
দেশে হামের প্রাদুর্ভাবে হাসপাতালগুলোতে এখন শিশুদের বাঁচাতে নিরন্তর লড়াইয়ে আছেন অনেক মা–বাবা। তেমনই এক মায়ের সঙ্গে কথা হয় সম্প্রতি রাজধানীর মহাখালীতে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে। তিনি এসেছেন গাজীপুর থেকে। গরমের মধ্যেও বড় হিজাব দিয়ে শরীর ঢেকে বিছানায় ছেলের পাশে বসে আছেন। এই নারীর চোখ দুটো শুধু দেখা যাচ্ছে। বয়স খুব বেশি হলে ২৪ বছর, লিকলিকে স্বাস্থ্য। এই নারী জানালেন, স্বামী চাননি বলে হামে আক্রান্ত শিশুটিসহ তাঁর বিভিন্ন বয়সী মোট চার সন্তানের কাউকে কোনো টিকাই দেওয়া হয়নি।
হামে আক্রান্ত শিশুদের খোঁজ নিতে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও একাধিক মায়ের সঙ্গে এক মাসের বেশি সময় ধরে প্রায় নিয়মিতই কথা হচ্ছে। এই মায়েদের বেশির ভাগেরই পরিবারের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নেই। নিজের শারীরিক গঠন ঠিক রাখা বা ফিটনেস নিয়ে চিন্তা করার ফুসরত তাঁরা পাচ্ছেন, তেমনটাও মনে হয়নি। বাজারের শিশুদের জন্য তৈরি ফর্মুলা বা গুঁড়া দুধের যে দাম, তাতে এই তিনটি হাসপাতালে উপস্থিত হওয়া মায়েদের দেখে মনে হয়নি যে তাঁদের তা কেনার সামর্থ্য আছে।
এই কথাগুলো লেখার কারণ সম্প্রতি ওঠা একটি দাবি। হামে একের পর এক শিশুর মৃত্যুর প্রেক্ষাপটে ১৩ মে ইনকিলাব মঞ্চের এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের বলেন, ‘ফিটনেস হারানোর ভয়ে’ সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না ৫৫ শতাংশ মা। পরদিনই অবশ্য তিনি তাঁর ফেসবুক পোস্টে বক্তব্যের কিছুটা সংশোধনী দেওয়ার চেষ্টা করেন। তিনি লেখেন, ডয়চে ভেলের একটা ‘গবেষণায়’ দেখা গেছে, প্রায় ৫৫ শতাংশ মা শিশুদের বুকের দুধ পান করাচ্ছেন না। ফলে এই শিশুদের ইমিউনিটি তৈরি হচ্ছে না।
এর পাশাপাশি আবদুল্লাহ আল জাবের বলেন, ৫৫ শতাংশের মধ্যে অনেকেই রয়েছেন, যাঁরা নানাবিধ সমস্যায় সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারেন না। এই ‘অনেকেই’ শব্দটি আগে না বলায় তাঁর কথার ভুল ব্যাখ্যা হচ্ছে। তাই তিনি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছেন।
আবদুল্লাহ আল জাবের ‘গবেষণা’ বললেও এটি আসলে ছিল ডয়চে ভেলে বাংলার একটি সংবাদ প্রতিবেদন। ওই প্রতিবেদনে ডা. লেলিন চৌধুরীকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছিল, ‘গবেষণায় দেখা গেছে, একটি শিশু যদি মায়ের বুকের দুধ খায়, তাহলে ছয় মাস পর্যন্ত তার যে ইমিউনিটি তৈরি হবে, তাতে টিকার প্রয়োজন নেই। এর পর থেকে ইমিউনিটি কমতে শুরু করে। সে হিসাবে, ৯ মাস (টিকাদানের বয়স) নির্ধারণ করা হয়েছিল। এখন গবেষণায় দেখা গেছে, ৫৫ শতাংশ মা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না। ফলে এই শিশুদের ইমিউনিটি তৈরি হচ্ছে না।’ তবে তিনি বুকের দুধ না খাওয়ানোর সঙ্গে নারীদের ফিটনেস-চিন্তার কোনো বিষয় বলেননি।
প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর দেশে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে এখন পর্যন্ত (২১ মে) মারা গেছে ৪৮৮ জন। নিশ্চিত ও সন্দেহজনক সংক্রমণের রোগীর সংখ্যা ৫৯ হাজার ছাড়িয়েছে।
ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবেরের এক বক্তব্য থেকে বিতর্কের সূত্রপাত। তিনি দাবি করেন, ‘ফিটনেস হারানোর ভয়ে’ সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না ৫৫ শতাংশ নারী। পরদিন তিনি অবশ্য বক্তব্য সংশোধন করেন। তবে পরে স্বাস্থ্যমন্ত্রীও প্রায় একই কথা বলেন। অবশ্য মায়েদের স্বাস্থ্যগত সংকটের কথাটিও বলেন তিনি।
আমার দেখা রাজধানীর শুধু তিনটি হাসপাতাল নয়, প্রথম আলোর আলোকচিত্র সাংবাদিকেরা রাজধানী এবং ঢাকার বাইরের বিভিন্ন হাসপাতালে হামে আক্রান্ত সন্তানের মায়েদের যেসব ছবি বা ভিডিও পাঠিয়েছেন, তাতে ফিটনেস নিয়ে সচেতন, এমন মায়েদের চেহারা দেখা যায়নি। অপুষ্ট মা ও সন্তানের চেহারাই স্পষ্ট ছিল।
বিশেষজ্ঞরা এবার হামের প্রাদুর্ভাবের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন গত বছরগুলোতে শিশুদের টিকা না পাওয়াকে। পাশাপাশি অপুষ্টিকেও কারণ দেখাচ্ছেন তাঁরা, যেখানে শিশুদের মধ্যে মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর হার কমে যাওয়ার বিষয়টিও রয়েছে। আর এটিই এখন হয়ে উঠেছে নারীদের দায়ী করার উপলক্ষ।
১৭ মে ‘হাম ও ডেঙ্গু রোগ নিয়ন্ত্রণে জনসচেতনতা ও প্রতিরোধই সর্বোত্তম পন্থা’ শীর্ষক জনসচেতনতা সপ্তাহ উদ্বোধন ও বৈজ্ঞানিক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনও হামে শিশুমৃত্যু, শিশুর অপুষ্টির জন্য মায়েদের ঘাড়েই দোষ চাপিয়েছেন। অবশ্য তিনি মায়েদের স্বাস্থ্যগত সংকটের কথাটিও বলেছেন।
মন্ত্রীর বক্তব্যের মূল কথা ছিল, বাচ্চাদের পুষ্টির অভাব, মায়েদের শরীরেও পুষ্টি নেই, কোনো স্বাস্থ্য নেই, চোখ গর্তে, চামড়া উষ্কখুষ্ক, হাড্ডি দেখা যায়। এই মায়েরা ব্রেস্ট ফিডিং করান না। শাল দুধ খাওয়ান না। বাচ্চাদের যে সময়ে গ্রোথ হওয়ার কথা, সেই জিনিসটাই হচ্ছে না।
বুকের দুধ খাওয়ানোর হার কমছে ঠিকই, কিন্তু কেন
জন্মের প্রথম ঘণ্টায় মায়ের দুধ খাওয়ানো, এরপর ছয় মাস পর্যন্ত শুধু মায়ের দুধ খাওয়ানো (এক ফোঁটা পানিও না) এবং এর ধারাবাহিকতায় দুই বছর বা তার বেশি সময় ধরে মায়ের দুধ খাওয়ানো হলে তা শিশুদের শরীরে একটি শক্তিশালী রোগ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলে। এসব কথা চিকিৎসকেরা বরাবরই বলে আসছেন। তবে এটা ঠিক যে দেশে বুকের দুধ খাওয়ানোর হার কমছে।
২০২৩ সালের মার্চ মাসে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ ২০২২’ প্রতিবেদন বলছে, ২০১৭-১৮ সালের তুলনায় ২০২২ সালে ০-৫ মাস বয়সী শিশুদের শুধু বুকের দুধ খাওয়ানোর হার ১০ শতাংশীয় পয়েন্ট কমে ৬৫ শতাংশ থেকে ৫৫ শতাংশ হয়। ২০১৭-১৮ সালে বাড়িতে জন্ম নেওয়া নবজাতকদের এক ঘণ্টার মধ্যে বুকের দুধ খাওয়ানোর হার ছিল ৬৯ শতাংশ, যা ২০২২ সালে নেমে আসে ৪০ শতাংশে।
সরকারের এ প্রতিবেদন বলছে, ৪-৫ মাস বয়সী শিশুদের প্রায় ১৮ শতাংশ বুকের দুধের পাশাপাশি অন্য দুধ খাচ্ছে এবং ২৬ শতাংশ শিশুকে পরিপূরক খাবার দেওয়া হচ্ছে । শিশুদের বোতলে নিপল লাগিয়ে দুধ খাওয়ানোর প্রবণতাও বুকের দুধ খাওয়ানোর হারকে প্রভাবিত করছে।
অর্থাৎ নির্দিষ্ট বয়সের আগে পানি, অন্য দুধ বা পরিপূরক খাবার শুরু করা, জন্মের পর দুধ দিতে দেরি করা এবং বোতলে দুধ খাওয়ানোর মতো অভ্যাসগুলোর কারণেই মায়েরা শিশুদের শুধু বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না। এ প্রতিবেদনে মায়ের ফিটনেস বা শারীরিক সক্ষমতা–সংক্রান্ত সরাসরি কোনো তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।
ফিটনেসের বিষয়টি উচ্চবিত্ত মায়েদের মধ্যে থাকলেও তা ৫ শতাংশের বেশি হবে না।খুরশীদ জাহান, পরিচালক, বাংলাদেশ ব্রেস্টিফিডিং ফাউন্ডেশন
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং জাতিসংঘ শিশু তহবিল ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ২০২৫ সালের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে বলছে, শহরাঞ্চলের এবং উচ্চশিক্ষিত মায়েদের মধ্যে সন্তান জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে বুকের দুধ খাওয়ানোর প্রবণতা তুলনামূলকভাবে কম। এর বড় কারণ হিসেবে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসবের উচ্চহারকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এবার একটু অন্য দেশে ঢুঁ দেওয়া যাক। ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী তুরস্ক একটি আন্তমহাদেশীয় দেশ। ০-২৪ মাস বয়সী শিশুদের মায়েদের শরীরের ধারণা, বিষণ্নতা ও বুকের দুধ খাওয়ানোর মনোভাবের মধ্যকার সম্পর্ক নির্ণয়ে ২০২৩ সালের নভেম্বর মাস থেকে ২০২৪ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত তথ্যের ভিত্তিতে একটি গবেষণা করেছেন দেশটির দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা। তুরস্কের ২৮২ জন মা এই গবেষণায় অংশ নেন। এই মায়েদের ৬৩ শতাংশই উচ্চশিক্ষিত বা বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌকাঠ পেরোনো। এ ছাড়া ৫২ শতাংশ ছিলেন কর্মজীবী। ৫০ শতাংশ সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে।
তুরস্কের বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পরিচালিত গবেষণায় বলা হয়েছে, মায়েদের নিজের শরীর সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা বেশি থাকলে বুকের দুধ খাওয়ানোর হার বাড়ে। মায়েদের মধ্যে বিষণ্নতার মাত্রা বাড়লে হার কমতে থাকে। সন্তানের জন্মের পর মায়েদের ত্বকে ফাটা দাগ, ঝুলে যাওয়া চামড়া ও স্তনের আকারের পরিবর্তন তাঁদের বিচলিত করতে পারে। ওজন বেড়ে যাওয়াও এই নেতিবাচক শারীরিক ধারণার সঙ্গে যুক্ত। তবে এ গবেষণায় অংশ নেওয়া ৫১ শতাংশ নারী জানান, ফিটনেস নয়, বুকে পর্যাপ্ত দুধ না থাকায় সন্তানকে খাওয়ানো বন্ধ করে দিয়েছিলেন তাঁরা।
এই দুধ না আসার অভিজ্ঞতাটি বাংলাদেশের নারীদেরও। এ নিয়ে বাংলাদেশ ব্রেস্টফিডিং ফাউন্ডেশনে ১৮ বছরের কাজের অভিজ্ঞতায় প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক খুরশীদ জাহান প্রথম আলোকে বলেন, নবজাতক সন্তানকে কীভাবে বসে দুধ খাওয়াবেন, তা বুঝতে পারেন না নতুন মায়েরা। সন্তানের জন্মের পর দু–তিন দিন বুকে দুধ কম থাকে, তখন অনেক মায়ের আত্মবিশ্বাস কমে যায়। তিনি ভাবতে থাকেন, তিনি সন্তানকে দুধ খাওয়াতে পারছেন না বা পারবেন না। এ সময় পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকেও ওই মা পর্যাপ্ত সহযোগিতা পান না। কর্মজীবী মা হলে সবেতনে মাতৃত্বকালীন ছুটি না পাওয়া, কর্মক্ষেত্রে শিশুদিবা যত্নকেন্দ্র না থাকার বিষয়টিও প্রভাব ফেলে। আর আইনের ফাঁক গলে গুঁড়া দুধের বিপণন তো আছেই।
ফিটনেসের বিষয়টি উচ্চবিত্ত মায়েদের মধ্যে থাকলেও তা ৫ শতাংশের বেশি হবে না, বলেন খুরশীদ জাহান।
‘বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ ২০২২’ প্রতিবেদন বলছে, ২০১৭-১৮ সালের তুলনায় ২০২২ সালে ০-৫ মাস বয়সী শিশুদের শুধু বুকের দুধ খাওয়ানোর হার ১০ শতাংশীয় পয়েন্ট কমে ৬৫ থেকে ৫৫ শতাংশ হয়। ২০১৭-১৮ সালে বাড়িতে জন্ম নেওয়া নবজাতকদের এক ঘণ্টার মধ্যে বুকের দুধ খাওয়ানোর হার ছিল ৬৯ শতাংশ, যা ২০২২ সালে নেমে আসে ৪০ শতাংশে। তবে বুকের দুধ না খাওয়ানোর পেছনে মায়ের ফিটনেস-ভাবনা রয়েছে, এমন কিছু ছিল না প্রতিবেদনে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফ যৌথভাবে ২০২২ সালে ফর্মুলা দুধের বিপণন ও শিশুখাদ্য নির্বাচনের প্রভাব–বিষয়ক একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। গবেষণার জন্য ২০১৯ সালের আগস্ট মাস থেকে ২০২১ সালের এপ্রিল পর্যন্ত মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। বাংলাদেশ, চীন, মেক্সিকো, মরক্কো, নাইজেরিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, যুক্তরাজ্য ও ভিয়েতনামের শহরগুলোতে ৮ হাজার ৫০০ জন মা–বাবা ও অন্তঃসত্ত্বা নারী এবং ৩০০ স্বাস্থ্যকর্মী গবেষণার জরিপে অংশ নেন।
বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত এ গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশে শিশুকে ছয় মাস বয়স পর্যন্ত এক্সক্লুসিভ ব্রেস্টফিডিংয়ের (শুধু মায়ের বুকের দুধ পান করানো) হার ৬৫ শতাংশ। এই হার মরক্কোতে ৩৫ শতাংশ, দক্ষিণ আফ্রিকায় ৩২ শতাংশ, নাইজেরিয়া ও মেক্সিকোতে ২৯ শতাংশ, ভিয়েতনামে ২৪ শতাংশ ও চীনে ২১ শতাংশ।
বাংলাদেশের ৯৮ শতাংশ অন্তঃসত্ত্বা নারী এক্সক্লুসিভ ব্রেস্টফিডিং করানোর ইচ্ছা পোষণ করেন বলে এই গবেষণায় দেখা গেছে। এটিও অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশি। দেশের মাত্র ২৭ শতাংশ নারী গত এক বছরে ফর্মুলা দুধের বিজ্ঞাপন বা প্রচারণায় প্রভাবিত হয়েছেন, যা অন্যান্য দেশের তুলনায় কম। তবে বিজ্ঞাপনের প্রভাবে ফর্মুলা দুধকে প্রয়োজনীয় মনে করার হার বাংলাদেশে বেশি।
মায়েদের ঘাড়ে দোষ চাপালে আড়াল হবে অন্য সব
বিয়ের ১১ বছর পর ফারজানা ইসলাম-হেলাল ভূঁইয়া দম্পতি সন্তান নিয়েছিলেন আইভিএফ পদ্ধতিতে। ৮ মাস ১৮ দিন বয়সী ছেলে ফাইয়াজ হাসান তাজিম হামে মারা গেছে গত ২২ এপ্রিল। গত মার্চ থেকে তাজিমকে নিয়ে লড়াই শুরু হয়েছিল তার মা-বাবার। ১৭ দিন শুধু হাসপাতালেই খরচ হয়েছে চার লাখ টাকার বেশি।
ফারজানা ফেসবুকে লিখেছেন, ‘নিষ্পাপ শিশুরা মরে যাচ্ছে, এ নিয়ে সংসদে আলাপ নেই। কারও কোনো দায় নেই। কেউ ব্যর্থতা স্বীকার করছে না। সব দোষ মা ও শিশুর। শিশুরা এই দেশে জন্ম নিল কেন? মা সন্তানের জন্ম দিল কেন?’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মায়েদের ওপর দোষ চাপানোর আগে হামে শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার মূল কারণগুলো চিহ্নিত করতে হবে।
হাম নির্মূলের পথে থাকা বাংলাদেশের পথ হারানোর জন্য টিকাদান ব্যাহত হওয়ার বিষয়টিই সবার আগে আসছে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) মাধ্যমে নিয়মিতভাবে দেশের ৯ মাস বয়সী শিশুদের হামের টিকার প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়।
গত ২ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ঢাকা কার্যালয় প্রথম আলোকে জানিয়েছে, বাংলাদেশে গত দুই বছরে শিশুদের নিয়মিত টিকাদানের ক্ষেত্রে যে ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ বা রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ঘাটতি তৈরি হয়েছে, হামের বর্তমান প্রাদুর্ভাবের সেটাই প্রাথমিক কারণ।
হামে সন্তান মারা যাওয়ার জন্য মায়েদের দায়ী করে বিভিন্নজন বক্তব্য দিচ্ছেন। এগুলো ঘটনাকে আড়াল করা হচ্ছে। মায়েদের সম্পর্কে ধারণা না থাকা এবং নারীদের আক্রমণ করার কৌশল এটি।ফওজিয়া মোসলেম, সভাপতি, মহিলা পরিষদ
৫ মে ইউনিসেফের ভারপ্রাপ্ত বাংলাদেশ প্রতিনিধি স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রথম আলোকে বলেন, ইউনিসেফ একাধিকবার অন্তর্বর্তী সরকারের উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করেছে এবং প্রতিটি বৈঠকের পর আনুষ্ঠানিক চিঠির মাধ্যমে টিকার সম্ভাব্য ঘাটতি, রোগের প্রাদুর্ভাব, জটিলতা বৃদ্ধি ও মৃত্যুহারের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছিল।
টিকাদানে ঘাটতির পাশাপাশি হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় রাজধানীসহ দেশের হাসপাতালগুলো যে প্রস্তুত নয়, তা উঠে আসে বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে। শিশুদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের স্বল্পতাসহ নানা সমস্যায় এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ঘুরতে ঘুরতে কোলের সন্তান মারা যাচ্ছে, এমন চিত্র দেখা যাচ্ছে। চিকিৎসা খরচ নিয়েও দিশাহারা হয়ে পড়ছেন অভিভাবকেরা।
বাংলাদেশে মায়েদের পুষ্টিহীনতার বিষয়টি উঠে আসে ২০২৫ সালের ‘বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে’ প্রতিবেদনে। তাতে বলা হয়, দেশের প্রায় ৫৩ শতাংশ অন্তঃসত্ত্বা নারী রক্তস্বল্পতায় ভুগছেন।
মায়েদের পুষ্টি ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রসবপূর্ব সেবা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী অন্তত ৪ বার প্রসবপূর্ব সেবা গ্রহণ করেছেন মাত্র ৪৩ দশমিক ৩ শতাংশ মা। ৮ বার সেবা পেয়েছেন মাত্র ৫ দশমিক ৫ শতাংশ মা।
হামে শিশুদের মৃত্যুতে মায়েদের দায়ী করে নানা বক্তব্য নজরে আসার কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি চিকিৎসক ফওজিয়া মোসলেম, যিনি একজন চিকিৎসকও।
ফওজিয়া মোসলেম প্রথম আলোকে বলেন, ‘হামে সন্তান মারা যাওয়ার জন্য মায়েদের দায়ী করে বিভিন্নজন বক্তব্য দিচ্ছেন। এগুলোতে ঘটনাকে আড়াল করা হচ্ছে। মায়েদের সম্পর্কে ধারণা না থাকা এবং নারীদের আক্রমণ করার কৌশল এটি।’
ফওজিয়া মোসলেম বলেন, হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া শিশুদের বেশির ভাগই ঢাকার বাইরের। এই শিশুদের মায়েদের কতজনের কৌটার দুধ কিনে খাওয়ানোর সামর্থ্য আছে?
পিতৃতান্ত্রিক এই সমাজব্যবস্থায় নারীদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কতটুকু—সেই প্রশ্ন তুলে ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ‘বাল্যবিবাহের শিকার একজন মায়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কতটুকু আছে? এই মায়েদের সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানোর সক্ষমতা আছে কি না, তা–ও দেখতে হবে।’