রাজশাহীর বাঘা উপজেলায় পদ্মার নদীর ঘাটের সঙ্গেই গুলিবিদ্ধ হয়ে নিখোঁজ স্বপন ব্যাপারীর বাড়ি। নদীতে তাঁকে খুঁজছেন স্বজনেরা। নদীর দিকে চেয়ে আছেন বাড়ির নারীরা। আজ বুধবার দুপুরে উপজেলার চর কালীদাসখালী গ্রামে
রাজশাহীর বাঘা উপজেলায় পদ্মার নদীর ঘাটের সঙ্গেই গুলিবিদ্ধ হয়ে নিখোঁজ স্বপন ব্যাপারীর বাড়ি। নদীতে তাঁকে খুঁজছেন স্বজনেরা। নদীর দিকে চেয়ে আছেন বাড়ির নারীরা। আজ বুধবার দুপুরে উপজেলার চর কালীদাসখালী গ্রামে

পদ্মা নদীতে নৌকা নিয়ে গুলিবিদ্ধ স্বপন ব্যাপারীর লাশ খুঁজছেন স্বজনেরা

বাড়িতে এসে গুলি করে স্বপন ব্যাপারীকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ৪৮ ঘণ্টা পরও তাঁর কোনো সন্ধান মেলেনি। পরিবারের পক্ষ থেকে নৌকা নিয়ে পদ্মা নদীতে স্বজনেরা লাশ খুঁজে বেড়াচ্ছেন।

এ ব্যাপারে থানায় মামলা হলেও পুলিশ বলছে, লাশ যেহেতু পাওয়া যায়নি, সে জন্য আপাতত মামলাটিকে হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণ করা হয়নি। বাদীর বর্ণনা অনুযায়ী মামলা নেওয়া হয়েছে। লাশ পাওয়া গেলে মামলাটা হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হবে।

রাজশাহীর বাঘা উপজেলার চক রাজাপুর ইউনিয়নের কালীদাসখালী গ্রামের সিদ্দিক ব্যাপারী ছেলে স্বপন ব্যাপারীকে গত সোমবার দিবাগত রাত ১১টা ৪০ মিনিটে বাড়ির সামনে এসে একদল লোক গুলি করে। পরে তারা তাঁকে নৌকায় তুলে নিয়ে চলে যায়। ওই ব্যক্তিরা দুটি নৌকা নিয়ে এসেছিল।

পুলিশ লাশ না পাওয়া পর্যন্ত তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেনি। তবে তাঁর পরিবারের দাবি, স্বপন ব্যাপারী আর বেঁচে নেই। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তাঁর শরীর থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। এত রক্তক্ষরণের পর মানুষ বেঁচে থাকতে পারে না।

সিদ্দিক ব্যাপারীর বাড়ির সঙ্গেই পদ্মা নদী। স্বপন সম্প্রতি বাবার বাড়ি থেকে কয়েক গজ দূরে আলাদা বাড়ি করেছেন। তাঁর একটি মুদিদোকান আছে। বাড়ির পাশে নদীতে বালু তোলার ৩৩টি ড্রেজার ছিল। স্বপনের দোকান থেকে ড্রেজারের লোকেরা তেল কিনতেন। স্বপন ব্যাপারীর এক ছেলে ও এক মেয়ে। ছেলে নবম শ্রেণিতে পড়ে আর মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন।

স্বপনের মা রোকেয়া বেগম বলেন, সোমবার রাতে তাঁর ছেলে এসে গরমের কারণে তাঁদের বাড়ির সামনে বাতাসে বসেছিলেন। তখন বাড়ির সামনে ড্রেজারের বালু তোলার ৪-৫ জন লোক এসে বসে। কিছুক্ষণ পরই দুটি নৌকা এসে ভেড়ে। নৌকায় থাকা ব্যক্তিরা তাঁর ছেলের কাছে জানতে চায়, ‘তুই এখানে কেন?’ তাঁর ছেলে জবাব দেন, ‘এটা আমার বাড়ি।’ তিনবার তিনি জবাব দেন, ‘এটা আমার বাড়ি।’ চারবারের বেলায় তাঁর ছেলে বলেন, ‘এটা আমার বাপের বাড়ি।’ বলার সঙ্গে সঙ্গে তারা গুলি চালায়।

স্বপন ব্যাপারীর মা রোকেয়া বেগম বলেন, এ কথা শুনে তিনি ঘরের জানালা খোলেন। জানালার পাশে ৬ জন দাঁড়িয়েছিল। তারা হুমকি দিয়ে বলেছিল, ‘জানালা বন্ধ কর, না হলে তোরে গুলি করব। না হলে অ্যাসিড দিয়ে পুড়িয়ে দেব।’

এ ঘটনায় মঙ্গলবার সিদ্দিক ব্যাপারী বাঘা থানায় কোনো আসামির নাম উল্লেখ না করে একটি মামলা করেন। এ মামলায় আজ বুধবার বেলা দুইটা পর্যন্ত পুলিশ কাউকে আটক করেনি।

এদিকে ছেলের কোনো সন্ধান না পেয়ে সিদ্দিক ব্যাপারী পরিবারের লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে পদ্মা নদীতে ছেলের লাশ খুঁজে বেড়াচ্ছেন। তাঁরা দেখছেন, ২৪ ঘণ্টা পার হয়ে গেছে, কোথাও লাশ ভেসে উঠেছে কি না।

গুলিবিদ্ধ ও নিখোঁজ স্বপন ব্যাপারী

স্বপনের চাচা আঞ্জুর আলীকে (৫৭) আজ দুপুরে গিয়ে ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়। তিনি বলেন, এখানে অসংখ্য গুলি হয়েছে। তাঁর ভাইয়ের বাড়ির সামনে গুলি করে ছেলেকে হত্যা করার পর ওই ব্যক্তিরা প্রতিবেশী আলম বিশ্বাসের বাড়ির সামনেও ফাঁকা গুলি করছে, যাতে তাঁরা বাড়ি থেকে বের না হন। তারপর স্বপন ব্যাপারীর দোকানের সামনে কেউ গুলি করেছে এবং অকথ্য ভাষায় গালাগালি করেছে। তখন স্বপন ব্যাপারীর স্ত্রী বাবলি বেগম (৩০) তাঁর ছেলেকে নিয়ে পালিয়ে যান। তিন বাড়ি পরের একটি বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেন।

বাবলি বেগম আজ দুপুরে বলেন, বাড়ির নিচে নদীতে ৩৩টি ড্রেজার ছিল। তাঁর স্বামীকে গুলি করে হত্যা করার পর সব ড্রেজার নিয়ে চলে যায়। রাতে তাঁকে অজানা একটা নম্বর থেকে ফোন করা হয়েছিল। পরিচয় জানতে চাইলে তিনি বলেছেন, কুমিল্লা থেকে বলছেন। তারপর তিনি ফোন কেটে দিয়েছেন। এরপর আরও তিনবার ফোন দিয়েছে, কিন্তু ভয়ে তিনি ফোন ধরেননি। তাঁরা এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে আছেন।

এ ব্যাপারে রাজশাহী জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত উপপুলিশ সুপার সাবিনা ইয়াসমিন প্রথম আলোকে বলেন, স্বপন ব্যাপারীর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। পুলিশ ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত করছে। নিখোঁজ স্বপন ব্যাপারী জীবিত নাকি মারা গেছেন, তা–ও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

এর আগে গত বছরের ২৭ অক্টোবর পদ্মাচরের খড় কাটাকে কেন্দ্র করে গোলাগুলিতে নাজমুল হোসেন ও আমান মণ্ডল নিহত হন। পরদিন এই গোলাগুলিতে নিহত লিটন ঘোষের লাশ পদ্মা নদীর কুষ্টিয়া এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়। এরপর গত ৩ জানুয়ারি পদ্মা নদীর পলাশী ফতেপুর করারী নওশারা চরে সোহেল রানার বাড়িতে ঢুকে হামলাকারীরা গুলি করে সোহেল রানাকে হত্যা করে।