অলংকরণ : এস এম রাকিবুর রহমান। গ্রাফিকস: প্রথম আলো
অলংকরণ : এস এম রাকিবুর রহমান। গ্রাফিকস: প্রথম আলো

গুচ্ছকবিতা

কারাগার আকাশ দেখে, বন্দীরা দেখতে পায় না

নীরবতা

নীরবতায়
বসে আছে কাক
একাকী ডালে।

ঝাঁক ঝাঁক সোনালি পাখি
উড়ে যাচ্ছে
অথই নীরবতায়।

বসে আছে কাক
উড়ে যাচ্ছে পাখি
একাকী, একাকী—

দূর থেকে আড়ালে
কেউ দেখছে—
কাক ও পাখির কারুকাজ
অর্থময় গহনতায়—

নীরবতার সাথে দেখা করছে
নীরবতা।
ক্রমশ জেগে উঠছে
আলোর পৃথিবী।

লাস্ট ট্রেন

লাস্ট পেগ, লাস্ট ট্রেনের মতো অপেক্ষার ধাতব যেন।
শেষ হয়–হয় করে শেষ হয় না।
কত আর অপেক্ষা ট্রেন আসে না।

আমিও নাছোড়, খেতে থাকি তরলে সরল মিশায়ে
যতক্ষণ না আসে ভোর
ভোরের যাত্রীদের ঘুম ঘুম চোখমুখ দেখে মায়া হয়
তারা নিমেষে আমার দিকেও তাকায়ে রয়
ভাবে কিনা লোকটা মাতাল
আমি যে কান পেতে আছি পাতালের রেলে
ওরা তা–ও জানে না।

মানুষের বোকাসোকা মুখ দেখলে বেশ ভালো লাগে
হাসি পায়
কত–না সরল এরা
এঁড়ে বাছুরের মতো ত্যাড়া
লাফ দিয়ে ওঠে
আমার মোটেও তাতে আপত্তি নাই
যদি থাকে ক্ষমতা
আমার ধারাপাত-নামতার কোনো দাম নাই জানি
তুমিও তা জানো, আমি–তুমি
আমরা কে কার না কত ওপরে উঠেছি কতবার
আর নেমেছি আর উঠেছি
তাতে কার যায়–আসে না
আমাদের সকল রান্না
কান্নার সমান হয়ে আজ
মিশেছে যে ধারাপাতে
সেসব খবর নিতে জন্মেছে আজ স্যাটেলাইট
চলো আগের মতো আরও একবার ফাইট দিয়ে
চুম ও করাতে ধার দিয়ে
ঘুমায়ে পড়ি
যত হুড়মড়ি করে লাভ নাই
আমার এমন দশাই আজ বয়সের ভারে
তবুও তোমারে যে চাই
কে কথা কী বলো সখি বৃথাই বৃথাই
নয়
কত নয়ছয় হয়, হইতেছে সমাজে
নমাজে কাতারে মিলে
সবাই নি বলাবলি করে
কার ঘর কে দেয় পাহারা সখি তুমি ছাড়া বলো
আমারে না নিলে নায়রে

না–দেখা আকাশ

আকাশ দেখতে পারছি না। এটা একটা সমস্যা।
জানালা খুললেই অপর পাশে দেয়ালে জানালা লেপ্টে আছে দেখা যায়।
কত দিন দেখি না তোমার মুখ ও মায়ার শুভশ্রী।

জানালার ওপারে আকাশ ঝুলে আছে। হয়তো কখনো নীল কখনো মেঘে ঢাকা। আকাশ দেখতে পাচ্ছি না। এটা একটা সমস্যা।
এই হেন দশায়, নিজেকে কারাগারে থাকা দুর্ধর্ষ বন্দীর মতো মনে হয়। কেবল তোমার আকাশের কথা ভাবতে থাকি।

কারাগার আকাশ দেখে, বন্দীরা দেখতে পায় না।
আমি যেখানে থাকি প্রাচীরের সেই দেয়ালও আকাশ দেখে।

আমি আকাশ দেখতে পারি না। এটি একটা দমবন্ধ করা সমস্যা।
এই শহরে খোঁজ নেওয়ার মতো
মানুষ তো দূরের কথা, একটা পাখিও নেই।
আকাশ দেখতে পারি না বলে
পাখিও দেখি না।

কুকুর, বিড়াল, প্রজাপতি বা পিঁপড়াদেরও দেখা যায় না।
না লতাগুল্ম, গাছপালা ও প্রাণপ্রকৃতি দেখতে পারি ইদানীং।
ফলে প্রাণ ও মায়া শুকিয়ে যেতে যেতে
সর্বপ্রাণে আরও বেড়ে যায়। জেগে ওঠে মমতা।

মানুষের নিয়তি এই:
নিদানকালে বন্ধু-স্বজন ও সতীর্থরাও
আকাশে মুখ তুলে নেয়—
কারও মন পোড়ে না এই ব্যস্ততম জঘন্য নগরে।

ভাবতে পারে না মানুষ প্রাণ ও প্রকৃতির কথা
মানুষের কথা, প্রেম ও মায়ার কথা—

অথচ তোমার আমার সম্পর্ক ছাড়া জীবন অনর্থমাত্র!

মুখ

মুখ দেখছি, আর ভাবছি—প্রতিনিয়ত কেমন বদলে যাচ্ছে সুরূপার আঁচলের অস্থিরতার মতো। পৃথিবীর জন্মাবার আগে সুস্পষ্ট দানার মতো প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিল আমার মুখ! এখন বদলে যাচ্ছে মুখমণ্ডল অস্থির রাজনীতির মতো; যেমন তুমি অতি-সম্মোহনে ভাটার মতো চরাচর ছেড়ে দূরবর্তী হতে থাকো—সংশয়ে, ভয়ে!
প্রথম পৃথিবীর স্বাধীন চঞ্চলতার কথা জানি। পৃথিবী জানে না কেমন ছিল দেখতে মায়ের মুখ! দূরগামী হাওয়ার বিশ্বাস থেকে সুতীব্র তরুণ বাসনা এনে তোমাদের মুখে মুখে পরিয়ে দিতে চাই যমুনার উচ্ছ্বাস—আমাদের মুখমণ্ডল যাতে বদলে না যায়, যাতে তুমি ভাবতে পারো পতাকাই আমার স্বাধীনতার মুখ।

কারও না আসায়

কারও না আসায়
যদি আসে–যায়
যদি কপচায় মন
যদি কারও চায় সযতন

এই সন্ধ্যা দাঁড়ায় অকারণ
কারও অপেক্ষায় কী বারণ
মনে মন দিতে, মন দিতে নিতে
হিতে বিপরীতে, কী আশায়
তুমি কার, ইশারার!

মশগুল অপশাসনে
মন আসনে কেমনে দাঁড়াও
নির্বিচার বাড়াও হাত জড়ায়ে
তেলে ও বেগুনে কড়ায়ে
রেখেছে সারাক্ষণ!

তুমি কি রাবণ, না দুর্যোধন
রাধা, না লীলা-শ্যাম
দুঃশাসন! না তুমি মন, পদ্মহেম!

মন চনমন, হাওয়া রঞ্জন
শুধু হেলাফেলা, কারও অবহেলা
বয়ে যায়, প্রেম যমুনায়
ভাসে আনমন, রক্তে কত রণ
এত আলোড়ন রাত সয় না
কারও না আসায়, কত অসহায়
মন নেয় না, মন বয় না!

যে চায় না-চায় হায়
গঙ্গাজলে প্রেম ভেসে যায়
যমুনায়, কে চেয়ে রয়
অবুঝ হৃদয় যার কাঁপে অনায়াস

কার শ্বাসপ্রশ্বাস বেজে চলে
সহৃদয় রাখে সচলে
তার সাথে মিশেমিলে
শিমুলতুলার মতন ভেসে যায়
চিদাকাশ তোলপাড় করে
যে ভাসায়, কে ভাসায়!
তাহারে, কাহারে কাঁদায়, হাসায়—

আমারে যে চায়, না–চায়
কারও না আসায়
যদি আসে–যায়
যদি মন কপচায়
যদি খেতে চায় গন্ধম
আদম পুনরায়
হাওয়া ভেসে এসে
যদি চায় আকাঙ্ক্ষার ফল
নিষ্ফল কামনার জল
কোথায় হারায়!

যদি আসে ফিরিয়া
মনে ভরিয়া নিয়ো
আপন করিয়া কোলে
রাখিও বুকে সযতনে মনে
কলসির নীরব জলের উতরোলে,
নীরব উত্থানে!