মাছ, সবজি, ফল ও ভেষজ পণ্য শুকানোর জন্য বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় উদ্ভাবিত যন্ত্র হাইব্রিড ড্রায়ার। শনিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি প্রকৌশল কারখানায়
মাছ, সবজি, ফল ও ভেষজ পণ্য শুকানোর জন্য বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় উদ্ভাবিত যন্ত্র হাইব্রিড ড্রায়ার। শনিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি প্রকৌশল কারখানায়

এক যন্ত্রেই শুকানো যাবে মাছ, সবজি ও ফল

মাছ, সবজি ও ফল—তিনটি ভিন্ন পণ্য হলেও একই যন্ত্রে নিরাপদভাবে শুকানো সম্ভব। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি) উদ্ভাবিত ‘বিএইউ-এডিআই হাইব্রিড ড্রায়ার’ সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিচ্ছে। সৌরশক্তি ও বিদ্যুতের সমন্বিত প্রযুক্তিতে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে মাছ, সবজি, ফল ও ভেষজ পণ্য স্বাস্থ্যসম্মতভাবে শুকানো যায়। দেশি সহজলভ্য উপকরণ দিয়ে তৈরি হওয়ায় এটি সাশ্রয়ী এবং কৃষক ও উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যবহারেও সহজ।

‘কৃষিপণ্য ও মৎস্যের ফসলোত্তর অপচয় হ্রাসে প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবনী’ প্রকল্পের সমাপনী কর্মশালার মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে উদ্ভাবিত প্রযুক্তি নিয়ে এ কথা বলেন প্রধান গবেষক এবং কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগের অধ্যাপক চয়ন কুমার সাহা। আজ শনিবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের ডিন কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে এ সমাপনী কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়।

কর্মশালার সভাপতিত্ব করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের ডিন অধ্যাপক মো. আবদুল মজিদ। প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ কে ফজলুল হক ভূঁইয়া। বিশেষ অতিথি ছিলেন মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান ঝুঁকি কর্মকর্তা মো. জাকির হোসাইন, মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা তাপস চন্দ্র পাল এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) বাংলাদেশের প্রিসিশন অ্যাগ্রিকালচার ও টেকনিক্যাল স্পেশালিস্ট অধ্যাপক মো. মঞ্জুরুল আলম।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে প্রধান গবেষক বলেন, ‘বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১১৮ ধরনের কৃষিপণ্য ও মৎস্য ৫০টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। তবে ফসলোত্তর অপচয় বড় একটি চ্যালেঞ্জ। গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে ফল ও সবজির গড়ে প্রায় ৩২ শতাংশ এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশের বেশি অপচয় হয়। মাছের ক্ষেত্রে এই হার ৭ থেকে ২৯ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছায়।’ এই প্রেক্ষাপটে উদ্ভাবিত হাইব্রিড ড্রায়ার প্রযুক্তি একটি কার্যকর সমাধান বলে উল্লেখ করেন অধ্যাপক চয়ন কুমার সাহা।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ধাবিত হাইব্রিড ড্রায়ার দিয়ে শুকানো বিভিন্ন পণ্য।শনিবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের সম্মেলন কক্ষে

যন্ত্রটির প্রযুক্তিগত দিক তুলে ধরে এই অধ্যাপক বলেন, ‘এটিকে হাইব্রিড বলার কারণ হলো—এটি সৌরশক্তি ও বিদ্যুতের সমন্বয়ে পরিচালিত হয়। দিনের বেলা সম্পূর্ণ সৌরশক্তিতে এবং রাতে কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়ায় বিদ্যুৎ চালিত হিটিং সিস্টেমের মাধ্যমে শুকানোর প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে। এতে আইওটিভিত্তিক স্মার্ট নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আছে। মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও বায়ুপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। সৌরশক্তি কমে গেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৈদ্যুতিক হিটার চালু হয়ে ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন শুকানোর সুবিধা নিশ্চিত করে। প্রতিটি ব্যাচে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ কেজি পণ্য শুকানোর সক্ষমতা রয়েছে এবং পুরো প্রক্রিয়াটি পোকামাকড়, ধুলা ও দূষণমুক্ত নিরাপদ পরিবেশে সম্পন্ন হয়।’

প্রধান গবেষক জানান, রোদে শুকানোর তুলনায় এ প্রযুক্তি ব্যবহার করলে খাদ্যের পুষ্টিগুণ ৮০ থেকে ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত বজায় রাখা সম্ভব। যন্ত্রটির দাম ২ লাখ টাকা। দেশে সহজেই পাওয়া যায় এমন উপাদান দিয়েই এটি প্রস্তুত করা হয়েছে। এ জন্য রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবহারপ্রণালি খুবই সহজ। পাশাপাশি নাইট্রোজেন গ্যাস–সমৃদ্ধ প্যাকেজিং ও ভ্যাকিউম প্যাকেজিং ব্যবস্থার মাধ্যমে শুকানো পণ্যের বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য ও পুষ্টিগুণ দীর্ঘ সময় ধরে সংরক্ষণ করা সম্ভব।

প্রকল্পের আওতায় ২০টি হাইব্রিড ড্রায়ার নির্মাণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্পের অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মতি উল হাসান। এর মধ্যে ১১টি ড্রায়ার ইতিমধ্যে কক্সবাজার, সাতক্ষীরা, টাঙ্গাইল, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে মাঠপর্যায়ে ব্যবহৃত হচ্ছে; ৩টি ড্রায়ার গবেষণার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং বাকিগুলোও মাঠপর্যায়ে বিতরণের কাজ চলমান।

হাইব্রিড সোলার ড্রায়ার ব্যবহার করে লাভবান হচ্ছেন পটুয়াখালীর চরমন্তাজ শুঁটকি উৎপাদনকারী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক নূর শাহিদা। তিনি বলেন, ‘আগে আমরা রোদে মাছ শুকাতাম। ছোট বা পাতলা মাছগুলো ভালোভাবে শুকানো গেলেও মোটা মাছ ভালোভাবে শুকানো যেত না। বারবার রোদে উল্টেপাল্টে দিয়েও অনেক সময় লাগত। পিঁপড়া বা পোকার আক্রমণে পুরো ব্যাচের মাছ বাদ হয়ে যেত। এখন এই ড্রায়ারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সব ধরনের মাছ শুকাতে পারছি। রোদ, বৃষ্টি কোনো কিছুতেই সমস্যা হচ্ছে না।’

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভাবনী প্রকল্পের সমাপনী কর্মশালা। শনিবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের সম্মেলনকক্ষে

উপাচার্য অধ্যাপক এ কে ফজলুল হক ভূঁইয়া বলেন, গবেষণাটি প্রয়োজনভিত্তিক ও সময়োপযোগী। এ ধরনের মানসম্মত গবেষণা কার্যক্রমে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সব সময় সহযোগিতা করে আসছে। প্রকল্পটির বিভিন্ন প্রতিপাদ্য বিষয়কে সমন্বিতভাবে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হচ্ছে। আশা করছেন, এই গবেষণার মাধ্যমে ফসলের অপচয় কমিয়ে রপ্তানির দিকে তাঁরা অগ্রসর হতে পারবেন।