মাংস সঠিকভাবে সেদ্ধ করা না হলে তা হতে পারে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ
মাংস সঠিকভাবে সেদ্ধ করা না হলে তা হতে পারে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ

মাংস ভালোভাবে সেদ্ধ না করলে কী ক্ষতি?

ঈদুল আজহায় মাংসের নানা পদ তৈরি করি আমরা। বছরের অন্যান্য সময়েও ঘরে-বাইরে মাংসের বহু পদ খাওয়া হয়। মাংস সুস্বাদু খাবার। পুষ্টিগুণেও দারুণ। তবে মাংস সঠিকভাবে সেদ্ধ করা না হলে তা হতে পারে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ। এ বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. কাকলী হালদার-এর সঙ্গে কথা বলে জানাচ্ছেন রাফিয়া আলম

স্বাস্থ্যঝুঁকি বহু রকম

ভালোভাবে সেদ্ধ না করলে মাংসের মাধ্যমে ছড়াতে পারে বহু জীবাণু। এমন কিছু ব্যাকটেরিয়া ছড়াতে পারে, যেসব ফুডপয়জনিং বা খাদ্যে বিষক্রিয়ায় কারণ। সাধারণত এর উপসর্গ হিসেবে পেটব্যথা, ডায়রিয়া, বমি বা জ্বরের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। মলের সঙ্গে রক্তও যেতে পারে। জটিলতা সৃষ্টি হলে পানিশূন্যতা এবং লবণের তারতম্যও হতে পারে।

প্রাণী লালন–পালনের সময় কেউ যদি ভুল নিয়মে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করেন, তাহলে আরেক মুশকিল। সে ক্ষেত্রে ওই প্রাণীর শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী (অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট) জীবাণু সুপ্ত অবস্থায় থেকে যেতে পারে।

ওই প্রাণীর মাংস সঠিকভাবে সেদ্ধ না করে খেলে মানবদেহে ওই বৈশিষ্ট্যের জীবাণু চলে আসার ঝুঁকি সৃষ্টি হয়। আর অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ক্ষমতা থাকার কারণে ওই জীবাণুর সংক্রমণের চিকিৎসা করাও কঠিন হয়ে দাঁড়াতে পারে।

ভালোভাবে সেদ্ধ না করলে মাংসের মাধ্যমে এমন কিছু পরজীবীও ছড়ায়, যেসব দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা সৃষ্টি করে—

  • অপুষ্টি দেখা দিতে পারে

  • অন্ত্রের স্বাভাবিক গতিশীলতা নষ্ট হতে পারে

  • লিভার বা ফুসফুস মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে

  • এমনকি টক্সোপ্লাজমা নামক পরজীবীর সংক্রমণে একজন নারীর গর্ভপাতও হতে পারে কিংবা গর্ভের সন্তান জন্মগত ত্রুটি নিয়ে জন্মাতে পারে

সঠিকভাবে সেদ্ধ হলো তো?

স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা তো জানলেন। ঝুঁকি এড়ানোর শর্ত হলো স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে মাংস ব্যবস্থাপনা এবং রান্না করা। মাংসের যেকোনো পদ তৈরির সময় তা সঠিকভাবে সেদ্ধ হলো কি না, তা বুঝতে হলে এসব বিষয় খেয়াল রাখুন।

  • মাংস সেদ্ধ হলে রং বদলে যায়। লালচে বা গোলাপি ভাব থাকে না।

  • সেদ্ধ মাংসে চাপ দিলে যে রস বের হয়, সেটি লালচে বা গোলাপি রঙের থাকে না। বরং স্বচ্ছ বা হালকা বাদামি ধরনের হয়।

  • বাইরে থেকে সেদ্ধ মনে হলেও মাংসের ভেতরের দিকটা পরখ করে নিন। বিশেষ করে হাড়ের কাছাকাছি অংশে যেন লালচে বা গোলাপি ভাব না থাকে।

  • মাংস সেদ্ধ হলে তা পিচ্ছিল থাকে না এবং এর আঁশগুলো সুন্দরভাবে বোঝা যায়।

সুস্থ থাকতে

  • কাঁচা মাংস খালি হাতে না ধরাই ভালো। পরিষ্কার গ্লাভস পরে নিন। খালি হাতে মাংস ধরতে হলে আগে ভালোভাবে হাত ধুয়ে নিতে হবে।

  • কাঁচা মাংস নাড়াচাড়ার পরও হাত ধুয়ে নিন ভালোভাবে (গ্লাভস ব্যবহার করে থাকলেও)।

  • কাঁচা মাংসের জন্য ব্যবহৃত গ্লাভস, বঁটি, চাকু, চপিং বোর্ড, চাটাই প্রভৃতি অন্য কোনো কাজে ব্যবহারের আগে খুব ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে।

  • কাঁচা মাংস সংরক্ষণের সময় এর নিচে অন্য কোনো খাবার রাখবেন না। তাহলে মাংসের রস গড়িয়ে অন্য খাবারে পড়ার ঝুঁকি থাকবে না।

  • ঘরের মেঝেতে কাঁচা মাংস বা রক্ত পড়লে জীবাণুনাশক দ্রবণ দিয়ে মুছতে হবে।

  • মাংস ছোট করে টুকরা করা ভালো, তাহলে সহজে সেদ্ধ হবে।

  • একটি পদের জন্য কাছাকাছি আকৃতির টুকরা করা উচিত। কোনোটা বড় টুকরা আবার কোনোটা ছোট হলে বড় টুকরাগুলো সেদ্ধ হওয়ার আগে ছোট টুকরাগুলো গলে বা পুড়ে যেতে পারে।

  • সময় নিয়ে মাংস রান্না করুন। তাড়া থাকলে প্রেশার কুকার কাজে লাগান।

  • ভুনাজাতীয় পদ ঢেকে রান্না করুন।

  • কাবাব, গ্রিল বা বারবিকিউ–জাতীয় পদ তৈরি করতে চাইলে মাংস আগেই কিছুটা সেদ্ধ করে নেওয়া উচিত। তাহলে মূল রান্নার সময় মাংস পুরো সেদ্ধ হয়ে যাবে সহজে।

  • আগুনে পোড়াতে চাইলে আগুনের আঁচ খুব বেশি দেবেন না। তাহলে ভেতর কাঁচা থাকতেই বাইরেটা পুড়ে যাবে। বরং মাঝারি আঁচে ধীরে ধীরে সেদ্ধ করুন, যেন ভেতরটা ভালোভাবে গরম হয়। পোড়ানোর সময় আগুনের ঠিক ওপরে মাংস না রেখে সামান্য সরিয়ে রাখতে পারেন।

  • সংরক্ষণের জন্য এমনভাবে প্যাকেট করা উচিত, যাতে তা বের করা হলে একবারেই পুরোটা রান্না করা হয়ে যায়। বারবার তা ডিপফ্রিজে তুলতে না হয়।

  • ডিপ ফ্রিজে রাখা মাংস জমাট অবস্থায় রান্না করতে গেলে ভালোভাবে সেদ্ধ হবে না। তাই আগে সাধারণ ফ্রিজে রেখে গলতে দেওয়া ভালো। তাড়া থাকলে সাধারণ তাপমাত্রার পানিতে রেখে গলতে দিতে পারেন কিংবা মাইক্রোওয়েভের ডিফ্রস্ট অপশন কাজে লাগাতে পারেন।

  • রান্না করা মাংস ফ্রিজ থেকে বের করে খেতে হলে সেটিও ভালোভাবে গরম করে নিন।