
শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবার চারজন শিক্ষককে শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের স্বীকৃতি দিয়েছে। কলেজ শ্রেণিতে সাভার সরকারি কলেজের এ কে এম সাঈদ হাসান, মাধ্যমিক বিদ্যালয় শ্রেণিতে বরিশালের উজিরপুরের সরকারি ডব্লিউবি ইউনিয়ন মডেল ইনস্টিটিউশনের সহকারী শিক্ষক মোসা. সেলিনা আক্তার, মাদ্রাসা শ্রেণিতে বরিশালের সাগরদী ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসার রিয়াজুল ইসলাম এবং কারিগরি শিক্ষক শ্রেণিতে দিনাজপুরের পার্বতীপুর সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের পবন কুমার সরকার শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের এই স্বীকৃতি পেয়েছেন। দেশসেরা এই শিক্ষকদের মধ্যে মোসা. সেলিনা আক্তারের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মোশতাক আহমেদ।
প্রথম আলো: শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের স্বীকৃতি পাওয়ার পর নিজের বিদ্যালয়ে গিয়েছিলেন? কেউ কিছু বলেছে?
সেলিনা আক্তার: না, এখনো যেতে পারিনি। আমি জ্বরে আক্রান্ত। তবে অনেকেই ফোনে অভিনন্দন জানাচ্ছেন। আমার বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, আত্মীয়স্বজন সবাই খুব খুশি।
শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত করার ক্ষেত্রে কী কী বিষয় দেখা হয়?
সেলিনা আক্তার: শিক্ষাগত যোগ্যতা, দায়িত্ববোধ, শিক্ষক-অভিভাবক ও সহকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক, সুনাম, সৃজনশীল প্রশ্নপত্র তৈরি, ডিজিটাল আধেয় (কনটেন্ট) তৈরি, উদ্ভাবনী আইডিয়া ইত্যাদি।
শিক্ষকতা পেশায় কত দিন?
সেলিনা আক্তার: ২০০২ সাল থেকে শিক্ষকতায় আছি। শুরু থেকে একই বিদ্যালয়ে।
আপনি কোন বিষয় পড়ান?
সেলিনা আক্তার: তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি)।
নিজে কোথায় পড়েছেন?
সেলিনা আক্তার: আসলে আমার জীবনটি দীর্ঘ সংগ্রামের। আমার খুবই ছোটবেলায় বিয়ে হয়ে যায়। ফলে বরিশালের বাইরের গিয়ে পড়াশোনার সুযোগ হয়নি। এমএড (মাস্টার অব এডুকেশন) করেছি বরিশাল থেকেই।
অনেক সময় দেখা যায়, বিয়ের পর মেয়েদের পড়াশোনা এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ আর থাকে না।
সেলিনা আক্তার: আমার ক্ষেত্রে তা হয়নি। শিক্ষা গ্রহণ করার জন্য আমার শাশুড়ি খুবই সহযোগিতা করেছেন। আমি যখন পড়তাম, তিনি পাশে বসে থাকতেন। আমি যখন কলেজে যেতাম, তখন তিনি না খেয়ে বসে থাকতেন, আমি এলে খেতেন। অথচ ওনার কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। আমার স্বামীরও সহযোগিতা ছিল।
শিক্ষকতায় পুরস্কার কি এবারই প্রথম?
সেলিনা আক্তার: ২০১৯ সালেও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দেওয়া শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের স্বীকৃতি পেয়েছিলাম। আরও কিছু পুরস্কার পেয়েছি।
পড়ানোর ক্ষেত্রে আপনি কোন ক্ষেত্রে বেশি জোর দেন?
সেলিনা আক্তার: আমি শিক্ষার্থীদের ‘মনের ডাক্তার’ হওয়ার চেষ্টা করি। তাদের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা বোঝার চেষ্টা করি। শিক্ষার্থীদের চাহিদা যদি আমি ধরতে না পারি, তাহলে যা-ই শেখাব, তা কাজে লাগবে না। আমার মনে হয় গতানুগতিক পাঠদান শিক্ষার্থীদের শেখার প্রতি অনীহা তৈরি করে।
‘মনের ডাক্তার’ হওয়ার সুফল পাওয়া যায়?
সেলিনা আক্তার: একটি উদাহরণ দিই। আমাকে একবার দশম শ্রেণির ক্লাসের দায়িত্ব দেওয়া হয়। আমি দেখলাম অষ্টম-নবম শ্রেণিতে ভালো করা কিছু শিক্ষার্থী দশম শ্রেণিতে খারাপ করছে। কেউ কেউ বললেন ‘ওরা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে’। বয়ঃসন্ধিকালে যেসব সমস্যা হয়, সেগুলো এসব শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে লক্ষ করলাম। তখন ওদের সমস্যাগুলো আলাদাভাবে জানার চেষ্টা করি। কিন্তু ওরা প্রথমে বলতে চায়নি। এরপর আমার জীবনে বয়ঃসন্ধিকালের কিছু উদাহরণ দিই। নানাভাবে বোঝানোর প্রায় দুই মাস পর ওরা ‘বাজে অভ্যাস’ থেকে বেরিয়ে আসে।
তারপর?
সেলিনা আক্তার: ওরা পরীক্ষায়ও খুব ভালো করেছিল। একজন এখন যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছে। বিদেশে পড়তে যাওয়ার আগে ছেলেটি আমাকে একটি ডায়েরি দিয়েছিল, তাতে লেখা ছিল ‘আমি যদি পরের কোনো জনম পাই, তাহলে আমি যেন আপনার ছেলে হয়ে জন্মাই।’ তার ডায়েরিটি যত্ন করে রেখে দিয়েছি।
পরিবারে কে কে আছেন?
সেলিনা আক্তার: স্বামী ও তিন মেয়ে। আমার স্বামীও শিক্ষক।
প্রথম আলো: শেষ প্রশ্ন, শিক্ষকতা পেশায় কেন এলেন?
সেলিনা আক্তার: ভালো লাগা থেকে। জীবনে এই একটা চাকরিরই আবেদন করেছিলাম এবং সেটাই পেয়েছি। বাকি জীবনও শিক্ষকতায় থাকতে চাই।