চমেক হাসপাতালে অক্সিজেন সরবরাহ লাইন থেকে কানেক্টরের মাধ্যমে ক্যানুলা দিয়ে দুই রোগীকে অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে। এ রকম রোগী ২০ জনের বেশি।

রোগীর চাপে হিমশিম অবস্থা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডের চিকিৎসক ও নার্সদের। শয্যা বাড়িয়ে ২০০ থেকে করা হয়েছে ৩০০। সেখানে গতকাল রোববার বিকেল পর্যন্ত রোগী ছিলেন ৩১৮ জন। প্রায় সবার শ্বাসকষ্ট, লাগছে অক্সিজেন। কিন্তু হাসপাতালে অক্সিজেন সরবরাহ লাইনের ব্যবস্থা আছে ২৫০টি। ফলে কম অক্সিজেন চাহিদার রোগীদের একটি লাইন থেকে দুজনকে সেবা দেওয়া হচ্ছে।
চিকিৎসকেরা বলছেন, কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহ লাইনে চাপ ভালো থাকায় এতে রোগীর সমস্যা হচ্ছে না। ভাগাভাগি করলেও একেকজনকে কমপক্ষে ১৫ লিটার অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে। অক্সিজেন সরবরাহ লাইন থেকে কানেক্টরের মাধ্যমে ক্যানুলা দিয়ে দুই রোগীকে অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে। এ রকম দ্বৈত লাইনের অক্সিজেন পাচ্ছেন ২০ জনের বেশি রোগী।
চমেক হাসপাতালে সিলিন্ডার দিয়ে অক্সিজেন সেবা দেওয়া হয় না। কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহ লাইন থেকে দেয়ালে লাগানো সংযোগ পয়েন্টের মাধ্যমে অক্সিজেন সেবা পান রোগীরা।
জানতে চাইলে হাসপাতালের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিনিয়ত রোগী আসছেন। সেবা তো দিতে হবে। তাই একটি লাইন থেকে কানেক্টরের মাধ্যমে দুজনকেও অক্সিজেন দিতে হচ্ছে। কয়েকটি শয্যায় তা করতে হচ্ছে। যেকোনোভাবে সুস্থ করা দরকার। একই লাইন থেকে হাই ফ্লো নাজাল ক্যানুলা দিয়েও অক্সিজেন দেওয়া হয়। তবে তখন এক লাইন থেকে একজনকেই দেওয়া হয়।
গতকাল বিকেল চারটায় করোনা ওয়ার্ডে দেখা যায়, শয্যার পাশাপাশি মেঝেতে রয়েছেন রোগীরা। যাঁদের অক্সিজেন লাইন ভাগাভাগি করতে হচ্ছে, তাঁদের রাখা হচ্ছে পাশাপাশি।
তাঁদের একজন কুমিল্লার নিলুফা বেগম (৫০)। ২৯ জুলাই তাঁকে ভর্তি করা হয়। প্রথম দিকে তাঁকে হাই ফ্লো নাজাল ক্যানুলা দিয়ে অক্সিজেন দিতে হয়েছিল। এখন ১৫ থেকে ২০ লিটারের মতো অক্সিজেন লাগছে প্রতিদিন। তাই দ্বৈত লাইন থেকে অক্সিজেন সেবা পান বলে জানান নিলুফার স্বজন মো. জুয়েল।
চমেক হাসপাতাল সূত্র জানায়, শুরুতে করোনা রেড (পজিটিভ) ও ইয়েলো (উপসর্গ) জোন মিলিয়ে মোট শয্যা ছিল ১০০টি। এরপর জুলাই মাসের শুরুতে ২০০ ও পরে শেষ দিকে এসে করা হয়েছে ৩০০ শয্যা।
* গতকাল সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে সাধারণ শয্যায় রোগী ভর্তি ছিল ১ হাজার ৭১৬ জন। আর আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ১৪৭ জন। * এক সপ্তাহ আগে ২৩ জুলাই সাধারণ শয্যায় ১ হাজার ২৯৩ ও আইসিইউতে রোগী ছিল ১২১ জন।
রোগীর চাপ বাড়ায় ওয়ার্ডের সামনেও এখন স্বজনদের ভিড় বেড়েছে। দুই সপ্তাহ আগেও এত লোকজন চোখে পড়েনি।
বহদ্দারহাটের মো. আমির তাঁর বাবাকে সকালে ভর্তি করিয়েছেন রেড জোনে। গত বৃহস্পতিবার প্রথমে ইয়েলো জোনে ভর্তি করান। সেখানে করোনা পজিটিভ আসায় গতকাল এখানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আমির বলেন, ভেতরের অবস্থা খুব খারাপ। রোগীতে ভর্তি। অনেক কষ্টে একটি শয্যা পাওয়া গেছে। প্রায় সব রোগীর মুখে অক্সিজেন মাস্ক রয়েছে।
জানা গেছে, চমেক হাসপাতালের কাগজে-কলমে ১৮টি হাই ফ্লো নাজাল ক্যানুলা দেওয়ার সামর্থ্য রয়েছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় অক্সিজেন ব্যবস্থার বহুবিধ ব্যবহারের কারণে গড়ে ১২ থেকে ১৩টি হাই ফ্লো ব্যবহার করা যাচ্ছে। একই অক্সিজেন ব্যবস্থা থেকে অন্য ওয়ার্ড, অস্ত্রোপচার কক্ষ, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) অক্সিজেন দেওয়া হয়।
তবে তা মানতে রাজি নন হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এস এম হুমায়ুন কবীর। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘রোগী বেড়েছে। আমাদের ৩০০ শয্যা আছে। মেঝেতে রাখা হচ্ছে। রোগীদের তো আমরা ফেরাতে পারব না। অক্সিজেন চাহিদা বেড়েছে। তবে আমাদের সিস্টেমটি অনেক বড়, চাপ বেশি। ফলে হাই ফ্লো এখন আমরা ২০ থেকে ২২টি চালাচ্ছি। আজ (কাল) মেকানিক এসে দেখে গেছেন। হাই ফ্লোয়ের পরিমাণ আরও বাড়াব। যে হাই ফ্লোগুলোয় সমস্যা ছিল, সেগুলোর কিছু কিছু মেরামত করা হয়েছে।’
অন্যদিকে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ১৮৫ শয্যার মধ্যে গতকাল রোগী ছিলেন সব মিলিয়ে ১৯০ জন। হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা মো. তানজিমুল ইসলাম জানান, পরিস্থিতি সামাল দিতে বিভিন্ন খালি জায়গায় শয্যা বসানো হয়েছে। ১৮ শয্যার একটি নতুন ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। তার মধ্যে আরও কয়েকটি অতিরিক্ত শয্যা করা হয়েছে। কিছু রোগীকে সিলিন্ডার দিয়েও অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে।
সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্র জানায়, গতকাল চট্টগ্রামের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে মোট রোগী ছিল ১ হাজার ৭১৬ জন। আইসিইউতে চিকিৎসাধীণ ১৪৭ জন। অথচ এর আগে ২৩ জুলাই সাধরণ শয্যায় ১ হাজার ২৯৩ ও আইসিইউতে ১২১ জন রোগী ছিল।
সিভিল সার্জন সেখ ফজলে রাব্বি প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিদিন রোগী বাড়ছে। চিকিৎসাসেবার সক্ষমতাও বাড়ানো হয়েছে। এরপরও হিমশিম অবস্থা।
চট্টগ্রামে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়ে ১১ জন মারা গেছেন। একই সময়ে নতুন করে ৯২৭ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে। পরীক্ষা বিবেচনায় শনাক্তের হার প্রায় ২৯ শতাংশ। গতকাল চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো করোনা-সংক্রান্ত সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। সরকারি হিসাব অনুসারে, চট্টগ্রামে এ পর্যন্ত ৮২ হাজার ৮৮৬ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে। করোনায় চট্টগ্রামে মারা গেছেন মোট ৯৭৩ জন।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ৩ হাজার ১৯৩ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। শনাক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে নগরের ৫৩২ জন ও উপজেলার ৩৯৫ জন। মারা যাওয়া ব্যক্তিদের ছয়জন শহরের ও অপর পাঁচজন উপজেলার বাসিন্দা।