‘বাংলাদেশ ফার্স্ট: এ ফরেন পলিসি আউটলুক ফর এ নিউ বাংলাদেশ’ শীর্ষক নীতি আলোচনায় উদ্বোধনী বক্তব্য দেন আ ন ম মুনিরুজ্জামান
‘বাংলাদেশ ফার্স্ট: এ ফরেন পলিসি আউটলুক ফর এ নিউ বাংলাদেশ’ শীর্ষক নীতি আলোচনায় উদ্বোধনী বক্তব্য দেন আ ন ম মুনিরুজ্জামান

পররাষ্ট্রনীতিতে জাতীয় স্বার্থ ও কৌশলগত ভারসাম্য জরুরি: আ ন ম মুনিরুজ্জামান

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবধর্মী, ভারসাম্যপূর্ণ ও উন্নয়নমুখী হতে হবে উল্লেখ করে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (বিআইপিএসএস) সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) আ ন ম মুনীরুজ্জামান বলেছেন, বিশ্ব এখন ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জলবায়ু সংকট ও প্রযুক্তিগত রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এমন বাস্তবতায় নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতিতে জাতীয় স্বার্থ ও কৌশলগত পরিকল্পনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

‘বাংলাদেশ ফার্স্ট: আ ফরেন পলিসি আউটলুক ফর আ নিউ বাংলাদেশ’ শীর্ষক নীতি সংলাপের উদ্বোধনী বক্তব্যে এ কথা বলেন আ ন ম মুনীরুজ্জামান। আজ শনিবার বেলা তিনটায় রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে এই আলোচনার আয়োজক ছিল শান্তি ও নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান বিআইপিএসএস। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির।

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রেক্ষাপটে ‘অর্থনৈতিক কূটনীতিকে’ সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে বলে উল্লেখ করেন আ ন ম মুনীরুজ্জামান। একই সঙ্গে বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি। মুনীরুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশের উচিত সব বড় শক্তির সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক ধরে রাখা এবং কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখা।

বক্তব্যে আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন আ ন ম মুনীরুজ্জামান। তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিকতা দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং এ অঞ্চল বিশ্বে সবচেয়ে কম সংযুক্ত অঞ্চলের একটি। সে জন্য আঞ্চলিক সংগঠনগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নিতে হবে।

রোহিঙ্গা সংকটকে সরকারের অন্যতম বড় অগ্রাধিকার উল্লেখ করে এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেন, রোহিঙ্গাদের সম্মান, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করে নিজ দেশে প্রত্যাবাসনে সরকারকে কঠোর ও উদ্ভাবনী কৌশলে কাজ করতে হবে।

জলবায়ু কূটনীতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন আ ন ম মুনীরুজ্জামান। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।

এ ছাড়া বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক সামুদ্রিক নিরাপত্তাকে বাংলাদেশের কৌশলগত স্বার্থের অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন বিআইপিএসএসের প্রেসিডেন্ট। একই সঙ্গে জনকূটনীতি ও ‘সফট পাওয়ার’ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন তিনি।

‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিতে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি

নীতি আলোচনায় মূল প্রবন্ধ তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। তিনি বলেছেন, নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য হবে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’—অর্থাৎ জাতীয় স্বার্থ ও উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া। তবে এর অর্থ কোনো ধরনের বিচ্ছিন্নতাবাদ নয়; বরং বিশ্বব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থেকে দেশের স্বার্থকে এগিয়ে নেওয়া।

হুমায়ুন কবির বলেন, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। একক শক্তির আধিপত্য কমছে, বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা বাড়ছে, প্রযুক্তি ও জলবায়ু পরিবর্তন বৈশ্বিক রাজনীতির কেন্দ্রীয় ইস্যু হয়ে উঠছে। এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে আরও কৌশলগত, পেশাদার ও নমনীয় হতে হবে।

অতীতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি অনেক সময় ‘কৌশলগত’ না হয়ে ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ ছিল উল্লেখ করে হুমায়ুন কবির বলেন, গত প্রায় দুই দশকে দেশ ‘একটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের’ ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এতে কূটনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাও পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টকে বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি ‘টার্নিং পয়েন্ট’ উল্লেখ করে হুমায়ুন কবির বলেন, ওই সময়ের পর দেশ নতুন পথে এগোতে শুরু করেছে।

প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা বলেন, বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রনীতির তিনটি মূল দিক থাকবে—কোনো নির্দিষ্ট দেশকেন্দ্রিক নীতি নয়; বহুমুখী কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং পরিবর্তিত বাস্তবতায় নমনীয়তা। পররাষ্ট্রনীতি কখনো স্বল্পমেয়াদি বা সংকীর্ণ রাজনৈতিক বিবেচনায় পরিচালিত হতে পারে না। এটি হতে হবে জাতীয় স্বার্থনির্ভর, প্রাতিষ্ঠানিক ও পেশাদার।

দীর্ঘ বক্তব্যে বিএনপির নেতৃত্বে যাত্রা শুরু করা নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতির পাঁচটি প্রধান স্তম্ভ তুলে ধরেন হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, সার্বভৌমত্ব ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের ভিত্তিতে বাংলাদেশ সবার সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে, তবে কোনো দেশের ওপর নির্ভরশীল হবে না। পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে অর্থনৈতিক কূটনীতি ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক। পাশাপাশি সার্ক ও বিমসটেককে সক্রিয় করে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, বাণিজ্য ও জ্বালানি সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হবে। জনগণকেন্দ্রিক কূটনীতির অংশ হিসেবে প্রবাসী শ্রমিক, শিক্ষার্থী ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্বার্থ রক্ষার কথাও বলেন তিনি।

হুমায়ুন কবির বলেন, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল এখন বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। বাংলাদেশ সেখানে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক, উন্মুক্ত ও সহযোগিতামূলক’ অবস্থান নেবে। তবে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পক্ষও নেবে না।

হুমায়ুন কবির বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পরিসরে সক্রিয় ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আরও পেশাদার ও কৌশলগতভাবে শক্তিশালী করা হবে। তিনি জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির সমন্বয়ের ওপর জোর দিয়ে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর কথা বলেন। পাশাপাশি গণতন্ত্র, সুশাসন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ছাড়া আন্তর্জাতিক মর্যাদা অর্জন সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

নীতি সংলাপে যোগ দেন বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিরা। তাঁদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ নতুন অধ্যায়ের জন্য প্রস্তুত। বাংলাদেশ সহযোগিতা চায়, কিন্তু ‘পৃষ্ঠপোষকতা’ নয়। পারস্পরিক সম্মান ও সম–অধিকারভিত্তিক সম্পর্কের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। হুমায়ুন কবির বলেন, ‘বাংলাদেশ শুধু পরিবর্তিত বিশ্বের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে প্রস্তুত নয়, বরং সেই বিশ্বকে প্রভাবিত ও নেতৃত্ব দিতেও প্রস্তুত।’

নীতি সংলাপে এ সময় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত সারাহ কুক, তুরস্কের রাষ্ট্রদূত রামিস সেন, সিঙ্গাপুরের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স মিশেল লি। এ ছাড়া ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড, ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজির মহাপরিচালক সঞ্চিতা হক, সাবেক রাষ্ট্রদূত শামীম আহমেদ, কামরুল আহসান, শহিদ আখতার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাহরীন আই খান, সংসদ সদস্য জহরত আদীব চৌধুরী, বীথিকা বিনতে হোসাইনসহ আরও অনেকে। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বিআইপিএসএসের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো শাফকাত মুনির।