যাদের করোনা উপসর্গ রয়েছে, এমন রোগীদের বাড়ি গিয়ে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন তিনি ডা. ফেরদৌস। বাংলাদেশি এই চিকিৎসক পাশাপাশি ইউটিউবের মাধ্যমে দিচ্ছেন নানা পরামর্শ।
কোভিড–১৯ পজেটিভ একজন রোগী জানালেন, তিনি ডাক্তার ফেরদৌসের এই ভিডিও দেখে তার পরামর্শ অনুযায়ী খাওয়া–দাওয়াসহ প্রাত্যহিক সব কিছু মেনে চলছেন। তিনি এখন অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠেছেন।
ফেরদৌসের রোগীরা বলেন, ডাক্তারের ভিডিও দেখার জন্য প্রতিদিন অনেক মানুষ অপেক্ষা করে থাকেন। তিনি রোগীদের নিজের ফোন নম্বর দিয়ে রেখেছেন। দৈনিক প্রায় ২০০ ফোনকল রিসিভ করে ফোনে পরামর্শ চালু রেখেছেন ।মাঝে মাঝেই পিপিই পরে পৌঁছে যাচ্ছেন সরাসরি রোগির বাসায়।আর সবাইকে ঘরে থাকার বার্তা দিচ্ছেন।
শুধু রোগীর চিকিৎসাসেবা নয়, নিজ উদ্যোগে রোগীদের মাস্ক, হ্যান্ডগ্লাভসের মতো জরুরি জিনিসপত্রও পৌঁছে দিচ্ছেন ডা. ফেরদৌস। এ ছাড়া স্থানীয় কুইন্স হাসপাতালে ১০ হাজারের বেশি জরুরী সরঞ্জাম সরবরাহ করেছেন। বয়স্ক ও বাচ্চাদের জন্য নানা খাবার বিভিন্ন জায়গায় বিতরণ করছেন।
স্থানীয় এবিসি নিউজ সেভেনকে দেওয়া এক সাক্ষ্যাৎকারে ডা. ফেরদৌস বলেন, নার্স ও চিকিৎসকদের এ সময়ে মানুষের পাশে থাকা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিতদের ঘরে থাকার সুযোগ নেই। বয়স্কদের চিকিৎসাসেবায় তিনি বেশ অভিজ্ঞ। ২০০৩ সাল থেকে নিউইয়র্কের বাংলাদেশি অধ্যুষিত জ্যাকসন হাইটস ও ব্রুকলিন এলাকায় প্রবাসী বাংলাদেশিসহ ভিনদেশি মানুষকে চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন ডা. ফেরদাউস খন্দকার।
গণদোয়ার আয়োজন
বিশ্বব্যাপী মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়া করোনার প্রভাব থেকে মুক্তি চেয়ে একযোগে গণদোয়ার আয়োজন করেন ডা. ফেরদৌস। ১৭ এপ্রিল নিউইয়র্ক সময় দুপুর ১২টায় এবং বাংলাদেশ সময় রাত ১০টায় এই দোয়া পর্বটি পরিচালিত হয়। এ সময় অনলাইনে দোয়া পরিচালনা করেন নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসের মসজিদে আবু হুরায়রার ইমাম ও খতিব মুহাম্মদ ফায়েকুদ্দিন।
ইসলাম ধর্ম মতে মোনাজাত করা হলেও শুরুতেই ডা. ফেরদৌস খন্দকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, যে যেই ধর্মের অনুসারী রয়েছেন, তারা নিজ নিজ ধর্ম অনুযায়ী চলুন সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করি। এটি একটি সার্বজনীন আয়োজন। এমন দুর্যোগে মহান সৃষ্টিকর্তার কৃপা আজ খুব প্রয়োজন।
ডা. ফেরদৌসইউএসএ এই ফেসবুক পেজের মাধ্যমে দোয়াপর্ব সরাসরি সম্প্রচারের কথা থাকলেও, কারিগরী সমস্যায় সেটা সম্ভব হয়নি। পরে তার ব্যক্তিগত ফেসবুকসহ ডিটিভি, ফ্লোরিডা বাংলা টিভি ও দৈনিক কালের কণ্ঠের ফেসবুক পেজের মাধ্যমে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা মানুষ এই আয়োজনটিতে যুক্ত হন।
দোয়া পরিচালনাকারী ইমাম মুহাম্মদ ফায়েকুদ্দিন নিজেও করোনায় আক্রান্ত হয়ে এলমহার্স্ট হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। সেই জীবনযন্ত্রণা ও ভয়াবহতার কথা তিনি তুলে ধরেন দোয়ার আগে। তিনি বলেন, মহান আল্লাহ আমাদের এই দুর্যোগ থেকে মুক্তি দিন। আবারো পৃথিবী তার আগের রূপে ফিরে আসুক। চিকিৎসাকর্মীদের প্রশংসা করে এই আলেম বলেন, ‘জন্মিলে মরতে হবে, এটা ঠিক। কিন্তু এমন মৃত্যু কারোই কাম্য নয়। এত মানুষ আমার পেছনে নামাজ পড়েছেন। হাসপাতালে কেবল ভেবেছি, এভাবে মরে গেলে ঠিকমতো আমার জানাজাটাও হবে না। কেউ শেষ দেখাটাও দেখতে পাবেন না আমাকে। আল্লাহ তুমি আমাদেরকে ক্ষমা করো।’
পরে ডা. ফেরদৌস খন্দকার বলেন, আমরা যদি কোন ভুল করে থাকি, চলুন সৃষ্টিকর্তার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিই। পৃথিবী আবার জেগে উঠুক।’ সবার মনের ভেতরে আত্মবিশ্বাস ও সাহস জাগিয়ে তুলতে এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান মাউন্ট সিনাই হাসপাতালের বিশিষ্ট এই বাংলাদেশি আমেরিকান চিকিৎসক।