অতিধনীরাও একদা অতি ক্ষুদ্র কাজ করতেন

বর্তমান বিশ্বের অতিধনীদের ধনসম্পদের বাহার দেখে অনেকেই অবাক হন। কিন্তু তাঁদের অনেকেই অতি ক্ষুদ্র কাজ করার মধ্য দিয়ে নিজেদের কর্মজীবন শুরু করেন। মূলত দূরদর্শী কর্মপরিকল্পনা, কঠোর পরিশ্রম আর একাগ্রতার ফলেই তাঁরা জিরো থেকে হিরো হন।

সাধারণত অশিক্ষিত, কম শিক্ষিত ও অনগ্রসর মানুষই ছোটখাটো চাকরি বা কাজ করেন—এটাই যেন জগতের একধরনের অলিখিত নিয়ম। কিন্তু কখনো কখনো দুনিয়ার সেরা ধনীদের জীবনেও এমনটা ঘটতে দেখা গেছে। যেমন ধরুন, বিশ্বের শীর্ষ ধনী জেফ বেজোসও তেমনই একজন, যিনি ক্যারিয়ার বা কর্মজীবনের শুরুতে ম্যাকডোনাল্ডসে বার্গার তৈরির মতো ছোট কাজ করেছিলেন। বিশ্বে ‘বিনিয়োগগুরু’খ্যাত ওয়ারেন বাফেট সংবাদপত্রের হকার ছিলেন। বিল গেটস কর্মজীবন শুরু করেন কম্পিউটার প্রোগ্রামার হিসেবে। মার্ক জাকারবার্গ মিউজিক প্লেয়ার তৈরির কাজ করেন।

এ তালিকায় আরও অনেক অতিধনী রয়েছেন। কারণ, তাঁরা সবাই সোনা-রুপার চামচ মুখে দিয়ে জন্ম নেননি। দূরদর্শী কর্মপরিকল্পনা, কঠোর পরিশ্রম আর একাগ্রতায় জিরো থেকে হিরো হয়েছেন। ব্যক্তিগত জীবনের এ সফলতার সুবাদে তাঁরা নিজ নিজ দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনে যেমন অবদান রেখেছেন, তেমনি বিশ্বজুড়ে মানবজাতির কাছেও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে আছেন। এসব অতিধনী, তথা বিলিয়নিয়ারের (১০০ কোটি মার্কিন ডলার বা এর চেয়ে বেশি পরিমাণ সম্পদের মালিক) মধ্যে আরও আছেন ইলন মাস্ক, স্টিভ জবস, রতন টাটা প্রমুখ।

এসব অতিধনীর ব্যক্তিত্ব, জীবনধারা, দেশ, কর্মক্ষেত্র ইত্যাদি আলাদা হলেও সবার মধ্যেই দুটি সাধারণ বিষয় লক্ষ করা যায়। এর প্রথমটি হলো তাঁরা সবাই যৌবনে নির্দিষ্ট কোনো কাজের প্রতি প্রচণ্ড আবেগ অনুভব করেন। দ্বিতীয়ত, তাঁরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে, মানে ব্যবসায় সফলতা অর্জন করে অনন্য নজির স্থাপনের লক্ষ্যে ছিলেন অবিচল। চলুন, কয়েকজন অতিধনীর জীবনের ক্ষুদ্র কাজগুলো কী ছিল, তা দেখে নেওয়া যাক।

জেফ বেজোস

বিশ্বের শীর্ষ ধনী ও যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বখ্যাত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান আমাজনের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) জেফ বেজোসের প্রথম চাকরি ছিল ছোট। তিনি ১৬ বছর বয়সে মিয়ামিতে ফাস্টফুড চেইন ম্যাকডোনাল্ডসে গ্রিল অপারেটর হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেখানে তিনি বার্গার বানানোর কাজও করতেন। মজুরি পেতেন ঘণ্টা হিসাবে। প্রতি ঘণ্টায় তাঁর মজুরি ছিল ২ দশমিক ৬৯ ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ২২৯ টাকার সমান। বলা হয়ে থাকে, ম্যাকডোনাল্ডসের চাকরি করার অভিজ্ঞতা থেকেই বেজোস গুরুত্বপূর্ণ বেচাকেনা, তথা ব্যবসায়িক শিক্ষা লাভ করেন। এখন তাঁর সম্পদের নিট মূল্য হচ্ছে ২০ হাজার ৭৯০ কোটি ডলার।

ওয়ারেন বাফেট

বিশ্বজুড়ে একডাকে ‘বিনিয়োগগুরু’ হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্রের ধনকুবের ওয়ারেন বাফেট মাত্র ১৩ বছর বয়সে সংবাদপত্র ডেলিভারি দেওয়ার, অর্থাৎ হকারি করার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি বিলি করতেন বিশ্বখ্যাত পত্রিকা ওয়াশিংটন পোস্ট। এর বিনিময়ে বাফেট মাসে মাত্র ১৭৫ ডলার পেতেন। এরপর তিনি পিনবল মেশিনের ব্যবসায় নিয়োজিত হন। আরও বড় ব্যবসা শুরু করার অপেক্ষায় থাকেন এবং একদিন ঠিকই সফল বিনিয়োগকারী হিসেবে বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করেন। বর্তমানে ওয়ারেন বাফেট বার্কশায়ার হ্যাথওয়ের চেয়ারম্যান ও সিইও। এখন তাঁর নিট সম্পদের পরিমাণ ১০ হাজার ১১০ কোটি ডলার, যা নিয়ে তিনি বিশ্বের ষষ্ঠ শীর্ষ ধনী। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় তিনি জনহিতকর কাজে কয়েক হাজার কোটি ডলার দান করেছেন।

বিল গেটস

একজন সাধারণ কম্পিউটার প্রোগ্রামার থেকে কারও বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ধনী হওয়ার গল্প নিশ্চয়ই মজাদার। শুনবেন সেই কাহিনি? তাঁর নাম বললে প্রায় সবাই চিনবেন। তিনি হলেন বিল গেটস। ছোটবেলার বন্ধু পল অ্যালেনকে সঙ্গে নিয়ে বিল গেটস প্রতিষ্ঠা করেন মাইক্রোসফট করপোরেশন। হাইস্কুলের ওপরের দিকে পড়ার সময় মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি টিআরডব্লিউ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার প্রোগ্রামার হিসেবে কাজ করেন। বিশ্বখ্যাত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়েও ভর্তি হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু লেখাপড়া শেষ করেননি। সাবেক স্ত্রী মেলিন্ডার সঙ্গে মিলে তিনি গড়ে তোলেন বিশ্বের বৃহত্তম বেসরকারি দাতব্য প্রতিষ্ঠান বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন, যেটি বিশ্বে শিক্ষার অগ্রগতি, ক্ষুধামুক্তি ও টিকাব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে কাজ করে। বর্তমানে তিনি বিশ্বের চতুর্থ শীর্ষ ধনী, যাঁর সম্পদের নিট মূল্য ১৩ হাজার ৪৩০ কোটি ডলার।

ইলন মাস্ক

বর্তমান বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ ধনী ইলন মাস্ক বেড়ে উঠেছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকায়। ১৯৮৩ সালে যখন তাঁর বয়স ১৭ বছর, তখন তিনি অভিবাসী হিসেবে কানাডায় পাড়ি জমান। সেখানে তিনি কর্মজীবন শুরু করেন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে। সেই প্রথম চাকরিতে তাঁর কাজ ছিল কম্পিউটার গেমস বিক্রি করা। কাজটির বিনিময়ে তিনি মাসে পেতেন মাত্র ৫০০ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৪২ হাজার ৫০০ টাকা (প্রতি ডলার এখনকার ৮৫ টাকা ধরে)। পরবর্তীকালে মাস্ক কানাডা ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। এখন তিনি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বৈদ্যুতিক গাড়ি, বাড়ির গ্রিড স্কেল, সৌর প্যানেল, সৌর ছাদ টাইলস প্রভৃতি পণ্য উৎপাদনকারী টেসলা; মহাকাশযান প্রস্তুতকারক ও মহাকাশে পর্যটনসেবা প্রদানের লক্ষ্যে গঠিত স্পেস এক্সপ্লোরেশন টেকনোলজিস করপোরেশনের (স্পেসএক্স) সিইও। তাঁর সম্পদের পরিমাণ ১৭ হাজার ৬০ কোটি ডলার।

মার্ক জাকারবার্গ

জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও মার্ক জাকারবার্গের প্রথম চাকরি ছিল মিউজিক প্লেয়ার তৈরি করা। মিউজিক প্লেয়ারটির নাম ছিল সাইন্যাপস। ১৮ বছর বয়সে ২০০২ সালে সেই চাকরি করেন তিনি। এরপর মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে ২০০৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি তিনি আরও চারজন কলেজবন্ধুর সঙ্গে মিলে প্রতিষ্ঠা করেন ফেসবুক। সেই সুবাদে মাত্র ৩৭ বছর বয়সে তিনি এখন বিশ্বের পঞ্চম শীর্ষ ধনী, যাঁর সম্পদের নিট মূল্য ১৩ হাজার ৪৩০ কোটি ডলার।

স্টিভ জবস

স্টিভ জবস যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রযুক্তি উদ্ভাবক ও উদ্যোক্তা, যাঁকে পার্সোনাল কম্পিউটার (পিসি) বিপ্লবের পথিকৃৎ বলা হয়। দুই সহযোগী স্টিভ ওজনিয়াক ও রোনাল্ড ওয়েনকে সঙ্গে নিয়ে ১৯৭৬ সালে তিনি অ্যাপল কম্পিউটার প্রতিষ্ঠা করেন। এটি এখন বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান ব্র্যান্ডগুলোর একটি। তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির সিইও। ২০১১ সালে মারা যান তিনি। অথচ এই ভদ্রলোকও ছোট কাজ করার মধ্য দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। তাঁর প্রথম কাজটি ছিল ভিডিও গেমস গেমস তৈরি করা। গেমসটির নাম ছিল আতারি। ২০১১ সালে মারা যাওয়ার সময় তাঁর সম্পদের নিট মূল্য ছিল ১ হাজার ২০ কোটি ডলার।

রতন টাটা

ভারতের বিখ্যাত শিল্পগোষ্ঠী টাটা সন্স ও টাটা গ্রুপের সাবেক চেয়ারম্যান রতন টাটা কর্মজীবনের শুরুতে ক্ষুদ্র চাকরি করেন। ১৯৬১ সালে তিনি নিজেদের পারিবারিক প্রতিষ্ঠান টাটা স্টিলের একটি দোকানে কাজ করার মধ্য দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। রতন টাটা এখন ৬১তম শীর্ষ ধনী। তাঁর সম্পদের নিট মূল্য ২ হাজার ৯১০ কোটি ডলার।

সূত্র: ইনভেস্টোপেডিয়া ও নিউজ ১৮ ডটকম