সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনকে কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বলা যায় না।
সারা হোসেন বলেন, ‘এটা সিলেক্টিভ প্রসেস। কয়েকজনকে নিয়ে আপনারা বসে ডিসিশন নিয়েছেন। গণতন্ত্র এখানে কোথায় ছিল? কিসের নির্বাচন, কে এসছে? বাইরে থেকে কে কথা বলতে পেরেছে? কেউ না।’
আজ মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সংস্কার: সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা, আদালতের নির্দেশনা ও জনআকাঙ্ক্ষা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে সারা হোসেন এ কথা বলেন। গোলটেবিল আয়োজন করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)।
সারা হোসেন বলেন, ঐকমত্য কমিশনে একজনও নারী সদস্য ছিলেন না। বিচারব্যবস্থা সংস্কার কমিশনেও কোনো নারী আইনজীবী কিংবা বিচারপতিকে সম্পৃক্ত করা হয়নি।
গণভোটের তৃতীয় প্রশ্নের বিষয়ে জনগণের কোনো ধারণা ছিল না বলেও মন্তব্য করেন সারা হোসেন। গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত ব্যক্তিদের উদ্দেশে প্রশ্ন রেখে সারা হোসেন বলেন, ‘আপনারা হাত তুলে আমাকে বলেন, কয়জন বলতে পারবেন ৩০টা প্রস্তাব কী ছিল?...আপনারা কিসের জন্য ভোট দিয়েছেন, সেটা আপনারা জানেন বলে আমার মনে হয় না।’ তিনি আরও বলেন, ‘এটা একটা বড় প্রশ্ন, আপনি ভোট দিচ্ছেন, কিসের জন্য দিচ্ছেন?...হ্যাঁ/না—এটা জানি। কিন্তু কিসের জন্য ভোট দিচ্ছি, এটা আমি যদি না জানি, তাহলে ভোটের কত দূর মূল্য আছে?’
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ এবং সুপ্রিম কোর্ট বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ নিয়েও কথা বলেন সারা হোসেন। অন্তর্বর্তী আমলের এ দুটি আইন পুনর্বহাল হওয়া উচিত বলে মত দেন তিনি।
গণভোটের প্রশ্ন ব্যবস্থাপনার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুললেও গণভোটের রায় অনুসারে সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন সারা হোসেন।
নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে তিনি বলেন, সবাই ইতিবাচক পরিবর্তন চাইছে। নির্বাহী বিভাগে যাঁরা আছেন, তাঁরা বিচার বিভাগকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবেন, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের দমন করার জন্য ব্যবহার করবেন—এমনটা কেউ চান না। এই মৌলিক পরিবর্তনের জন্যই আইন দুটি প্রয়োজন ছিল।
বিচার বিভাগের ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, বিচারপ্রার্থীরা যেন রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে ন্যায়বিচার পেতে পারেন। যাঁদের প্রতিপক্ষ বলে মনে করা হচ্ছে, তাঁদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতেই হবে।
এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগ আমলে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাকে জোর করে দেশ থেকে বের করে দেওয়ার উদাহরণ টেনে সারা হোসেন বলেন, এত বছর পার হয়ে গেছে, এটি নিয়ে নাগরিক সমাজ থেকে দাবি ওঠানো হয়নি, এটার সুরাহা হোক। কাদের ভূমিকা সেখানে ছিল, তা জানা যাক। তিনি আরও বলেন, জুলাই গণ–অভ্যুত্থান–পরবর্তী সময়েও শিক্ষার্থীদের অবস্থানের মুখে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারকদের পদত্যাগ করতে হয়েছে। তাঁদের দাবির মুখে অনেক বিচারককে হঠাৎ করে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাঁদের কয়েকজন ছিলেন বেশ দক্ষ।
সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মামলায় রায় দেওয়া সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হককে ‘মিথ্যাভাবে’ জুলাই হত্যা মামলায় জড়ানো হয়েছে বলে মন্তব্য করেন সারা হোসেন। তিনি বলেন, ‘এতগুলো মাস পার হয়ে গেছে, এখন অবধি কোনো চার্জশিট নাই; যেখানে বলা হচ্ছে যে জাস্টিস খায়রুল হক ওখানে দাঁড়িয়ে গুলি চালিয়েছেন অথবা গুলির নির্দেশনা দিয়েছেন।’
সারা হোসেন বলেন, ‘এটা নিয়ে আমরা কি মুখ খুলছি? নাগরিক সমাজ, সুশীল সমাজ, বাংলাদেশ বার কাউন্সিল কিংবা বার সমিতি—কেউ না, সবাই চুপ করে আছি।’
গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এম এ মতিন। এতে আরও বক্তব্য দেন বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, আইনজীবী ইমরান সিদ্দিকী, ফাহিম মাশরুর প্রমুখ। সঞ্চালনা করেন সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার।