
করোনাভাইরাসজনিত অর্থনৈতিক সংকট বাংলাদেশে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গভীরতর হচ্ছে। জাতীয় ও বৈশ্বিক উভয় স্তরেই সংকটের মাত্রা নজিরবিহীন। এ কথা এখন অবধারিত যে বৈশ্বিক অর্থনীতি এক বিশাল মন্দার মধ্যে পড়তে চলেছে। বাংলাদেশে অর্থনৈতিক সংকট দীর্ঘায়িত হলে সামাজিক সংকটেরও একটি বড় ঝুঁকি রয়েছে। বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসংকটও বিশাল। করোনাভাইরাস সংক্রমিত মানুষের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং একই সঙ্গে মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়ছে।
যদিও এই সংকটের সময়ে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে, এ বিষয়ে কারও কোনো দ্বিমত নেই যে বাংলাদেশের অর্থনীতির যেসব চালিকা শক্তি আছে, তার প্রতিটিই এই অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে বিশালভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রপ্তানি খাত, বিশেষ করে পোশাকশিল্প, রেমিট্যান্স, দেশীয় শিল্প এবং সেবা খাত, কৃষি, পোলট্রি, মৎস্য এবং বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প। এই সংকট দেশে দরিদ্র এবং অসহায় জনগোষ্ঠীর ওপরেও ব্যাপক প্রভাব ফেলছে।
সানেমের চলমান গবেষণায় দেখা যাচ্ছে যে এই সংকটের কারণে দারিদ্র্যের হারের বড় এক উল্লম্ফন হতে পারে এবং দেড় দশক ধরে বাংলাদেশে দারিদ্র্য হ্রাসের সাফল্য এই সংকটের কারণে হারিয়ে যেতে পারে। তবে বাংলাদেশে অর্থনীতিতে চলমান সংকটের প্রভাবের গভীরতা নির্ভর করবে এই সংকটের স্থায়িত্ব এবং ব্যাপ্তির ওপর। এ সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত এই সংকটের গতি–প্রকৃতি বিবেচনা করে এ কথা অবশ্যই বলা যায় যে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সামাজিক অর্জনের ওপর এই সংকট বড় ধরনের এক দাগ ফেলতে যাচ্ছে।
চলমান অর্থনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকার একটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে যেটি একটি বড় অঙ্কের এবং সামনের দিনে এটির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। তবে এই প্রণোদনা প্যাকেজের সাফল্য নির্ভর করছে তিনটি বিষয়ের ওপর—অর্থের সংকুলান, ব্যবস্থাপনা এবং তদারকি।
এই বিশাল অঙ্কের অর্থসংকুলানের জন্য চারটি উৎস হতে পারে। প্রথমে অবশ্যই প্রয়োজন হচ্ছে সরকারের যেসব ‘অপ্রয়োজনীয়’ অথবা কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প আছে সেগুলোকে অবিলম্বে স্থগিত বা বাতিল করা। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এবং এডিবির কাছ থেকে ঋণ নেওয়া। তৃতীয়ত, ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ নেওয়া। তবে ব্যাংকিং খাতের চলমান সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে যথেষ্ট সতর্কতার সঙ্গে ঋণ নেওয়া প্রয়োজন। এই তিন ক্ষেত্র থেকেও যদি না হয়, তাহলে চতুর্থ উপায়টি হচ্ছে টাকা ছাপানো। যদিও আমি মনে করি টাকা ছাপানোকে একদমই শেষ উপায় হিসেবে রাখা দরকার।
প্রণোদনা প্যাকেজের সঠিক ব্যবস্থাপনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রণোদনা প্যাকেজের দুটি দিক আছে। একটি হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পগুলোর জন্য সহায়তা প্রদান করা এবং আরেকটি হচ্ছে দরিদ্র ও অসহায় জনগোষ্ঠীর খাদ্যসংকট ও অন্যান্য সমস্যা মোকাবিলা। এ দুটি ক্ষেত্রে কীভাবে অর্থ বিতরণ করা হবে, কে পাবে এবং কীভাবে পাবে—এ পুরো প্রক্রিয়াকে যথার্থভাবে কার্যকরী হতে হবে। এ পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থের ব্যবহারের এবং ব্যবস্থাপনার সঠিক তদারকি না হলে এর উদ্দেশ্য ভীষণভাবে ব্যাহত হবে। এর জন্য অবিলম্বে একটি জাতীয় মনিটরিং কমিটি গঠন করা দরকার, যেখানে সরকারের প্রতিষ্ঠানসমূহ, এনজিও, সিভিল সোসাইটি, ব্যবসায়ী মহল এবং শ্রমিক সংগঠন থেকে প্রতিনিধিরা থাকবেন।
চলমান এই সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে একটি দুই বছর মেয়াদি অর্থনীতির পুনরুদ্ধার পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে, যার মূল উদ্দেশ্য হবে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সংকটের পূর্বকালীন অবস্থানে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া। এই সময়ে, সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের যথাযথ বাস্তবায়ন করা এবং একই সঙ্গে বাণিজ্য, করকাঠামো এবং ব্যাংকিং সেক্টরে ‘রাজনৈতিকভাবে বাস্তবায়নযোগ্য’ কিছু অতি প্রয়োজনীয় নীতি সংশোধন (পলিসি রিফর্ম) করা দরকার।
এ ক্ষেত্রে আগামী জাতীয় বাজেট (২০২০-২১) হতে হবে একেবারেই গতানুগতিক ধারার বাইরে। এই বাজেটে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে স্বাস্থ্য খাত, ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনৈতিক খাতসমূহ এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা থাকা দরকার। এসব খাতে প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় প্রচুর পরিমাণ অতিরিক্ত অর্থের সংকুলানের জন্য এখনই একটি ত্বরিত মূল্যায়ন দরকার। এই সময়ে বাজেট ঘাটতির দিকে তাকালে চলবে না। সাধারণ সময়ের ৪-৫ শতাংশ বাজেট ঘাটতির বিপরীতে এই সংকটের সময়ে সরকার ৮-১০ শতাংশ পর্যন্ত বাজেট ঘাটতি বিবেচনা করতে পারে।
চারটি খাতের দিকে অবিলম্বে বিশেষ নজর দেওয়া দরকার: স্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষি এবং অর্থনীতির স্বাভাবিক করা।
১. করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট সংকট আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয়ের এবং সরকারি উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই। আশ্চর্যজনকভাবে, গত দুই দশকে বাংলাদেশে জিডিপির অনুপাতে স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় রয়ে গেছে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশের মতো, যা কিনা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হ্রাস পেয়েছে। এই ব্যয় জিডিপির অনুপাতে অন্ততপক্ষে ৪ শতাংশ করা দরকার। সাম্প্রতিক সংকট দেখাচ্ছে আমাদের সরকারি হাসপাতাল এবং সরকারি স্বাস্থ্যসেবার বেহাল দশা। একই সঙ্গে আমরা দেখতে
পাচ্ছি বেসরকারি হাসপাতাল এবং বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার বড় মাত্রায় দায়বদ্ধতার অভাব। এ কথাও মনে রাখা প্রয়োজন যে স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয়ের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধির সঙ্গে ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
২. দরিদ্র এবং অসহায় জনগণের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় যে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর তালিকা সরকারের কাছে আছে তার ভিত্তিতে অতি দ্রুত স্থানীয় পর্যায়ে সংকটকালীন অপরিহার্য খাদ্য বিতরণ করা দরকার। অতি দ্রুত নতুন তালিকা তৈরি করা, যাতে বাদ পড়া দরিদ্র জনগোষ্ঠী এবং আর্থিকভাবে অসহায় জনগণকে অন্তর্ভুক্ত করা যায় এবং তাদেরও অপরিহার্য খাদ্য বিতরণ করার কর্মসূচির আওতাধীন করা যায়। তালিকা তৈরি ও হালনাগাদ করতে, খাদ্য বিতরণে, এবং এই পুরো প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ঠেকাতে স্থানীয় পর্যায়ে প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, স্বেচ্ছাকর্মী এবং বেসরকারি উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান (যেমন ব্র্যাক এবং অন্যান্য এনজিও) যৌথভাবে কাজ করতে পারে। বেসরকারি খাতের সক্ষম ব্যক্তিদের এবং বেসরকারি খাতের সংগঠনগুলোর (যেমন বিজিএমইএ, এফবিসিসিআই, এমসিসিআই, ডিসিসিআই) এগিয়ে আসা প্রয়োজন তাদের আওতাধীন শ্রমিক-কর্মচারীদের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে।
৩. কৃষকদের জন্য সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজ কার্যকরী করার জন্য কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। যেহেতু কৃষি উপকরণের বাজারের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, কৃষকদের শুধু ঋণ দিয়ে কৃষি খাতের বর্তমান সংকটের সমাধান করা যাবে না। এর জন্য প্রয়োজন কীভাবে এ অচলাবস্থার মধ্যেও, স্বাস্থ্যগত বিধি মেনে মাঠপর্যায়ে কৃষি উপকরণের সরবরাহ সচল রাখা যায় সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া। এ ক্ষেত্রে কৃষি মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে যৌথভাবে কাজ করতে হবে স্থানীয় প্রশাসন এবং ব্যবসায়ীদের সঙ্গে। আশু এক সংকট হলো বোরো ধানের ব্যবস্থাপনা নিয়ে। কৃষিশ্রমিকেরা, যঁারা উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে সারা দেশে বোরো ধান আবাদের সময়ে কাজ করতে যান, তাঁরা এই অচলাবস্থার মধ্যে যাতায়াত করতে পারছেন না। এই কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে কৃষিশ্রমিকের চরম সংকট দেখা দিচ্ছে। একই রকম সংকট দেখা যাচ্ছে গ্রীষ্মকালীন ফলের চাষের ক্ষেত্রেও। এ ক্ষেত্রেও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে কৃষি, স্বাস্থ্য, পরিবহন এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে যৌথভাবে কাজ করতে হবে কৃষিশ্রমিকদের স্বাস্থ্যগত বিধি মেনে নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করার জন্য। এ বিশেষ সংকটের সময়ে আমার সুপারিশ হচ্ছে এই প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় কৃষকদের জন্য সুদহীন ঋণের। মনে রাখা প্রয়োজন, সামনের দিনে ব্যাপক জনগোষ্ঠীর খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে এক বড় চ্যালেঞ্জ। এ জন্য কৃষি খাতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে এবং কৃষি উৎপাদন যাতে ব্যাহত না হয়, তার জন্য সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।
৪. শ্রমিকদের জন্য সর্বোচ্চ স্তরের স্বাস্থ্য সুরক্ষা মান বজায় রেখে প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক ক্ষেত্রগুলো সীমিত আকারে খোলা রাখার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং মালিকদের একসঙ্গে খাতভিত্তিক এবং অঞ্চলভিত্তিক যথাযথ প্রটোকল তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে এই প্রটোকল কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, তার সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। তবে নিশ্চিতভাবেই, এ রকম উদ্যোগ কার্যকরী করা নির্ভর করছে দেশে করোনাভাইরাসজনিত স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ঝুঁকির মাত্রার ওপর, যা প্রতিদিনই পরিবর্তিত হচ্ছে।
সবশেষে আমি মনে করি, যে ধরনের সংকট আমরা অতিবাহিত করছি এবং সামনের দিনগুলোতে এ সংকটের কারণে অর্থনৈতিক যে বিশাল ধাক্কা আমরা পেতে যাচ্ছি, সেটি সামলে ওঠার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়। এ ক্ষেত্রে সরকার, এনজিও, সিভিল সোসাইটি, বিভিন্ন শিল্প ও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান এবং তাদের সংগঠন, শ্রমিক সংগঠন সবাইকে একসঙ্গে কাজ করা দরকার।
ড. সেলিম রায়হান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক এবং সানেম-এর নির্বাহী পরিচালক