বিশ্ব অর্থনীতি

ধনীদের মহাকাশে বেড়ানো ও মহামারির অভিঘাত

মহাকাশের পথে ধনকুবের রিচার্ড ব্র্যানসন। সাম্প্রতিক ছবি।
সংগৃহীত

মানুষ ছুটি কাটাতে সাধ্যমতো বিভিন্ন জায়গায় যায়, দেশের ভেতরে হলে কক্সবাজার, কুয়কাটা, সিলেট বা বিদেশে হলে বালিসহ আরও অনেক জায়গাই আছে। তবে মানুষের ভ্রমণ এখন আর নিছক পৃথিবীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ভ্রমণের নতুন গন্তব্য হয়ে উঠেছে মহাকাশ। এমন এক সময়ে এটা হলো, যখন পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি মানুষ মহামািরতে আয় হারিয়েছেন। নতুন করে গরিব হয়েছেন কোটি কোটি মানুষ।

তবে সেই মহাকাশযাত্রা মধ্যবিত্ত বা সচ্ছল মানুষেরও কর্ম নয়। একদম অতিধনী না হলে কারও পক্ষে এই মহাকাশ ভ্রমণ করা সম্ভব নয়। দেখা যাক, এতে কী পরিমাণ খরচ হতে পারে। যে ভার্জিন গ্যালাকটিক ভিএসএস ইউনিটির অভিযানে ধনকুবের রিচার্ড ব্র্যানসন মহাকাশে গেলেন, তার একটি আসনের দাম আড়াই লাখ ডলার। আর বেজোসের ব্লু অরিজিনের নিউ শেপার্ডের একটি আসন নিলামে ২ কোটি ৮০ লাখ ডলারে বিক্রি হয়েছে, সেটা অবশ্য জেফ বেজোস সঙ্গে ছিলেন বলে। আর স্পেসএক্সের মহাকাশযানে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (আইএসএস) গিয়ে আট দিন থাকতে চাইলে মাথাপিছু গুনতে হবে প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি ডলার।

তবে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে যাওয়া ও থাকা আরও বেশি রোমাঞ্চকর। ব্র্যানসন ও বেজোস তো মহাকাশ থেকে দিনে দিনেই ফিরে এসেছেন, তবে মহাকাশ স্টেশনে যেতে ২ দিন আর ৮ দিন থাকা, সব মিলিয়ে মোট ১০ দিন থাকতে হয়। এই ১০ দিনের সফরে যাওয়ার মানুষও কম নয়। আগামী বছরের প্রথম দিকেই মহাকাশ সফরে যাচ্ছেন তিনজন ধনকুবের।

তবে ওই তিনজন সাধারণ মহাকাশচারী নন, সাধারণ নাগরিক। তাঁরা হলেন কন্নর গ্রুপের ম্যানেজিং পার্টনার ল্যারি কন্নর, কানাডার ইনভেস্টমেন্ট ফার্ম মাভেরিক কর্পের প্রধান নির্বাহী মার্ক প্যাথি ও ইসরায়েলের বিমানবাহিনীর সাবেক পাইলট ও ব্যবসায়ী আইটান স্টিবে। তাঁদের প্রশিক্ষণ দেওয়া থেকে শুরু করে এই দীর্ঘ পথে তাঁদের সঙ্গ দেবেন নাসার এক সাবেক মহাকাশচারী মাইকেল লোপেজ। হিউস্টনের অ্যাক্সিওম স্পেস নামে সংস্থা এই উদ্যোগের কথা আগেই ঘোষণা করেছিল। সাধারণ মানুষের মধ্যে মহাকাশ পর্যটনের প্রসার ঘটাতেই এই উদ্যোগ তাদের। স্পেসএক্স ড্রাগন স্পেসক্র্যাফ্ট চারজনকে নিয়ে উড়ে যাবে পৃথিবীর কক্ষপথে। সেখানেই আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে মহাকাশ বিজ্ঞানীদের মাঝে কাটাবেন তাঁরা। এই চারজন কারা, সেটাই মঙ্গলবার ঘোষণা করল অ্যাক্সিওম স্পেস নামক সংস্থা।

লাইফ সাপোর্ট, থাকা–খাওয়াসহ সব মিলিয়ে একজন যাত্রীর এক দিনের খরচ প্রায় ৩৫ হাজার ডলার। ৮ দিন স্পেস পরীক্ষাগারে কাটানোর জন্য ওই তিনজনকেই ৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার দিয়ে টিকিট বুক করতে হয়েছে।

এদিকে গত বছরের ৩০ মে মহাকাশ স্টেশনে পাড়ি দিয়েছিল স্পেসএক্স ক্রু ড্রাগন। ২০১১-এর পরে এই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রের মাটি থেকে মহাকাশে রওনা দেওয়া। এটিই ছিল প্রথম বেসরকারি উদ্যোগে মহাকাশ পাড়ি। তবে মূল লক্ষ্য ছিল রাশিয়ানির্ভরতা কাটিয়ে ওঠা। ‘স্পেস শাটল’-গুলির মেয়াদ ফুরানোর পর থেকে মহাকাশে মানুষ পাঠাতে হলে রাশিয়ার সয়ুজ মহাকাশযানের ওপর নির্ভর করতে হতো নাসাকে। কিন্তু তা ব্যবহারের জন্য আসনপিছু ৮ কোটি ডলার দিতে হতো আমেরিকাকে। এর জন্য দীর্ঘদিন তারা নতুন স্পেসক্রাফ্ট তৈরির চেষ্টা ছিল। স্পেসট্যাক্সি তৈরিতে স্পেসএক্স এবং বিমান কোম্পানি বোয়িংকে ৭০০ কোটি ডলার অর্থসাহায্য দিয়েছিল মার্কিন সরকার। ২০১৯ সালে ব্যর্থ হয় বোয়িংয়ের প্রচেষ্টা। আশা-ভরসা ছিল স্পেসএক্স। চার মাস আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (আইএসএস) কাটিয়ে নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে আসেন ডগলাস হার্লি ও বব বেনকেন।

বাস্তবতা হলো, এই আড়াই লাখ ডলার দিয়ে মহাকাশ ভ্রমণে যেতে সহস্রাধিক মানুষ ইতিমধ্যে টিকিট বুকিং দিয়ে ফেলেছেন। ধনীরা অনেকেই হয়তো ভবিষ্যতে এই পথে আসবেন। অথচ এমন এক সময় বেজোস ও ব্র্যানসন এই কাণ্ড ঘটালেন, যখন তাঁদের দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষ কোভিডের অভিঘাতে সামাজিক সুবিধার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। সরকারও এই প্রণোদনা দিতে হিমশিম খাচ্ছে। সে জন্য মার্কিন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স টুইট করেছেন, এখন সময় এসেছে অতিধনীদের উচ্চ করের আওতায় নিয়ে আসার। সবাই জানে, জেফ বেজোসের মতো অদিধনীরা কর ফাঁকি দেন। সে জন্য বিল গেটস একবার বলেছিলেন, ‘আমার এত টাকা হলো কীভাবে, নিশ্চয়ই কর ব্যবস্থার সমস্যা আছে’।

এ ছাড়া মহাকাশ ভ্রমণের পরিবেশগত প্রভাবও আছে। নেচার পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রকেট সাধারণ যাত্রীবাহী বিমানের ১০০ গুণ বেশি কার্বন ডাই–অক্সাইড নিঃসরণ করে। পরিবেশগত বিপর্য়ের সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হয় গরিব মানুষ। ফলে বিপদ তাদেরই।