গ্রীষ্মের কাকডাকা ভোরেও গরম, আর রোদ উঁকি দিলেই তা হয় তপ্ত। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজপথ যেন আগুনের হলকা ছড়াতে থাকে। প্রচণ্ড গরমে জনজীবন যখন ওষ্ঠাগত, তখন একসময়ের ‘বিলাসবহুল’ পণ্য এয়ারকন্ডিশনার (এসি) এখন হয়ে উঠেছে মধ্যবিত্তের প্রশান্তির ঠিকানা। সাম্প্রতিক সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রতিবছরই বাড়ছে তাপমাত্রার পারদ। আবহাওয়ার প্রকৃতি বোঝা বড় কঠিন—কখনো বৃষ্টি, কখনো রোদের ভ্যাপসা গরম। এ কারণেই এসির বাড়তি চাহিদায় গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশের এসির বাজারে ঘটে গেছে এক বিস্ময়কর নীরব বিপ্লব। দেশি কোম্পানি নজর দিয়েছে এই বাজারে। আমদানিনির্ভর বাজার থেকে বেরিয়ে এসে বাংলাদেশ এখন এসি তৈরিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার পথে।
এক দশক আগেও এসি ছিল কেবল উচ্চবিত্তের ড্রয়িংরুমের শোভা। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অসহনীয় তাপমাত্রা এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ায় এসির চাহিদা এখন তুঙ্গে। ২০১৬-১৭ সালেও যেখানে বিদেশি ব্র্যান্ডের এসি বাজারের সিংহভাগ দখল করে ছিল, ২০২৬ সালে এসে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বর্তমানে দেশের এসির চাহিদার ৮০ থেকে ৯০ শতাংশই পূরণ করছে স্থানীয় কোম্পানিগুলো। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, গত ৫ বছরে এসির বাজারে বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ। ইলেকট্রো মার্টের (গ্রী) উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নুরুল আফছার প্রথম আলোকে জানান, বর্তমানে এসির চাহিদা বছরে ১২ থেকে ১৫ শতাংশ হারে বাড়ছে।
দেশের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলোকে প্রথম আলো দেওয়া প্রশ্নের উত্তর বিশ্লেষণের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে দেশের এসির বাজারের আকার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৪ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার। বর্তমানে দেশে বছরে এসির চাহিদা সাড়ে ৫ লাখ থেকে সাড়ে ৬ লাখ ইউনিট। ২০১৮-১৯ সালেও এই চাহিদা ছিল মাত্র ২ থেকে ২ দশমিক ৫ লাখ ইউনিটের আশপাশে। অর্থাৎ মাত্র অর্ধদশকের ব্যবধানে চাহিদা দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। শুধু ঢাকা বা চট্টগ্রাম নয়, উপজেলা পর্যায়েও এখন এসির শোরুমগুলোতে ভিড় জমাচ্ছেন ক্রেতারা।
পাঁচ-সাত বছর আগেও বাজারে আধিপত্য ছিল জেনারেল, প্যানাসনিক, শার্প কিংবা ক্যারিয়ারের মতো বিদেশি ব্র্যান্ডের। কিন্তু চিত্রটি এখন আমূল বদলে গেছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় ইলেকট্রনিকস জায়ান্ট গ্রী, ওয়ালটন, ভিশন, যমুনা, সিঙ্গার, মিনিস্টার ও মিডিয়া—এই প্রতিষ্ঠানগুলো এখন দেশেই বিশ্বমানের এসি তৈরি করছে।
এসির বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে দেশি কোম্পানিগুলো। এর পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে সরকারের শিল্পবান্ধব নীতি। এসি আমদানিতে উচ্চ শুল্ক আর কাঁচামাল আমদানিতে করছাড় দেশি উদ্যোক্তাদের কারখানা স্থাপনে উৎসাহিত করেছে। এখন ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ লেখা এসি শুধু দেশের চাহিদা মেটাচ্ছে না; বরং বিদেশে রপ্তানিরও বিশাল সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
দেশি ব্র্যান্ডগুলোর এই সাফল্যের পেছনে তিনটি মূল কারণ কাজ করছে—
সাশ্রয়ী দাম ও কিস্তি সুবিধা: বিদেশি একটি ১.৫ টনের ইনভার্টার এসি কিনতে যেখানে ৭০ থেকে ৯০ হাজার টাকা খরচ হয়, সেখানে দেশি ব্র্যান্ডগুলো একই ফিচারের এসি দিচ্ছে ৪৫ থেকে ৬০ হাজার টাকার মধ্যে। এ ছাড়া শূন্য শতাংশ সুদে সহজ কিস্তি সুবিধা সাধারণ মানুষকে এসি কিনতে উৎসাহিত করছে।
বিক্রয়োত্তর সেবা: বিদেশি এসির যন্ত্রাংশ অনেক সময় পাওয়া যায় না বা ব্যয়বহুল হয়। অন্যদিকে দেশি কোম্পানিগুলোর সার্ভিসিং সেন্টার এখন দেশের প্রতিটি জেলায় এমনকি উপজেলাতেও আছে। ১২ বছর পর্যন্ত কম্প্রেসর ওয়ারেন্টি গ্রাহকদের মনে আস্থার জায়গা তৈরি করেছে।
পরিবেশ ও দেশের উপযোগী প্রযুক্তি: ভোল্টেজ ফ্ল্যাকচুয়েশন এবং ধুলাবালু বিবেচনা করে দেশি কোম্পানিগুলো এখন গোল্ড ফিন বা কপার কন্ডেন্সার প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, যা দেশের আবহাওয়ায় দীর্ঘস্থায়ী হয়।
বাজারে এখন সাধারণ এসির চেয়ে ‘ইনভার্টার’ এসির কদর সবচেয়ে বেশি। গ্রাহকেরা এখন সচেতন। তাঁরা জানেন, ইনভার্টার এসি ব্যবহারে বিদ্যুৎ বিল সাধারণ এসির তুলনায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কম আসতে পারে।
এ বিপ্লবে পিছিয়ে নেই উদ্ভাবনও। এখন বাজারে পাওয়া যাচ্ছে স্মার্ট এসি। রাজধানীর গুলিস্তানের স্টেডিয়াম মার্কেটের ইলেকট্রনিকস শোরুমে কথা হলো ক্রেতা মিজানুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এখন তো অফিসের কাজ শেষ করে ফেরার পথেই মোবাইল অ্যাপ দিয়ে বাসার এসি অন করে দেওয়া যায়। বাসায় পৌঁছানোর আগেই ঘর ঠান্ডা হয়ে থাকে। প্রযুক্তির এই সহজলভ্যতা আগে ভাবাই যেত না।’ এমনকি ভয়েস কন্ট্রোল বা ‘মুখের কথায়’ চলা এসিও এখন দেশের বাজারে মিলছে, যা আক্ষরিক অর্থেই এক অভাবনীয় অগ্রগতি।
এসির চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ ব্যবহারের চ্যালেঞ্জও বাড়ছে। জ্বালানিবিশেষজ্ঞদের মতে, প্রচণ্ড গরমের সময় দেশে অতিরিক্ত যে ৫-৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা তৈরি হয়, তার বড় অংশই আসে এসি থেকে। তবে আধুনিক ইনভার্টার প্রযুক্তির প্রসারের কারণে এই চাপ কিছুটা সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। যদি সবাই এসি ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে চালায়, তবে জাতীয় গ্রিডে এই চাপ প্রায় অর্ধেক কমিয়ে আনা সম্ভব—এই সচেতনতাও এখন দেশি কোম্পানিগুলো তাদের বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রচার করছে।
এসির বাজারের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা আগামী কয়েক বছর অব্যাহত থাকবে বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা। দেশি কোম্পানিগুলোর বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাঁদের লক্ষ্য কেবল দেশের বাজার নয়, এখন গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড মেনে তাঁরা এসি তৈরি করছেন।
ডিজাইন এবং কম্প্রেসরের দক্ষতায় এখন জাপানি বা দক্ষিণ কোরীয় ব্র্যান্ডের সমকক্ষ বলে দাবি করেন তাঁরা।