জীবনের শেষ দিনটাও মাগুরার মানুষের সঙ্গে কাটাতে চেয়েছিলেন তিনি

আজ জুন মাসের তৃতীয় রোববার, বাবা দিবস। এ উপলক্ষে ‘বাবার পথেই হেঁটেছি’ শিরোনামে লেখা আহ্বান করেছিল ‘স্বপ্ন নিয়ে’।

বাবার সঙ্গে লেখক
বাবার সঙ্গে লেখক

বাবার একটা ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন। মৃত্যুর ১০ বছর আগেই তা পূরণ করতে পেরেছিলাম, অন্তত এই প্রশান্তিটা আমার আছে।

আমার বাবা খান জিয়াউল হক এই বছর ৯৪ বছর বয়সে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত জন্মভূমি মাগুরার মানুষের সঙ্গে পার করে যাবেন, সারা জীবন এই চেয়েছেন আমার বাবা। তা-ই হয়েছে। ৯৪ বছর বয়সেও মৃত্যুর আগের দিন কলেজের একটি সভায় অংশ নিয়েছিলেন তিনি। বীরের বেশে অপরাজিত বাবা চলে গেলেন।

বাবার বয়স যখন ৮৫, তিনি ইচ্ছে প্রকাশ করলেন ভারত সফর করবেন। বলে রাখা ভালো, শিক্ষাজীবনের একটি বড় অধ্যায় তিনি কাটিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গে। এবার তাঁর ইচ্ছা—শেষবারের মতো একবার ভারত যাবেন। আগ্রা, কলকাতা, শান্তিনিকেতন এবং শৈশবের বনগাঁয়ে যাবেন। আমার ভাইয়েরা শুনে তো অবাক। তা কী করে সম্ভব। বনগাঁ সর্বোচ্চ। কলকাতা হলেও না–হয় কথা ছিল। তাই বলে দিল্লি, আগ্রা! এই বয়সে! কেউ রাজি না। শেষে আমি বললাম, ঠিক আছে আগে ভিসা তো করি। আমার আর বাবার ভিসা করলাম। কলকাতা থেকে ফোনে দিল্লির ট্রেনের টিকিট করে ফেললাম। কিন্তু একটা খুশির খবর একটু দ্বিধায় ফেলে দিল। ঢাকা থেকে ফোন এল—আবৃত্তির জন্য বাবাকে নরেন বিশ্বাস পদক দেবে কণ্ঠশীলন। যেদিন দেওয়া হবে, তার পরদিনই দিল্লির ট্রেন। আমি আশা ছেড়ে দিলাম। বললাম, এখন থাক। টিকিট বাতিল করি। পরে দেখা যাবে। কিন্তু বাবাকে দমানো গেল না। বললেন, ওই রাতেই ঢাকা থেকে রওনা দেব কলকাতায়।

সকালে কোনো ফ্লাইট আছে কি না, খুঁজছিলাম। বাবা রাজি নন। তিনি বাসেই যাবেন। মাগুরা থেকে আগের দিন ঢাকা পৌঁছে, পরদিন সন্ধ্যায় পদক নিয়ে রাতেই আমরা কলকাতার উদ্দেশে রওনা হই।

হাজার স্মৃতির ভিড়ে কেন এই ভারত সফরের গল্প টানছি তা না বললেই নয়। মাগুরায় থাকবেন বলে জীবনে বহুবার সরকারি চাকরির মায়া ছেড়েছেন আমার বাবা। মাগুরার একটি বেসরকারি হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন কাটিয়েছেন। এই স্কুলকে কেন্দ্র করে মাগুরায় গড়ে উঠেছে বহু শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। কর্মব্যস্ত বাবার সঙ্গে আমাদের খুব কম সময় কাটত। সেবার ভারত ভ্রমণে দিন-রাত শুনেছি বাবার জীবনের গল্প। ওইবারই জেনেছি, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসে সরকারি চাকরি না করে এলাকায় অধ্যাপনা পেশায় ঢুকেছি বলে বাবা কত খুশি হয়েছেন।

কলকাতা থেকে ফেরার দিন শিয়ালদহে দাঁড়িয়ে বাবা আমাকে বলছিলেন, ‘তোর মনে আছে, ছোটবেলায় আমার সঙ্গে জীবনের প্রথম কলকাতা এসেছিলি?’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, খুব মনে আছে।’ রাস্তা পার হতে গিয়ে বাবা শক্ত করে আমার হাত ধরলেন। আমার মনে পড়ে গেল, সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় যেবার প্রথম এই শিয়ালদহে এসেছিলাম, তখন আমি শক্ত করে বাবার হাত ধরে রাখতাম। এখন বাবা নির্ভর করছেন আমার ওপর। সেই থেকে তীব্র ইচ্ছা—বাবার মতো হব।

জানি পারব না।