সন্তানদের সঙ্গে বর্গাচাষি জিয়াউল মিয়া ও জেসমিন আক্তার দম্পতি। হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ উপজেলার বিরাট এলাকার একটি খলায়
সন্তানদের সঙ্গে বর্গাচাষি জিয়াউল মিয়া ও জেসমিন আক্তার দম্পতি। হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ উপজেলার বিরাট এলাকার একটি খলায়

‘আমরার ঈদ নিসেগা ইবার, সব গেহস্ত মরা ইবার’

হাওরের বুক চিরে এগিয়েছে হবিগঞ্জ শহর থেকে বানিয়াচং উপজেলা সদরগামী সড়কটি। উভয় পাশে এখানে-সেখানে ছড়িয়ে থাকা জারুলগাছে ফুটেছে বেগুনি ফুল। এমন সৌন্দর্য অনুভব হঠাৎ ম্লান হয়ে যায় দমকা হাওয়ায় ভেসে আসে পচা খড় ও ধানের গন্ধে।

সামনে এগোতেই দেখা যায়, আঁকাবাঁকা সড়কের ধারে বসে ভেজা খড় থেকে ধান বের করার চেষ্টা করছেন বানিয়াচং উপজেলার কৃষক সাহেব আলী। তাঁর দাবি, এবারের আকস্মিক বৃষ্টিতে খাগাপাশা হাওরের পানিতে তাঁর প্রায় ৭ কিয়ার (১ কিয়ার = ৩০ শতাংশ) জমির পাকা ধান তলিয়েছে। কোথাও কোমর, আবার কোথাও গলাসমান পানিতে ডুবে যে ধান তুলে আনতে পেয়েছেন, তা সাকল্যে ৫০ মণ হতে পারে। অথচ ঠিক আগের বছর একই জমি থেকে পেয়েছিলেন প্রায় ২০০ মণ ধান।

সাহেব আলী একা নন, চলতি বছরের বৈশাখ মাসে অতিবৃষ্টিতে হবিগঞ্জের হাজার হাজার কৃষকের বোরো ধান হাওরের পানিতে তলিয়ে যায়। অথচ কৃষকেরা স্বপ্ন দেখেছিলেন, কোরবানির ঈদের ঠিক আগে আগে হাওরের একমাত্র ফসলটি ঘরে তুলবেন। এরপর সপরিবার মেতে উঠবেন আনন্দ উদ্‌যাপনে। বাস্তবতা উপলব্ধি করে অনেক কৃষকের স্বপ্নের ঘোর কেটেছে। আবার অনেকেই পচে যাওয়া খড়কুটো থেকে বের করছেন সোনা রং খোয়ানো মলিন ধান। বলছেন, এই ধান মানুষের জন্য নয়, হাঁসের খাবার হিসেবে হয়তো কিনতে পারে কেউ কেউ।

বানিয়াচং উপজেলার কৃষক পরিবারের তরুণ সালমান ফারসি বলেন, তাঁদের মোট ৪ কিয়ার জমির ধান তলিয়েছিল। এর মধ্যে এক কিয়ার থেকে যা ধান পেয়েছেন, সেগুলো মোটেও খাওয়ার উপযোগী নয়। হাঁসকে খাওয়ানোর জন্য প্রস্তুত করা এগুলো।

পানিতে ডুবে থেকে নষ্ট হওয়া ধান। পাশেই তুলনামূলক ভালো ধান রোদে শুকাচ্ছিলেন কৃষাণী

হাইট্টার হাওরে মোট ১১ কিয়ার জমিতে এবার বোরো ধানের চাষ করেছিলেন আজমিরীগঞ্জ পৌরসভার ফতেহপুর এলাকার বর্গা চাষি জিয়াউল মিয়া (৪০)। বৈশাখের আকস্মিক বৃষ্টির পর ডুবে থাকা চার কিয়ার জমির ধান তুলতে পেরেছেন। আজমিরীগঞ্জ অ্যামালগেমেটেড বীর চরণ সরকারি পাইলট মডেল উচ্চবিদ্যালয়–সংলগ্ন খলায় দাঁড়িয়ে তিনি দাবি করেন, আগেরবার এসব জমি থেকে প্রায় ৩০০ মণ ধান পেয়েছিলেন। এবার ৩০ মণ ধানও পাবেন কি না সন্দেহ। এখন তাই দিশাহারা অবস্থায় তিনি। ঋণের টাকায় চড়া মজুরিতে শ্রমিক নিয়ে সাঁতারপানি থেকে ধান কেটেছেন। সেই ফসল আবার নৌকায় নিয়ে আসা থেকে হারভেস্টার মেশিনে ধান বের করা পর্যন্ত তাঁর যে পরিমাণ টাকা খরচ হয়েছে, এখন তা–ও পাবেন না বলে দাবি তাঁরা।

তুলনামূলক উঁচু হাওরের ধান এই সময়ে কেটে নিয়ে যাচ্ছিলেন কৃষকেরা। আজমিরীগঞ্জ উপজেলার জলসুখা এলাকায়

জিয়াউলের ভাষ্য, ‘ধান কাইট্টাও লস। নিঃস্ব হয়ে গেছি। যে ট্যাকা খেতে খরচ, তা–ও উঠত না।’ জিয়াউল যখন এসব বলছিলেন, তখন অদূরে মলিন ধান শুকাচ্ছিলেন তাঁর স্ত্রী জেসমিন আক্তার (৩৫)। জেসমিনের আঁচল ধরে ঘুরঘুর করছিল পিঠাপিঠি তিন শিশু সন্তান। দুই মেয়ে ও এক ছেলের বয়স ৬ থেকে ৮–এর মধ্যে। আসন্ন ঈদে তাঁরা নতুন জামা পেয়েছে কি না, তা জানতে চাইতেই নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকে ওরা। জেসমিন বলে ওঠেন, ‘আল্লাহ আমরার ঈদ নিসেগা ইবার। সব গেহস্ত মরা ইবার।’ পাশ থেকে নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে জিয়াউল বলে ওঠেন, ‘ঈদে এক কেজি তেল আনার মতো পয়সা পর্যন্ত তো নাই।’

কোনো কৃষকই ক্ষতি থেকে রক্ষা পাননি

হবিগঞ্জ সদর, বানিয়াচং ও আজমিরীগঞ্জ উপজেলার অন্তত ৩০টি কৃষক পরিবারের সঙ্গে সম্প্রতি কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তাদের মধ্যে অধিকাংশই জানিয়েছে, এবারের বৃষ্টিতে হাওরের কোনো কৃষকই ক্ষতির কবল থেকে রক্ষা পাননি। ভাটি এলাকার কৃষকদের অনেকেই নিজেদের সবটুকু ফসল হারিয়েছেন। আর যাঁরা সাহস করে নিজেরা কিংবা চড়া দামে শ্রমিক নিয়ে পানির নিচ থেকে ধান তুলেছেন, তাঁরা যা পেয়েছেন, তা দিয়ে খরচও উঠবে না। এ ছাড়া তুলনামূলক উঁচু জমিতে যেসব কৃষকের ধান ছিল, তাঁরাও সার্বিকভাবে ক্ষতি এড়াতে পারেননি। অসময়ের বৃষ্টিতে এসব জমিতে ধানের ফলন কম হয়েছে।

সড়কের ধারে গাড়িতে ধানের আঁটি তুলতে তুলতে আজমিরীগঞ্জ উপজেলার জলসুখা এলাকার কৃষক মনির মিয়া বলেন, পুবেরবন হাওরে তুলনামূলক উঁচু জমিতে তাঁর ছয় কিয়ার জমির খেত। গত বছর সেসব জমি থেকে ১২০ মণ ধান পেয়েছিলেন। এবার অসময়ে অতিবৃষ্টির কারণে ৭০ মণ ধানও হবে কি না সন্দেহ তাঁর।

নিজের নষ্ট হওয়া ধানের কথা বলতে গিয়ে আপ্লুত হয়ে পড়েন কৃষক অলি মিয়া। অবশিষ্ট ধান বিক্রি করছিলেন আজমিরীগঞ্জ উপজেলার বিরাট এলাকায় আজমিরীগঞ্জ-হবিগঞ্জ সড়কের পাশে

হবিগঞ্জ–আজমিরীগঞ্জ সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে এক হাজার টাকা মণ দরে ধান কাঁচা ধান বিক্রি করছিলেন আজমিরীগঞ্জ সদর ইউনিয়নের বিরাট এলাকার বাসিন্দা অলি মিয়া (৬৫)। ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে জানতে চাইলে আফসোস করে তিনি বলেন, ‘আমার গেহস্তি নষ্ট হইছে। বৃষ্টির লাগি অনেক ধান কাটতি পারি নাই। যে ধান কাটছি, এতে নিজেরারই কিছু হইতো না।’

ক্ষতিগ্রস্তের তালিকায় নাম রাজনৈতিক বিবেচনায়

হবিগঞ্জে হাওরাঞ্চলের কৃষকদের ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ করে সম্প্রতি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে জেলা প্রশাসন। এ তালিকায় স্থান পাওয়া কৃষকদের তিন ক্যাটাগরিতে (ক শ্রেণিতে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত, খ শ্রেণিতে মধ্যম ক্ষতিগ্রস্ত এবং গ শ্রেণিতে আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত) সহায়তা প্রদান করা হবে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ৭ মে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের এক স্মারকের পরিপ্রেক্ষিতে এ তালিকা পাঠানো হয়। এ তালিকায় জেলার ৯টি উপজেলার মোট ২২ হাজার ৩৭৩ জন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

উপজেলাভিত্তিক তালিকায় দেখা গেছে, সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক আছেন বানিয়াচং উপজেলায়, এ সংখ্যা ৭ হাজার ৮৮৫। এর মধ্যে ক শ্রেণিতে ২ হাজার ৬৩০ জন, খ শ্রেণিতে ৩ হাজার ৩৬৫ জন এবং গ শ্রেণিতে ১ হাজার ৮৯০ জন কৃষক আছেন।

নিজের নষ্ট হওয়া ধান দেখাচ্ছেন বানিয়াচং উপজেলার সুবিদপুর ইউনিয়নের চান্দের মহল্লার কৃষক আবদুর রব

এ ছাড়া নবীগঞ্জ উপজেলায় ৩ হাজার ৬৫২ জন, লাখাইয়ে ৩ হাজার ৩৫০ জন, আজমিরীগঞ্জে ৩ হাজার ৮৫ জন, বাহুবলে ১ হাজার ৮৯৫ জন, শায়েস্তাগঞ্জে ৮০০ জন, মাধবপুরে ৬৩০ জন, হবিগঞ্জ সদরে ৬৪৪ জন এবং চুনারুঘাট উপজেলায় ২৬১ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

এ তালিকায় সবার নাম ওঠেনি বলে অভিযোগ করেছেন ৩০টি পরিবারের অন্তত ১১ জন। তাঁদের অধিকাংশের দাবি, রাজনৈতিক বিবেচনায় তালিকাটিতে তাঁদের তোলা হয়নি। ৪টি পরিবার জানিয়েছে, সরকারি সহায়তার বিষয়ে তাঁরা কোনো তথ্যই জানেন না।

বানিয়াচংয়ের দক্ষিণ-পূর্ব ইউনিয়নের চান্দের মহল্লা এলাকার কৃষক আবদুর রব (৫৫) অভিযোগ তুলে বলেন, ‘সরহারি এক্টা ই আছে, ইতাও পাইছি না আমি। আমরার বিরুদ্ধ হেরা, তাই নামটাম নিসে না। মেম্বারের (ইউপি) দলও না যে আমি। অথচ দলের দেইখা আধা কের (কিয়ার) খেতও করছে না, হেরার নাম দেয়।’

পৃথক সময় ধরে পানিতে ডুবে থাকায় ধানের ভিন্ন ভিন্ন রঙ হয়েছে। সেগুলো এখন রোদে শোকানো হচ্ছে। বানিয়াচং উপজেলার সুবিদপুর ইউনিয়নে

এসব কৃষক পরিবারের সদস্যদের অধিকাংশই বলেছেন, এবারের বছরের মতো ক্ষয়ক্ষতি সাম্প্রতিক সময়ে তাঁরা দেখেননি। তাই প্রকৃতপক্ষে ক্ষতিগ্রস্ত সব কৃষককে সহায়তার দাবি জানিয়েছেন সবাই। এ দাবি জানিয়ে আজমিরীগঞ্জ উপজেলার দুই কৃষক ভাই জুয়েল চৌধুরী (৪৩) ও ওয়াশিক চৌধুরী (৩৪) একযোগে বলেন, এবার কৃষকের মরার বছর। সব কৃষি উপকরণের দাম বেশি। এত ক্ষয়ক্ষতির পরও ধান বিক্রি করে তাঁরা যে দাম পাচ্ছিলেন, তা খুবই কম। কাঁচা ধান ১ হাজার টাকা মণ এবং পাকা ধান ১ হাজার ১০০ টাকা মণ দরে বিক্রি করেন।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রণয়নে দলমত–নির্বিশেষে সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি তুলে সমাজতান্ত্রিক ক্ষেতমজুর ও কৃষক ফ্রন্ট হবিগঞ্জ শাখার সদস্য শফিকুল ইসলাম বলেন, ক্ষতি দল বা মত দেখে হয়নি। সব ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পূর্ণাঙ্গ ক্ষতিপূরণ না পেলেও যাতে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারে, এ বিষয়ে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। এ কারণে সামনের উন্নয়ন বাজেটের ৪০ শতাংশ যেন কৃষিক্ষেত্রে বরাদ্দ রাখা হয়।

১১০০ টাকা মণ দরে সেদ্ধ ধান কিনে গাড়িতে তুলছিলেন পাইকারেরা

ঈদের আগে আগে কৃষকেরা সরকারের সহায়তা পাবেন কি না, তা জানতে চাইলে হবিগঞ্জের ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন বলেন, মন্ত্রণালয়ে তালিকা পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে সরকারের নির্দেশনা মেনে সংশ্লিষ্ট কৃষকদের সহায়তা করা হবে। রাজনৈতিক বিবেচনায় তালিকা থেকে অনেক কৃষকের বাদ পড়ার বিষয়টি নজরে আনা হলে এই কর্মকর্তা বলেন, ওই কৃষকেরা নিজেদের উপজেলার কৃষি অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন। তাঁদের ক্ষতির মাত্রা যাচাই করে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।