ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৬ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের বিনা মূল্যে অক্সিজেন সেবা

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় করোনায় আক্রান্ত রোগীদের বিনা মূল্যে অক্সিজেন সেবা পৌঁছে দিচ্ছেন ফেসবুকভিত্তিক সংগঠন 'বাউনবাইরার কথা'
সংগৃহীত

করোনায় আক্রান্ত রোকসানা বেগম (৬৫) তখন শ্বাসকষ্টে ভুগছেন। কিন্তু কোথাও অক্সিজেন খুঁজে পাচ্ছেন না তাঁর স্বজনেরা। এমন সময় ফোন পেয়ে অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে ছুটে আসেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ ব্রিগেড। গতকাল রোববার এভাবে জেলার আশুগঞ্জ উপজেলার তারোয়া গ্রামের রোকসানার বাড়িতে বিনা মূল্যে অক্সিজেন সিলিন্ডার পৌঁছে দেন তাঁরা। পরে ওই অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়েই অ্যাম্বুলেন্সে করে তাঁকে ঢাকায় নিয়ে যান স্বজনেরা।

ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ ব্রিগেড ছাড়াও ‌বাউনবাইরার কথা, জেলা ছাত্রলীগের অক্সিজেন সেবা, পৌর ছাত্রলীগের বঙ্গবন্ধু অক্সিজেন সেবা, আমরাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও ক্লিন ব্রাহ্মণবাড়িয়া নামে জেলার আরও পাঁচটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বিনা মূল্যে করোনা রোগীদের দোরগোড়ায় অক্সিজেন সেবা পৌঁছে দিচ্ছেন।

গত ১৫ দিনে সংগঠনের পক্ষ থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালসহ ২৫ জন করোনায় আক্রান্ত রোগীকে আমরা বিনা মূল্যে অক্সিজেনের সিলিন্ডার পৌঁছে দিয়েছি। সংকটের এই সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতেই আমরা বিনা মূল্যে অক্সিজেন সিলিন্ডার সেবা পৌঁছে দেওয়ার কাজ করছি
নাসির মিয়া, আহ্বায়ক, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ ব্রিগেড

একটি কল পেলেই সংগঠনগুলোর স্বেচ্ছাসেবকেরা অক্সিজেনের সিলিন্ডার নিয়ে ছুটে যাচ্ছেন রোগীর কাছে। সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে জানা গেছে, গতকাল রাত পর্যন্ত ৬টি সংগঠনের মাধ্যমে জেলার ১৫০ জনের বেশি করোনা রোগী বিনা মূল্যে অক্সিজেন সেবা পেয়েছেন। জেলা ও জেলার বাইরের চিকিৎসক, শিক্ষক, রাজনৈতিক ব্যক্তিসহ বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার মানুষ সংগঠনগুলোকে অক্সিজেন সিলিন্ডার দিয়ে সহায়তা করছেন।

গত ১৯ জুলাই স্থানীয় আইনজীবী নাসির মিয়াসহ কয়েকজন তরুণ মিলে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ ব্রিগেড প্রতিষ্ঠা করেন। সংগঠনটির আহ্বায়ক নাসির মিয়া জানান, বর্তমানে তাঁদের সদস্যসংখ্যা ২৫। চারটি অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও এখন তাঁদের কাছে ১৭টি অক্সিজেন সিলিন্ডার রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘গত ১৫ দিনে সংগঠনের পক্ষ থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালসহ বাড়ি বাড়ি গিয়ে ২৫ জন করোনায় আক্রান্ত রোগীকে আমরা বিনা মূল্যে অক্সিজেনের সিলিন্ডার পৌঁছে দিয়েছি। সরকারি হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে অক্সিজেনের ঘাটতি রয়েছে। সংকটের এই সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতেই আমরা বিনা মূল্যে অক্সিজেন সিলিন্ডার সেবা পৌঁছে দেওয়ার কাজ করছি।’ অক্সিজেন সেবা ছাড়াও সংগঠনের সদস্যরা গ্রামে গ্রামে করোনার টিকার জন্য নিবন্ধন, বিনা মূল্যে মাস্ক বিতরণের কাজ করছেন বলে জানান তিনি।

এদিকে গত বৃহস্পতিবার সকালে বাউনবাইরার কথা নামের একটি ফেসবুকভিত্তিক গ্রুপ ২০টি অক্সিজেন সিলিন্ডার দিয়ে বিনা মূল্যে অক্সিজেন সেবার কার্যক্রম শুরু করে। বিভিন্ন মানুষের সহায়তায় বর্তমানে এই সংগঠনের কাছে ৩৬টি অক্সিজেন সিলিন্ডার রয়েছে।

গত ৪ দিনে সংগঠনের সদস্যরা করোনায় আক্রান্ত ২৮ জন রোগীকে অক্সিজেন সিলিন্ডার সেবা দিয়েছেন বলে জানা গেছে। এর মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডের ১০ থেকে ১২ জন করোনায় আক্রান্ত রোগীকে অক্সিজেনের সেবা দিয়েছেন তাঁরা। বাকিগুলো রোগীদের বাড়ি বাড়ি পৌঁছানো হয়েছে।

জেলা ছাত্রলীগের উদ্যোগে বিনা মূল্যে অক্সিজেন সিলিন্ডার পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে করোনা রোগীদের দোরগোড়ায়

বাউনবাইরার কথা গ্রুপের অ্যাডমিন মাহবুবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, হাসপাতালগুলোতে অক্সিজেন সংকটের কারণে করোনায় আক্রান্ত রোগীদের কাছে অক্সিজেন সিলিন্ডার পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন তাঁরা। দিনের যেকোনো সময় অক্সিজেন পৌঁছে দিতে বর্তমানে সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবকদের মধ্যে সকাল ও রাতে পর্যায়ক্রমে পাঁচজন করে দায়িত্ব পালন করছেন।

এদিকে গত শুক্রবার সকালে জেলা ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে ৩৫টি অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে বিনা মূল্যে অক্সিজেন সেবা কার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমানে তাঁদের কাছে ৪৫টি অক্সিজেন সিলিন্ডার রয়েছে। এখন পর্যন্ত সংগঠনটির পক্ষ থেকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ১১ জন করোনায় আক্রান্ত রোগীসহ মোট ৭৬ জনকে অক্সিজেন সেবা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

একই দিনে পৌর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক স্বাধীন আল মামুন ১৬টি অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে বঙ্গবন্ধু অক্সিজেন সেবা কার্যক্রম শুরু করেন। সংগঠনের পক্ষ থেকে বিনা মূল্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালের ১২ জন রোগীসহ করোনায় আক্রান্ত মোট ২৫ জন রোগীর কাছে অক্সিজেন সিলিন্ডার পৌঁছে দিয়েছেন বলে জানা গেছে।

স্থানীয় সাংসদ র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী আমাদের ২০টি অক্সিজেন সিলিন্ডার দিয়েছেন। এ ছাড়া চিকিৎসকসহ বিভিন্ন মানুষ আমাদের সহায়তা করেছেন বলেই আমরা করোনায় আক্রান্ত রোগীদের সেবায় কাজ করতে পারছি।
শাহাদাৎ হোসেন, সাধারণ সম্পাদক, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা ছাত্রলীগ

এদিকে গতকাল সকালে ফেসবুকভিত্তিক দুই সংগঠন আমরাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও ক্লিন ব্রাহ্মণবাড়িয়া যৌথভাবে ১০টি সিলিন্ডার নিয়ে বিনা মূল্যে অক্সিজেন সেবা কার্যক্রম শুরু করেছে। গতকাল রাত পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত পাঁচজন রোগীকে অক্সিজেন সেবা পৌঁছে দিয়েছেন তাঁরা।

জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাহাদাৎ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্থানীয় সাংসদ র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী আমাদের ২০টি অক্সিজেন সিলিন্ডার দিয়েছেন। এ ছাড়া চিকিৎসকসহ বিভিন্ন মানুষ আমাদের সহায়তা করেছেন বলেই আমরা করোনায় আক্রান্ত রোগীদের সেবায় কাজ করতে পারছি। ৩৪ জন স্বেচ্ছাসেবকসহ ৬ জনের প্রশিক্ষিত একটি দল পালাক্রমে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে।’