ভাবনা যখন এক জায়গায় মিলিত হয়েছে

বন্ধ রয়েছে শুটিং। হচ্ছে না কোনো কনসার্ট। রেকর্ডিং স্টুডিও খুলছে না। ছোট পর্দা, চলচ্চিত্র, সংগীতের সঙ্গে যুক্ত অনেক মানুষ ইতিমধ্যেই কাজ হারিয়েছেন। বাড়ছে লকডাউনের দিন। এমন পরিস্থিতিতে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব নিয়ে ভাবছেন তারকারা। এ নিয়ে তাঁদের উপলব্ধি ও ভাবনা এক জায়গায় মিলিত হয়েছে। জেনে নেওয়া যাক বিনোদন অঙ্গনের তারকারা কীভাবে দেখছেন একে।

ফেরদৌসী মজুমদার
ফেরদৌসী মজুমদার

অমানবিক দিকটা আরও প্রকট হয়ে উঠছে, ফেরদৌসী মজুমদার, অভিনয়শিল্পী

প্রতিটি ঘটনার ভালো–মন্দ—দুটি দিকই থাকে। করোনাভাইরাস আমাদের কিছু জিনিস উপলব্ধি করিয়েছে, যা আমরা কখনো ভাবিনি। যেমন প্রকৃতির কথা। এই যে বহুতল দালানগুলো উঠছে তো উঠছেই। মানুষ থামছে না। পুকুর, নদী, খাল-বিল ধ্বংস করে, গাছপালা কেটে মানুষ এসব তৈরি করছে। কিন্তু গাছ, পশু, পাখিদের কথাও আমাদের ভাবার দরকার ছিল। আমরা কখনো থামিনি। প্রকৃতির ওপর আমরা মানুষেরা নানাভাবে অনেক নির্যাতন করেছি। এখন মনে হচ্ছে, আমরা প্রকৃতির দিকে তাকানোর কিছুটা সময় পাচ্ছি। টেলিভিশনে দেখলাম ডলফিনরা সাগরের পাড়ে চলে এসেছে, পাখিরা যেন আগের চেয়ে অনেক আনন্দ করছে। এই জিনিসগুলো আমরা কখনো দেখিনি।

আমাদের দেশের মানুষ সচেতন নয়। তারা এখনো লকডাউন মানছে না। নিজেদের ইচ্ছেমতো ঘোরাঘুরি করছে, রাস্তায় থুতু-কফ ফেলছে। বাজার করছে এমনভাবে যেন একাই বেঁচে থাকবে, ভালো থাকবে। ত্রাণ নিয়ে যা হচ্ছে, তাতে মানুষের অমানবিক দিকটা আরও প্রকট হয়ে উঠছে। এসব বোঝানোর জন্যই বোধ হয় বিধাতা পৃথিবীতে এই পরিস্থিতি দিয়েছেন। যদিও আমি মনে করি, এই অন্ধকার থাকবে না।

আসিফ আকবর

প্রকৃতির ওপর মানুষ স্পর্ধা দেখিয়েছে, আসিফ আকবর, সংগীতশিল্পী

পৃথিবী সব সময়ই রিসাইক্লিংয়ের মধ্যে থাকে। সে কারণে আগেও পৃথিবীর প্রাচীন অনেক সভ্যতা ধ্বংস হয়ে গেছে, আবার নতুন সভ্যতা গড়ে উঠেছে। প্রকৃতির ওপর মানুষ যে স্পর্ধা দেখিয়েছে, অনিয়ম–অবিচার করেছে, প্রকৃতি সেটা কত দিন সহ্য করবে? পৃথিবী নিজের জন্যই এ রকম একটা অপশন চালু করে নিয়েছে। এখন রাতের বেলাতেও পাখির ডাক শুনছি। মনে হচ্ছে, তারা মানুষকে বলছে, ‘বোঝো এবার!’ সারা জীবন আমরা বাইরে চষে বেড়িয়েছি, পশুপাখিকে বন্দী করেছি। এবার ওরা মুক্ত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর আমরা বন্দী। ছোট্ট একটা জীবাণু দেখিয়ে দিল, মানুষের মধ্যে মানবতার ঘাটতি আছে। যত আবেগ বা ভালোবাসা থাকুক না কেন, মানুষ আসলে স্বার্থপর। মানুষকে এখনো মানবতার শিক্ষা নিতে হবে।

জয়া আহসান

মানুষ ছাড়া প্রকৃতির আরও সন্তান আছে, জয়া আহসান, অভিনয়শিল্পী

কদিন আগে প্রথম আলোয় নির্মলেন্দু গুণের একটা প্রবন্ধ পড়ছিলাম, আমরা ব্যাকটেরিয়ার অস্ত্র কীভাবে তৈরি করব, তাতে মশগুল ছিলাম। আমরা কী করে উন্নত প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করব, তা নিয়ে ভেবেছি। এক দেশ থেকে আরেক দেশকে কীভাবে বড় করব, সেই খেলায় মেতে ছিলাম। সেই আমরা আজ একটা অণুজীবের বিরুদ্ধে লড়ে কূল পাচ্ছি না। আমরা অনেক বেশি লোভ করেছি। সবকিছুকে আমাদের লালসার বস্তুতে পরিণত করেছি। মানবিকতার সীমা অতিক্রম করেছি। প্রকৃতির বুকে আমরা সৃষ্টির সেরা জীব, কিন্তু মানুষ ছাড়া প্রকৃতির আরও সন্তান আছে। যে প্রকৃতিতে বাস করি, তার ভারসাম্যের কথা কখনো ভাবিনি। প্রকৃতি তার স্বকীয়তা বজায় রাখতে তো প্রতিশোধ নেবেই। করোনা প্রকৃতির সেই প্রতিশোধ।

চঞ্চল চৌধুরী

মানুষের জন্য এটা একটা বড় সুযোগ, চঞ্চল চৌধুরী, অভিনয়শিল্পী

আমরা ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে গেছি, প্রকৃতিকে ভালোবাসিনি। স্বার্থপর মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে এত বিরূপ আচরণ করেছে যে প্রকৃতি এখন প্রতিশোধ নিচ্ছে। এর হয়তো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে। কখন কোন দুর্যোগ আসবে এবং প্রকৃতি তার মতো করে নিজেকে সাজিয়ে নেবে—আমরা সেসব জানি না।

মানুষ প্রকৃতির ছোট্ট একটা অংশ। সে মেতে উঠেছিল ধ্বংসলীলায়। প্রকৃতির পিঠ দেয়ালে ঠেকে গিয়েছিল। সে সবাইকে ঘরে ঢুকিয়ে দিয়েছে। এ এক আশ্চর্য ব্যাপার, সাধারণভাবে চিন্তা করলে মাথায় আসবে না। এখন সবার মাথায় একটাই ভাবনা—সবাই করোনা নিয়ে ভাবছে। আগে কখনো কেউ এভাবে ভেবেছিল কি না, জানি না।