এবারের পবিত্র ঈদুল ফিতরের ফিরতি ট্রেনযাত্রার শেষ দিন ছিল গত ২৮ মার্চ। টানা ছুটি শেষে পরিবার নিয়ে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় যাওয়ার জন্য সোনার বাংলা এক্সপ্রেস ট্রেনের টিকিট কেটেছিলেন চাকরিজীবী মো. শাহজাহান। স্ত্রী ও ছেলেদের নিয়ে নির্ধারিত সময়ের আগেই চট্টগ্রাম স্টেশনে এসে পৌঁছান তিনি। কিন্তু শুরুতেই বিপত্তির মুখে পড়েন তাঁরা। বিকেল ৫টায় ট্রেন ছাড়ার কথা থাকলেও তা ছাড়েনি। ছেড়েছে নির্ধারিত সময়ের ৫৩ মিনিট দেরিতে।
এমন দেরির কারণ ছিল ইঞ্জিনসংকট। ইঞ্জিনসংকটের কারণে ট্রেন দেরিতে ছাড়ার এটি একটিমাত্র উদাহরণ। এ রকম ঘটনা এখন প্রায় সময় ঘটছে। কখনো কখনো সময় মেনে ট্রেন ছাড়লেও মাঝপথে বিকল হয়ে পড়ছে ইঞ্জিন। এসব কারণে গন্তব্যে পৌঁছাতে বাড়তি সময় লাগছে যাত্রীদের।
এবারের ঈদুল আজহায়ও টানা ছুটি রয়েছে। ট্রেনে ঈদযাত্রা শুরু হয়েছে আজ শনিবার থেকে। ঈদুল ফিতরের মতো এবারও নির্বিঘ্ন ও স্বস্তিতে ট্রেনযাত্রা নিয়ে যাত্রীদের মধ্যে শঙ্কা রয়েছে।
রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের কর্মকর্তারা বলছেন, সময়সূচি মেনে ট্রেন চালাতে যে পরিমাণ ইঞ্জিন থাকার দরকার, তা রেলের কাছে নেই। প্রয়োজনের তুলনায় অন্তত ৪০ থেকে ৪৫টি ইঞ্জিন কম পাওয়া যাচ্ছে। পর্যাপ্ত ইঞ্জিন না থাকায় যা আছে, সেগুলোর ওপর বেশি চাপ পড়ছে। যাত্রা শুরুর আগে ঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণও করা যাচ্ছে না। ফলে যাত্রাপথেই ইঞ্জিন বিকলের ঘটনা ঘটছে বারবার। তবে ঈদযাত্রার জন্য ৮৮টি ইঞ্জিন প্রস্তুত করা হচ্ছে বলে দাবি করেছেন রেল কর্মকর্তারা।
রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের প্রধান যান্ত্রিক প্রকৌশলী সাদেকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘ইঞ্জিনসংকট রয়েছে। তবে ঈদযাত্রায় যাতে যাত্রীরা নির্বিঘ্নে গন্তব্যে যেতে পারেন, সে জন্য আমরা অতিরিক্ত ইঞ্জিন প্রস্তুত করছি। আশা করছি, সময় মেনে ট্রেন ছাড়বে এবং নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাবে।’
রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের কর্মকর্তারা বলছেন, সময়সূচি মেনে ট্রেন চালাতে যে পরিমাণ ইঞ্জিন থাকার দরকার, তা রেলের কাছে নেই। প্রয়োজনের তুলনায় অন্তত ৪০ থেকে ৪৫টি ইঞ্জিন কম পাওয়া যাচ্ছে।
ইঞ্জিনসংকটে ট্রেন চালাতে হিমশিম
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় লাখো কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। তবে রেললাইন, স্টেশন নির্মাণসহ অবকাঠামোগত উন্নয়নে নজর ছিল বেশি। কিন্তু ট্রেন চালানোর জন্য ইঞ্জিন ও কোচ সংগ্রহে মনোযোগ ছিল কম। সর্বশেষ ইঞ্জিন কেনা হয়েছিল ২০২০ সালে। এর মধ্যে পুরোনো ইঞ্জিনগুলোর বেশির ভাগ অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল পার হয়ে গেছে। এতে ইঞ্জিনের সমস্যা প্রকট হয়েছে।
রেলওয়ের কর্মকর্তাদের মতে, রেলের বর্তমান সময়সূচি অনুযায়ী সব কটি ট্রেন চালাতে হলে রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের দরকার ১১৯টি ইঞ্জিন। বর্তমানে পণ্যবাহী, লোকালসহ বেশ কিছু ট্রেন বন্ধ রয়েছে। এখন যেসব ট্রেন চলছে, তার জন্যও দরকার ৮৮টি ইঞ্জিন। কিন্তু বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে ৭০ থেকে ৭৫টি ইঞ্জিন। যদিও কাগজে-কলমে ইঞ্জিন আছে ১২৯টি। বাকিগুলো মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে বর্তমানে ১৬৪টি ট্রেন চলাচল করে। অর্থাৎ ৮২ জোড়া ট্রেন। এর মধ্যে ৫৮টি (২৯ জোড়া) আন্তনগর ট্রেন, ৬০টি কমিউটার ও মেইল ট্রেন, ৮টি কনটেইনার ট্রেন, লোকাল ও মিক্সড ট্রেন চলে ৩৮টি (যার মধ্যে শাটল ট্রেন রয়েছে ১৮টি)।
তিন মাসে দেরিতে ছেড়েছে ২ হাজার ট্রেন
গত ২৮ মার্চ শুধু সোনার বাংলা নয়, ওই দিন আরও তিনটি ট্রেন সময় মেনে ছাড়েনি। এর মধ্যে চট্টগ্রাম স্টেশন থেকে জামালপুরগামী বিজয় এক্সপ্রেস ট্রেন সকাল সোয়া ৯টায় ছাড়ার কথা থাকলেও ছেড়েছে বেলা ১টার পর। দেরি হয়েছে ৪ ঘণ্টা। ইঞ্জিন সরবরাহ দেরি হওয়ায় চট্টগ্রাম থেকে সিলেটগামী পাহাড়িকা এক্সপ্রেস সকাল ৭টা ৫০ মিনিটের পরিবর্তে ছেড়েছিল সাড়ে ৮ ঘণ্টা দেরিতে। কক্সবাজার থেকে আসা ঢাকাগামী পর্যটক এক্সপ্রেস চট্টগ্রাম স্টেশনে ছেড়েছিলে দুই ঘণ্টা দেরিতে।
নির্ধারিত সময়ে ট্রেন না ছাড়ায় ভোগান্তি নিয়েই স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে অপেক্ষা করতে হয় হাজারো যাত্রীদের। ভোগান্তি নিয়ে তা মেনে নেন যাত্রীরা। তবে গত ৩০ এপ্রিল ভিন্ন ঘটনা ঘটে ঢাকার কমলাপুর স্টেশনে। ঢাকা থেকে কিশোরগঞ্জমুখী এগারসিন্দুর গোধূলী ট্রেন ছাড়ার কথা ছিল সন্ধ্যা পৌনে সাতটায়। কিন্তু দুই ঘণ্টায় ইঞ্জিন না আসায় যাত্রীরা স্টেশনে বিক্ষোভ শুরু করেন। তাঁরা ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দেন।
গত ৩০ এপ্রিল ভিন্ন ঘটনা ঘটে ঢাকার কমলাপুর স্টেশনে। ঢাকা থেকে কিশোরগঞ্জমুখী এগারসিন্দুর গোধূলী ট্রেন ছাড়ার কথা ছিল সন্ধ্যা পৌনে সাতটায়। কিন্তু দুই ঘণ্টায় ইঞ্জিন না আসায় যাত্রীরা স্টেশনে বিক্ষোভ শুরু করেন। তাঁরা ‘ভুয়া ভুয়া’স্লোগান দেন।
রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে প্রায় দুই হাজার ট্রেন নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দেরিতে ছেড়েছে। এর মধ্যে আন্তনগর ট্রেন রয়েছে প্রায় সাড়ে ৮০০টি। মেইল ও এক্সপ্রেস ট্রেন রয়েছে ৮০০। লোকাল ট্রেনের সংখ্যা সাড়ে ৩০০।
দুর্ভোগ বাড়াচ্ছে মাঝপথে ইঞ্জিন বিকল
চলতি বছরের প্রথম চার মাসে ১০১ বার ইঞ্জিন বিকল হয়েছে। মার্চ মাসেই ইঞ্জিন বিকল হয় ২৭ বার। ওই মাস ছিল পবিত্র ঈদুল ফিতর। ঈদযাত্রা শুরু হয়েছিল ১৩ মার্চ। ফিরতি যাত্রা শেষ হয় ২৮ মার্চ। এই সময়ে ইঞ্জিন বিকলের ঘটনা ঘটে ১৪ বার। যার মধ্যে ৮টিই আন্তনগর ট্রেনের। অন্যগুলো ছিল মেইল এক্সপ্রেস ও পণ্যবাহী ট্রেন।
গত ১ মে বিকেল ৫টায় চট্টগ্রাম রেলস্টেশন থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যায় সোনার বাংলা এক্সপ্রেস। আখাউড়া ছাড়িয়ে কিছু দূর যাওয়ার পর ইঞ্জিনের ত্রুটির কারণে রাত প্রায় ৮টার দিকে ট্রেনটি হঠাৎ থেমে যায়। আরেকটি ইঞ্জিন এনে ট্রেন ছাড়তে ছাড়তে দুই ঘণ্টা দেরি হয়ে যায়। ট্রেনটি রাত ৯টা ৫৫ মিনিটে কমলাপুর রেলস্টেশনে পৌঁছানোর কথা থাকলেও ওই দিন পৌঁছেছিল রাত প্রায় সাড়ে ১২টায়।
এই ট্রেনের যাত্রী তন্বী পাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘দুই বছরের বাচ্চাকে নিয়ে ট্রেনে ছিলাম। দীর্ঘ সময় আটকে থাকায় ও খুব বিরক্ত হয়ে পড়ে। ঘুম ও খাওয়াদাওয়ার পুরো রুটিনই এলোমেলো হয়ে যায়। চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। শুধু আমি নই, বগিতে আরও অনেক পরিবার ছোট বাচ্চা নিয়ে ভ্রমণ করছিল। সবাই একই দুর্ভোগে পড়েছেন।’
রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারিতে ইঞ্জিন বিকলের ঘটনা ঘটেছে ২১ বার। এর মধ্যে ১২টিই ছিল আন্তনগর ট্রেন। ফেব্রুয়ারি মাসে ইঞ্জিন বিকলের ঘটনা আরও বেড়ে যায়। ওই মাসে হয় ২৫ বার। তার মধ্যে ১৫টি ট্রেন ছিল আন্তনগর। এপ্রিলে ইঞ্জিন বিকল হয়েছিল ২৮ বার। এর অর্ধেকেই ছিল আন্তনগর। ইঞ্জিন বিকলের কারণে ট্রেনগুলো নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছেছে এক থেকে ছয় ঘণ্টা দেরিতে। এ সময়ে যাত্রীদের ট্রেনে অপেক্ষা করতে হয়।
রেলওয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বারবার ইঞ্জিন বিকল হওয়ার জন্য বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। বড় কারণ হচ্ছে, এখন পর্যাপ্ত ইঞ্জিন নেই। তাই ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক রাখতে যা আছে, তার সব কটি ব্যবহার করতে হচ্ছে। ফলে ইঞ্জিনগুলো প্রয়োজনীয় ‘বিশ্রাম’ পাচ্ছে না। আবার ইঞ্জিনগুলো রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির সংকট রয়েছে। এ ছাড়া কারখানায় ইঞ্জিন মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল নেই। এসব কারণে যাত্রাপথেই ইঞ্জিন বিকলের ঘটনা বাড়ছে।