সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের নিউজফিড ভরে উঠেছে, বুলেটের শেষকৃত্যে তাঁকে শেষবারের মতো জড়িয়ে ধরে বিদায় জানানো স্ত্রী উর্মি হীরার আহাজারির ছবি, ভিডিও।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের নিউজফিড ভরে উঠেছে, বুলেটের শেষকৃত্যে তাঁকে শেষবারের মতো জড়িয়ে ধরে বিদায় জানানো স্ত্রী উর্মি হীরার আহাজারির ছবি, ভিডিও।

মতামত

‘আমার বুলেট আর নাই’—এর চেয়ে দীর্ঘ বাক্য আছে?

কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগীর সম্ভাবনাময় জীবন মাত্র ৩৫-এ এসেই থেমে গেল। তাঁর স্ত্রী উর্মি হীরা বিবাহবার্ষিকীর এক সপ্তাহের মধ্যে স্বামীকে হারালেন। একমাত্র সন্তান অব্যয় প্রথম জন্মদিনের এক দিন আগে তার বাবাকে হারাল। বুলেটের বাবা-মা তাঁদের একমাত্র সন্তানকে হারালেন।

একটা মৃত্যু কতগুলো মানুষের জীবনে অন্তহীন শূন্যতা আর ট্র্যাজেডির উৎস হতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের নিউজফিড ভরে উঠেছে, বুলেটের শেষকৃত্যে তাঁকে শেষবারের মতো জড়িয়ে ধরে বিদায় জানানো স্ত্রী উর্মি হীরার আহাজারির ছবি, ভিডিও।

চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লার বাসায় ফেরার পথে নিখোঁজ হয়েছিলেন বুলেট বৈরাগী। ক্রিকেট ব্যাট হাতে বুলেটের ছবি দিয়ে সেই নিখোঁজ হওয়ার খবর ও সন্ধান চেয়ে তাঁর স্ত্রী ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলেন। অনেকে সেটা শেয়ার করেছিলেন। তাঁদের কথা ভেবেই হয়তো বুলেটের নিহত হওয়ার সংবাদও তিনি ফেসবুকে জানিয়েছিলেন। চারটি শব্দে। ‘আমার বুলেট আর নাই।’ এর চেয়ে দীর্ঘ আর ভারী শব্দের বাক্য থাকতে পারে বলে আমার জানা নেই।

ক্রিকেট ব্যাট হাতে বুলেটের ছবি দিয়ে সেই নিখোঁজ হওয়ার খবর ও সন্ধান চেয়ে তাঁর স্ত্রী ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলেন।

র‍্যাব বুলেটের ঘাতকদের গ্রেপ্তার করেছে। সংবাদ সম্মেলনে র‍্যাব জানিয়েছে, বুলেট বৈরাগী চট্টগ্রাম থেকে প্রশিক্ষণ শেষে কুমিল্লার বাসায় ফিরছিলেন। গত শুক্রবার দিবাগত রাত তিনটার দিকে তিনি বিশ্বরোড এলাকায় আসেন। তখন গ্রেপ্তার জুয়েল তাঁর গন্তব্য জানতে চান। বুলেট বৈরাগী জাঙ্গালিয়া যাবেন জানালে সোহাগ ও হৃদয় তাঁকে অটোরিকশায় তুলে নেন। পথে ধারালো অস্ত্র দিয়ে সোহাগ, জনি ও হৃদয় বুলেট বৈরাগীকে আঘাত করেন। ভয় দেখিয়ে তাঁর কাছ থেকে মুঠোফোন, টাকা ও ব্যাগ ছিনিয়ে নেন। বুলেট বৈরাগীর সঙ্গে অপরাধীদের ধস্তাধস্তি হয়। একপর্যায়ে চলন্ত অটোরিকশা থেকে ছিনতাইকারী চক্রের সদস্যরা বুলেট বৈরাগীকে রাস্তায় ফেলে দেন। মাথা ও মুখে গুরুতর আঘাত পেয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান তিনি। (‘চালক ও যাত্রীবেশে থাকা ছিনতাইকারীর হাতে বুলেট নিহত’, প্রথম আলো, ২৮ এপ্রিল ২০২৬)

মনে পড়ল আমাদের বন্ধু দন্তচিকিৎসক বুলবুলের কথা। আহমেদ মাহী বুলবুল খুন হয়েছিলেন ২০২২ সালের মার্চ মাসে। ভোরের ঢাকায় তাঁর ছুরিবিদ্ধ রক্তাক্ত দেহ পড়ে ছিল রাজধানীর কাজীপাড়ার রাস্তায়। পথচারীরা তাঁকে উদ্ধার করে প্রথমে মিরপুর আল–হেলাল বিশেষায়িত হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে তিনি চিকিৎসা পাননি। পরে পুলিশ এসে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। বাসা থেকে বের হয়েছিলেন স্ত্রী আর দুই শিশুসন্তানের কাছে বিদায় নিয়ে। চিকিৎসার পাশাপাশি ঠিকাদারি করতেন। সেই কাজেই নোয়াখালী যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেটাই তাঁর অনন্তযাত্রা হয়ে গেল। (‘সামিয়ার পর বুলবুল, আমাদের জীবনের নিরাপত্তা কে দেবে’, ৩০ মার্চ ২০২২, প্রথম আলো)

মব সহিংসতা বন্ধে কার্যকর ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দৃশ্যমান পদক্ষেপ চান নাগরিকেরা। ইরান যুদ্ধ, জ্বালানি তেল, হামে শিশুদের মৃত্যু, হাওরে বন্যা—এই সব ডামাডোলের মধ্যেই সরকারের হানিমুন পিরিয়ড দ্রুত শেষ হয়ে আসছে।

বুলবুল ছিলেন ঢাকার রাজনৈতিক মহলে পরিচিত মুখ। গরিবের চিকিৎসক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন। ফলে আলোচিত এ খুনের ঘটনার তিন মাস পর সে বছরের জুন মাসে ডিবি পুলিশ চার খুনের সঙ্গে জড়িত পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছিল। পুলিশ জানিয়েছিল, ছিনতাইয়ে বাধা দেওয়ার কারণে ছিনতাইকারীরা বুলবুলকে ছুরি দিয়ে আঘাত করেছিলেন। সেই বছরের অক্টোবর মাসে পুলিশ পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে চার্জশিট দিয়েছিল। কিন্তু চার বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও কি বিচার হয়নি।

বুলেট হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় র‍্যাবের ভাষ্য পড়ার সময় একটাই কথা মনে হচ্ছিল, ইশ্ বুলেট যদি ছিনতাইকারীদের বাধা না দিত, তাহলে হয়তো এভাবে মরতে হতো না। আমরা এমন এক দেশে বাস করি, যেখানে ছিনতাইকারী ধরলে জীবন বাঁচাতে নিজের সর্বস্ব দিয়ে দিতে হয়, এমন বাস্তব কাণ্ডজ্ঞান আমরা শিখে নিই। আমাদের সবার মতোই বুলেট–বুলবুলদেরও এই বাস্তব কাণ্ডজ্ঞান না থাকার কোনো কারণ নেই। কিন্তু তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি কিংবা বিপদের মুহূর্তে মাথা ঠান্ডা রেখে বাস্তব কাণ্ডজ্ঞান প্রদর্শন করাটা মোটেই সহজ নয়। এখানে বাস্তবতা জ্ঞানের প্রশ্নটা গৌণ, মূল প্রশ্নটা নিরাপত্তার। তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হচ্ছে, দিন হোক আর রাত হোক নাগরিকের এই নিরাপত্তা দিতে সরকার ও পুলিশ আসলে কী করছে? যে নিরাপত্তা গাফিলতির জন্য বুলেটের এমন পরিণতি তাঁর পরিবারের পাশে কি সরকার দাঁড়াবে না?

ফিলিপনগরে পরিকল্পিতভাবে মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে মাজারে হামলা ও একজন পীরকে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডে কারা পরিকল্পনা করেছেন, কারা জড়িত, তাঁদের ছবি ও ভিডিও স্পষ্ট।

বুলেট কুমিল্লা বিশ্বরোডের যেখানে ছিনতাইকারীদের নির্মম শিকার হয়েছেন, সেটা যে ছিনতাইকারীদের ‘স্বর্গরাজ্য’ সেটা কে না জানে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই একই জায়গায় ছিনতাইকারীদের হাতে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা বর্ণনা দিয়েছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, ছিনতাইকারীদের কাছ থেকে নাগরিকের জীবন ও সম্পদ বাঁচাতে পুলিশ কী করেছে?

মাঝে জাতীয় নির্বাচনের আগে-পরে দুই-তিন মাস ছিনতাইয়ের ঘটনা অনেকটাই কমে গিয়েছিল। ছিনতাইয়ের ঘটনা আবার যে ভয়াবহভাবে বেড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই তার প্রমাণ মেলে। কারও কানের দুলের সঙ্গে কানের লতি হারানো, কারও মোবাইল ছিনতাইয়ের ঘটনা কিংবা সিসিটিভি ফুটেজে ছিনতাইয়ের ভিডিওগুলো আবারও সামনে আসছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলটা মব সহিংসতার সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ছিল নাগরিকদের উদ্বেগের বড় কারণ। নৃশংস খুন, টার্গেট কিলিং, নারী ও শিশু ধর্ষণের মতো ভয়াবহ অপরাধ বেড়ে গিয়েছিল। ছিনতাই-চুরি-ডাকাতির মতো অপরাধ বেড়ে গিয়েছিল। নাগরিকেরা আশা করেছিলেন একটা নির্বাচিত সরকার এলে অন্তত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হবে। নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে প্রতিদিন তাদের ঘর থেকে বের হতে হবে না, কিংবা ঘরের মধ্যেও নিরাপত্তাহীন থাকতে হবে না।

বিএনপি নির্বাচনী প্রচারণায় জননিরাপত্তাকে প্রাধান্য দেওয়ায় নাগরিকদের বড় একটা অংশ তাদের দিকে ঝুঁকে পড়ে। সরকার গঠনের পর জিনিসপত্রের দাম নিয়ন্ত্রণ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিকে অগ্রাধিকার দেয় বিএনপি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর প্রথম কর্মদিবসেই ঘোষণা দেন, মবের দিন শেষ। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মব সহিংসতা এবং আইন ও বিচারহীনতার ভীতিকর অভিজ্ঞতার পর এ ধরনের জোরালো বার্তা খুবই প্রয়োজন ছিল। তবে সরকার দায়িত্ব নেওয়ার দুই মাসে এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া কি হয়েছে, যাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান অগ্রগতি সরকারের অগ্রাধিকার সেটা বোঝা যাবে।

ফিলিপনগরে পরিকল্পিতভাবে মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে মাজারে হামলা ও একজন পীরকে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডে কারা পরিকল্পনা করেছেন, কারা জড়িত, তাঁদের ছবি ও ভিডিও স্পষ্ট। এরপরও কয়জন অপরাধী গ্রেপ্তার হয়েছেন? মব সহিংসতার মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে মাজারপন্থীদের বিরুদ্ধে উগ্রপন্থীদের দমন–পীড়ন অভিযান পরিচালিত হলেও সরকার বিবৃতি দেওয়ার মধ্যেই মূলত পদক্ষেপ সীমাবদ্ধ রেখেছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের নিষ্ক্রিয়তা বাস্তব সমাজ ও অনলাইন পরিসরে উগ্রপন্থীদের একটি অর্গানিক উত্থানের ক্ষেত্র তৈরি করে দিয়েছে। বর্তমান সরকারকে তার মেয়াদে যতগুলো বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে, উগ্রপন্থা দমন নিশ্চিতভাবে তার মধ্যে সামনের কাতারে থাকবে।

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, এপ্রিল মাসে দেশে ৪৯টি মবের ঘটনায় ২১ জন নিহত হয়েছেন। এ প্রেক্ষাপটে সরকার মুখে মব সন্ত্রাস নিয়ে কী বলছে, তার চেয়েও বড় বিষয় হচ্ছে এই সহিংসতা, ভিন্নমতাবলম্বী হত্যার বিরুদ্ধে কী ধরনের আইনগত পদক্ষেপ নিচ্ছে, সেটাই সবচেয়ে বড় সিগন্যাল। ফিলিপনগরের মব সহিংসতার ঘটনায় সরকার যেকোনো নাগরিকের ধর্ম চর্চার অধিকার রক্ষায় এখন পর্যন্ত কড়া কোনো সিগন্যাল দিতে পারেনি।

২২ এপ্রিল সমকাল–এ খুনের মতো নৃশংস অপরাধ বেড়েছে শিরোনামের প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, দেশে খুনের ঘটনা বেড়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন মাসে সারা দেশে ৮৫৪টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ২৮৭টি, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০ ও মার্চে ৩১৭টি। গড়ে প্রতি মাসে খুনের ঘটনা ২৮৪টি। ২০২৫ সালের প্রথম তিন মাসে খুনের ঘটনা ছিল ৭৫০টি। জানুয়ারিতে ২৯৪, ফেব্রুয়ারিতে ২১৭ ও মার্চে ২৩৯ জন খুন হয়েছিলেন। গত বছরের প্রথম তিন মাসে গড়ে হত্যার ঘটনা ২৫০টি। ২০২৪ সালের প্রথম তিন মাসে ৭১০টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। জানুয়ারিতে ২৩১টি, ফেব্রুয়ারিতে ২৪০ ও মার্চে ২৩৯টি। ওই বছরের প্রথম তিন মাসে গড়ে হত্যার ঘটনা ২৩৬টি।

এটা সত্য যে আওয়ামী লীগ আমলে পুলিশের চূড়ান্ত রকম দলীয়করণ এবং চব্বিশের অভ্যুত্থানে পুলিশি ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা—সব মিলিয়ে পুলিশকে পুরো সক্ষমতায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। একটা স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের দুর্বল শাসন অনেকের মধ্যে এমন ধারণার জন্ম হয় যে অপরাধ করলেও পার পাওয়া যায়।

জনসমাজে যখন এমন ধারণা গেড়ে বসে সেটা শিগগিরই ভাঙা সহজ কোনো কাজ নয়। তবে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কী পদক্ষেপ নিচ্ছে, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিগন্যাল। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার দুই মাস পর এসে আইনশৃঙ্খলা নিয়ে কঠোর বার্তা দিতে পারেনি। সেটা না হওয়ায় অপরাধীরা অনেকেই গর্ত থেকে বের হতে পারছে। কয়েক মাস বন্ধ থাকার পর ঢাকায় টার্গেট কিলিং ফেরা সেই বার্তাই দিচ্ছে।

মব সহিংসতা বন্ধে কার্যকর ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দৃশ্যমান পদক্ষেপ চান নাগরিকেরা। ইরান যুদ্ধ, জ্বালানি তেল, হামে শিশুদের মৃত্যু, হাওরে বন্যা—এই সব ডামাডোলের মধ্যেই সরকারের হানিমুন পিরিয়ড দ্রুত শেষ হয়ে আসছে।

  • মনোজ দে প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী

    monoj.dey@migrate--prothomalo.reframe.so

    মতামত লেখকের নিজস্ব