চিকিৎসকদের মতে, হাম সংক্রমণের পর তিন থেকে ছয় মাস পর্যন্ত শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল থাকে।
চিকিৎসকদের মতে, হাম সংক্রমণের পর তিন থেকে ছয় মাস পর্যন্ত শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল থাকে।

মতামত

হাম ছাড়লেও যম ছাড়ছে না

শিশু হাসপাতালের গেটে ইঞ্জিনচালিত রিকশার জন্য অপেক্ষা করছিলেন সাবেরা বেগম। কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়া যাবেন বোনের বাড়ি। সেখান থেকে যাবেন শরিয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার চর সেনসাস ইউনিয়নের খালাসিকান্দি। মেলা পথ। কোলে তার আট মাসের শিশু। বোনের বাড়ি বেড়াতে এসে হামের শিকার হয়েছিল তাঁর সন্তান। কোনো আশা ছিল না, তারপরেও ‘আল্লাহ ফিরায়ে দেছে।’

দিন পনেরো হাসপাতালে থেকে তাঁর যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, তার ভিত্তিতে তিনি বললেন,‘হাম ছাড়লেও যম ছাড়ছে না, মৃত্যু ঘুরছে শিশুদের পিছু পিছু।’ হাম শিশুদের জন্য একটা কঠিন ব্যারাম; রাবণের মতো এক মাথা কাটলে আরও মাথা গজায়। হাম থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি গিয়ে আবার ফিরে এসেছে অনেকে—কেউ নিউমোনিয়া নিয়ে, কেউ ডায়রিয়া নিয়ে ভুগতে ভুগতে মারা গেছে বাবা–মায়ের চোখের সামনে। অনেক ক্ষেত্রে কোনো ওষুধই কথা শুনছে না (অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করছে না)।

সাবেরা বেগমের কথার প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে জনস্বাস্থ্য–বিশেষজ্ঞ আর চিকিৎসকদের মুখে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে বলা যায়, হামের ধামাকা (সংক্রমণ) কিছুটা কমেছে, তবে গোল বাঁধছে হাম–পরবর্তী জটিলতা নিয়ে। উদ্বেগ বাড়ছে হাম–পরবর্তী জটিলতায় আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা নিয়ে। চিকিৎসকদের মতে, হাম হলে শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ভেঙে যায়। তাই সহজে শিশু নিউমোনিয়া, ডায়রিয়ার মতো রোগে বেশি বেশি আক্রান্ত হয়, সেই সঙ্গে পুষ্টির ঘাটতি উদ্বেগের মাত্রাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

পূর্ব ভারত আর মিয়ানমারকে টিকার চাদর থেকে বাইরে রেখে আমরা আমাদের চাদরে মাথা মুড়ে শুয়ে থাকলেও হাম ও সংক্রামক রোগের যম ছাড়বে না। তবে টিকার সঙ্গে সঙ্গে পুষ্টিকর খাবারের জোগান ঠিক রাখতে হবে। কোনো শিশু যদি খিদে নিয়ে ঘুমায়, তাহলে মৃত্যু থেকেই যাবে। হাম থেকে মুক্ত হলে প্রাণ যাবে নিউমোনিয়ায়, ডায়রিয়াসহ নানা ব্যাধিতে।

চিকিৎসকদের মতে, হাম সংক্রমণের পর তিন থেকে ছয় মাস পর্যন্ত শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল থাকে। সংক্রমণের সময় শিশুর শরীর থেকে ভিটামিন এ ও জিংকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদানও কমে যায়। এ সময় অ্যাডেনোভাইরাসের মতো সংক্রমণ সহজেই শরীরে আক্রমণ করতে পারে, তাই নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়া আরও মারাত্মক হয়ে ওঠে।

পুষ্টিবিদেরা অনেক দিন থেকেই বলছেন, দেশের ৬৫% শিশু ন্যূনতম প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার পায় না। অপুষ্টি হামে আক্রান্ত শিশুদের জটিলতা অনেক বাড়িয়ে দেয়। টিকাদান ও জনস্বাস্থ্য–বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী হাম–পরবর্তী জটিলতা নিয়ে গণমাধ্যমে বলেছেন, ‘অপুষ্টি শিশুদের রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। নিউমোনিয়া সবচেয়ে সাধারণ জটিলতা, পাশাপাশি ডায়রিয়া ও অন্যান্য সংক্রমণও দেখা যায়। একবার কোনো শিশু হামে আক্রান্ত হলে এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি, এমনকি আজীবনও হতে পারে। এটি স্নায়ুতন্ত্রকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং মৃত্যুঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। হাম রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমিয়ে দেয়, ফলে অন্যান্য সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে।’ তিনি শিশুর পুষ্টির দিকে বিশেষ নজর দিতে এবং তাদের বয়স উপযোগী মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

টিকা ছাড়াও অন্য বিষয়গুলো নিয়েও ভাবতে হবে

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, টিকা প্রদান স্বাভাবিক থাকলেও  কমপক্ষে ১৮ শতাংশ শিশু নিয়মিত টিকাদান থেকে বাদ পড়ে যায়। (সব ডোজ টিকা পায়নি দেশের ১৮ শতাংশ শিশু, প্রথম আলো ৪ মে, ২০২৫)। এ কারণে এই শিশুরা সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকে। এ ছাড়া সময়মতো ভিটামিন এ ক্যাপসুল না খাওয়া শিশুও ঝুঁকির তালিকায় আছে/ছিল। শিশুস্বাস্থ্য নিয়ে যাঁরা কাজ করছেন তাঁরা জানালেন, দুই বছর বয়স পর্যন্ত পর্যাপ্ত মায়ের বুকের দুধ না পেলে শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল করে দেয়।

কর্মজীবী মায়েদের শিশুরা কি বুকের দুধ পাচ্ছে?

সম্প্রতি মে দিবসের চেতনা নিয়ে ‘ভদ্দরলোকদের’ এক আলোচনা সভায় একজন পোশাকশ্রমিক প্রশ্ন তুলেছিলেন, এক দেশে দুই আইন কেমনে চলে। সরকারি কর্মীদের জন্য প্রণীত আইন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের জন্য প্রযোজ্য নয়।

বাংলাদেশে মাতৃত্বকালীন ছুটিতে বৈষম্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রম, লিঙ্গ ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। আইনগতভাবে মাতৃত্বকালীন ছুটি স্বীকৃত হলেও বাস্তবে বিভিন্ন খাত, শ্রেণি ও কর্মপরিবেশে নারীরা অসম সুবিধা পান। সরকারি কর্মচারীরা সাধারণত ছয় মাসের বেতনসহ মাতৃত্বকালীন ছুটি পান। কিন্তু অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে আইন অনুযায়ী সুবিধা পুরোপুরি দেওয়া হয় না। কোথাও চার মাস, কোথাও আংশিক বেতন, আবার কোথাও চাকরি হারানোর ভয় থাকে।

ফলে একই দেশের দুই নারী কর্মী চাকরির ধরন অনুযায়ী সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি হন। আমাদের অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রেখেছে যে পোশাকশিল্প এবং তার নারী কর্মীরা, সেখানে আছে গর্ভধারণ গোপন করার চাপ, ছুটি নিলে চাকরি হারানোর ভয়, মাতৃত্বকালীন ভাতা না পাওয়া, নবজাতকের যত্নের জন্য পর্যাপ্ত সময় না পাওয়া। এই সব চর্চার কারণে নারী কর্মীরা সব সময় আয়ের উৎস হারানোর ভয়ে ভীত থাকেন। বাধ্য হন সন্তানকে দ্রুত অন্যের জিম্মায় রাখতে। এ রকম পরিস্থিতিতে টানা দুই বছর বয়স পর্যন্ত শিশুকে পর্যাপ্ত বুকের দুধ কীভাবে খাওয়াবেন একজন কারখানাকর্মী মা?

চ্যালেঞ্জের শেষ নাই

সম্প্রতি নোয়াখালীভিত্তিক একটি মানবিক সংগঠন ‘প্রাণ’ হাম পরিস্থিতি বোঝার জন্য খুবই ছোট একটা তথ্য অনুসন্ধান (জরিপ) করেছিল। তারা নোয়াখালী সদর, সোনাইমুড়ী, হাতিয়া ও বেগমগঞ্জের হাসপাতালে ভর্তি শিশুদের ৩৩ জন অভিভাবক ও মাকে উদ্দেশ্যমূলক নমুনা নির্বাচনপদ্ধতিতে বাছাই করে সাক্ষাৎকার নেয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিরাপত্তা প্রটোকল অনুসরণ করে পাঁচজন প্রশিক্ষিত তথ্যসংগ্রাহক কাঠামোবদ্ধ প্রশ্নপত্র ব্যবহার করে তথ্য সংগ্রহ করেন।

টিকাদান কভারেজ, জ্ঞানের মাত্রা, টিকাদানে প্রতিবন্ধকতা এবং গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক-জনমিতিক সম্পর্ক নির্ণয়ের জন্য বর্ণনামূলক পরিসংখ্যান ও ক্রস-ট্যাবুলেশন পদ্ধতিতে তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়।

জরিপে দেখা যায়, মাত্র ১৮ দশমিক ২ শতাংশ শিশু হাম টিকার উভয় ডোজ গ্রহণ করেছিল। অন্যদিকে ৩৩ দশমিক ৩ শতাংশ কোনো টিকাই পায়নি এবং ৩০ দশমিক ৩ শতাংশ শুধু প্রথম ডোজ পেয়েছিল। ৯ মাসের কম বয়সী শিশুরা হাম সংক্রমণের তুলনামূলকভাবে বড় অংশ ছিল (৯ মাসের কম বয়সী শিশুর মধ্যে ৭৩ শতাংশ হাম পজিটিভ পাওয়া গেছে)। হাম আক্রান্তদের মধ্যে ছেলেশিশু ছিল ৭৫ শতাংশ।

টিকা না নেওয়ার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে ছিল টিকা দেওয়ার সময় সম্পর্কে অজ্ঞতা (২৭%), টিকার সময় শিশুর অসুস্থতা (২৪%) এবং টিকাকেন্দ্রের দূরত্ব (১৫%)। মাত্র ৩৩% পরিবার স্বাস্থ্যকর্মীদের বাড়ি পরিদর্শন পেয়েছিল। জরিপের ফলাফলে জরিপকারীরা লক্ষ করেছেন, যেসব পরিবারে শুধু বাবারা টিকাদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেখানে কোনো শিশুই পূর্ণ টিকাদান (উভয় ডোজ) পায়নি।

তথ্যের উৎস হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম (২১%) এবং প্রতিবেশীরা (২১%) প্রায় স্বাস্থ্যকর্মীদের (৪৯%) সমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। নোয়াখালী সদর, সোনাইমুড়ী, হাতিয়া ও বেগমগঞ্জের গবেষণাধীন জনগোষ্ঠীর মধ্যে টিকাদান কভারেজ অত্যন্ত কম এবং সেখানে কাঠামোগত, আচরণগত ও জ্ঞানসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। জরিপকারী সংগঠনটি মনে করে, তাদের জেলায় চলমান হাম প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ এবং ভবিষ্যতে পুনরুত্থান প্রতিরোধে কমিউনিটিভিত্তিক লক্ষ্যকেন্দ্রিক প্রচার কার্যক্রম, স্বাস্থ্যকর্মীদের বাড়ি পরিদর্শন জোরদার করা এবং পুরুষ অভিভাবকদের সম্পৃক্ততার মাধ্যমে প্রতিবন্ধকতা দূর করা জরুরি।

পাহাড়েও নিজেদের উদ্যোগে কেউ কেউ একই ধরনের জরিপ করছেন। আসলেও প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝার জন্য সরকার এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এগিয়ে আসা জরুরি। টিকা ক্যাম্পেইনের মতো এটাও খুব জরুরি একটা কাজ।

হাম ও রুবেলা নির্মূল করার খুব কাছে এসে কেন কোন পাপে আমাদের মহামারি মোকাবিলা করতে হচ্ছে, তার আগাপাছতলা জানার কোনো বিকল্প নেই। জনস্বাস্থ্যের গতিপথ এভাবে পাল্টে যাওয়ার পেছনে বড় দায় কার? শুধুই কি গাফিলতি, না মানুষের মধ্যেও অন্য কিছু বাসা বেঁধেছে সবার অলক্ষে। সমস্যাটা কি শুধুই বাংলাদেশেরই?

প্রতিবেশীদের দিকে তাকালেও দেখা যাবে, তাদের পরিস্থিতিও ঘোলাটে।  কানাডা হারিয়েছে তার হামমুক্ত দেশের তকমা। ধর্মীয় অনুভূতি পুঁজি করে অনলাইনে আসছে উদ্ভট সব তত্ত্ব। টিকার প্রতি অনীহা অথবা জয় করে ফেলার দাম্ভিকতা কি আমাদের পিছিয়ে দিচ্ছে।

পূর্ব ভারত আর মিয়ানমারকে টিকার চাদর থেকে বাইরে রেখে আমরা আমাদের চাদরে মাথা মুড়ে শুয়ে থাকলেও হাম ও সংক্রামক রোগের যম ছাড়বে না। তবে টিকার সঙ্গে সঙ্গে পুষ্টিকর খাবারের জোগান ঠিক রাখতে হবে। কোনো শিশু যদি খিদে নিয়ে ঘুমায়, তাহলে মৃত্যু থেকেই যাবে। হাম থেকে মুক্ত হলে প্রাণ যাবে নিউমোনিয়ায়, ডায়রিয়াসহ নানা ব্যাধিতে।

গওহার নঈম ওয়ারা লেখক ও গবেষক
wahragawher@gmail.com
মতামত লেখকের নিজস্ব