
করোনাকালে যখন চারদিক থেকে হতাশার খবর আসছে, তখন দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর সম্পর্কে ইতিবাচক প্রতিবেদন নিশ্চয়ই আশা জাগায়। সম্প্রতি জলদস্যুদের পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম ব্যুরো বা আইএমবি ও দ্য রিজিওনাল কো-অপারেশন অ্যাগ্রিমেন্ট অন কমব্যাটিং পাইরেসি অ্যান্ড আর্মড রাবারি অ্যাগেইনস্ট শিপস ইন এশিয়া বা রিক্যাপের প্রতিবেদনে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের জলসীমাকে দস্যুতামুক্ত বলে অভিহিত করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ সালের প্রথম ছয় মাসে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের জলসীমায় দস্যুতার কোনো ঘটনা ঘটেনি। বাংলাদেশের মতো দক্ষিণ চীন সাগর ও সুলু সাগরও দস্যুতামুক্ত ছিল। অন্যদিকে ভারত, সিঙ্গাপুর প্রণালি, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, ভিয়েতনামসহ বিশ্বের জলসীমায় ৬৮টি সশস্ত্র ডাকাতি ও দস্যুতার ঘটনা ঘটেছে। ঝুঁকিপূর্ণ এই তালিকায় নেই বাংলাদেশ। উল্লেখ্য, ২০১৯ সালেও চট্টগ্রাম বন্দরের জলসীমা দস্যুতামুক্ত ছিল। এই সাফল্যের জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর সদস্যরাও সাধুবাদ পেতে পারেন।
চট্টগ্রামের জলসীমায় সুদান উপকূলের মতো বড় ধরনের দস্যুতা না ঘটলেও ছোটখাটো চুরি-ডাকাতি ঘটত। ২০১০ সালে সর্বোচ্চ ২১টি,
২০১১ সালে ১৪টি, ২০১২ সালে ১২টি, ২০১৫ সালে ১০টি, ২০১৬ সালে ১টি, ২০১৭ সালে ১১টি এবং ২০১৮ সালে ৯টি চুরির ঘটনা ঘটেছে। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশের জলসীমাকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে।
তদারকি সংস্থাগুলোর সূত্রে জানা গেছে, অতীতে নোঙর করা জাহাজের কিছু কিছু চুরি ও ডাকাতির ঘটনার সঙ্গে একশ্রেণির নাবিক জড়িত ছিলেন। গভীর সমুদ্রে নোঙর করা এসব জাহাজে যাঁরা অননুমোদিতভাবে খাবার সরবরাহ করতেন, তাঁদের সঙ্গে অসাধু নাবিকদের ‘বিনিময় চুক্তি’ হতো। বিনা মূল্যে খাবার সরবরাহের বিনিময়ে তাঁরা জাহাজ থেকে কিছু পণ্য সরিয়ে ফেলার সুযোগ করে দিতেন এবং পরে পণ্য চুরি বা ডাকাতি হয়েছে বলে বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে নালিশ করতেন।
গভীর সমুদ্রে জাহাজে এই চুরি-ডাকাতি রহিত করতে বন্দরের বেতার নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে ভেসেল ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম বা ভিটিএমআইএসের মাধ্যমে সচিত্র তদারক করা হয়। সন্দেহজনক কোনো নৌযানের উপস্থিতি দেখলে বন্দর থেকে কোস্টগার্ডকে জানানো হয়। উল্লেখ্য, দেশের জলসীমা উপকূল থেকে সাগরের দিকে ১২ নটিক্যাল মাইল এলাকা পর্যন্ত নজরদারি করে কোস্টগার্ড। ১২ নটিক্যাল মাইলের পর থেকে দেশের সমুদ্রসীমা পর্যন্ত নজরদারি করে নৌবাহিনী। তিন সংস্থার নিবিড় তদারকির কারণে বন্দরের জলসীমায় চুরি-ডাকাতি শূন্যে নামিয়ে আনা নিশ্চয়ই প্রশংসনীয় কাজ। এতে বহির্বিশ্বে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর তথা বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে। বিদেশি জাহাজের নাবিকেরাও এ জলসীমাকে নিরাপদ স্থান হিসেবে বিবেচনা করবেন। দস্যুতা বন্ধ হওয়ায় বন্দরপথে চলাচলরত জাহাজের ইনস্যুরেন্সের প্রিমিয়াম ও পরিবহন ব্যয় দুটোই কমবে।
চট্টগ্রাম বন্দরের জলসীমা দস্যুতামুক্ত হয়েছে, এটি নিশ্চয়ই আনন্দের কথা। এই ধারা অব্যাহত রাখতে সংশ্লিষ্টরা তদারকি আরও জোরদার করবে আশা করি। তবে বন্দরকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে সক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে। ব্যবসায়ীরা দেখতে চাইবেন জাহাজ নোঙর করার পর কত কম সময়ে বন্দর থেকে পণ্যটি খালাস হয়। দেশের যে বন্দর দিয়ে সমুদ্রপথের ৯৩ শতাংশ পণ্য আমদানি-রপ্তানি হয়, সেই বন্দরকে সব দিক থেকে সক্ষম ও নিরাপদ করে তোলার বিকল্প নেই।