মা-ছেলেকে আটকে হেনস্তা

পুলিশের ক্ষমা চাওয়া উচিত

পুলিশ ন্যায় করুক, অন্যায় করুক, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের কোনো কথা বলার অধিকার কারও নেই—পুলিশ বিভাগের কর্মকর্তারা মুখ ফুটে এখন পর্যন্ত এমন কথা না বললেও সাম্প্রতিক ঘটনাপরম্পরা দেখে মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে, তাঁদের মনের কথাটি এই রূপই। বিশেষ করে রাজধানীর কলাবাগানে সাধারণের ব্যবহার্য মাঠে থানা ভবন নির্মাণের বিরুদ্ধে মুখ খোলায় একজন মা ও তাঁর নাবালক পুত্রকে বিনা কৈফিয়তে টানা ১৩ ঘণ্টা আটকে রাখা; অতঃপর ‘মাঠ রক্ষার আন্দোলনে আর শামিল হব না’ মর্মে অঙ্গীকারযুক্ত মুচলেকায় সই করিয়ে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনা পুলিশের স্বেচ্ছাচারী মনোভঙ্গিকেই প্রকাশ করে দিয়েছে।

ঘটনার প্রথম থেকে সর্বশেষ অবস্থা বিশ্লেষণ করলে পুলিশের প্রতিটি পদক্ষেপকে নিয়ম ও আইনবহির্ভূত বলে প্রতীয়মান হবে।

প্রায় ৫০ বছর ধরে খালি পড়ে থাকা তেঁতুলতলা মাঠ হিসেবে পরিচিত এই খোলা জায়গাটিতে শিশু-কিশোরেরা খেলা করত। পাশাপাশি সেখানে ঈদের নামাজ, জানাজাসহ বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান হয়। কিন্তু পুলিশ বলছে, ঢাকা জেলা প্রশাসন জায়গাটিকে কলাবাগান থানার ভবন নির্মাণের জন্য বরাদ্দ দিয়েছে। এরপর থেকেই মাঠটি বাঁচাতে ‘কলাবাগান এলাকাবাসী’র ব্যানারে বেশ কয়েকবার আন্দোলন হয়েছিল। তাঁদের অন্যতম ছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা সৈয়দা রত্না। রোববার মাঠটিতে পুলিশ নির্মাণকাজ শুরু করলে সৈয়দা রত্না তা ফেসবুকে লাইভ সম্প্রচার করছিলেন। এ কারণে তাঁকে ও তাঁর নাবালক পুত্রকে সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে থানায় আটকে রাখা হয়।

প্রথমত, এটিকে ‘সরকারি কাজে বাধা’ হিসেবে দাবি করা কতখানি আইনসম্মত, তা নিশ্চিতভাবেই তর্কসাপেক্ষ। দ্বিতীয় কথা হলো, অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরটিকে এভাবে ধরে এনে থানাহাজতে আটকে রাখা যে বেআইনি, তা বুঝতে আইন পড়ার আবশ্যকতা নেই। ছেলেটি সরকারি কাজে বাধা দিয়েছে—এটা যদি ধরেও নেওয়া হয়, তারপরও তাকে শুরুতেই ভর্ৎসনা করে ছেড়ে দেওয়া যেত। অথচ পুলিশ তাকে ও তার মাকে যেভাবে দিনভর আটকে রেখেছে, তা নিষ্ঠুর ও অমানবিক। আর থানায় আটকে রেখে মাঠ রক্ষার আন্দোলনে আর শামিল না হওয়া মুচলেকা আদায় নিশ্চিতভাবেই একটি জবরদস্তিমূলক ও বেআইনি কাজ।

মা-ছেলেকে আটকের পর দুপুর থেকে থানায় কাউকে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছিল না। পুলিশ সৈয়দা রত্নার বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ায় দণ্ডবিধি অনুযায়ী দুটি মামলা দেওয়ার উদ্যোগ নিলেও জনগণের আন্দোলনের মুখে তাঁকে ছেড়ে দেয়। তবে এখন পর্যন্ত পুলিশ বিভাগের পক্ষ থেকে ওই নারীর প্রতি দুঃখ প্রকাশ করা হয়নি।

খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, উদ্যান এবং প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, এ ধরনের মাঠ বা জায়গার শ্রেণি পরিবর্তন করা যাবে না; অন্য কোনোভাবে ব্যবহার করা যাবে না বা কাউকে ইজারা দেওয়া যাবে না। সরকার একদিকে অপরাধমুক্ত সমাজ বিনির্মাণে শিশু-কিশোরদের সুস্থ বিকাশের কথা বলবে, অন্যদিকে সেই শিশুদের খেলার মাঠকে হাজতখানা বানাবে, সেটি কাম্য হতে পারে না।

আশার কথা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, তেঁতুলতলা মাঠ খেলার মাঠ হিসেবেই থাকবে, না সেখানে থানার জন্য ভবন করা হবে, সে বিষয়ে ‘আলোচনা করে’ সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আর উদ্বেগের কথা হলো, বিকল্প জায়গা না পেলে ওই মাঠে ভবন তোলা হয়তো এড়ানো যাবে না—এমন ইঙ্গিতও তিনি দিয়েছেন। তার চেয়ে বড় শঙ্কার কথা, গতকালও অনেক সংখ্যক পুলিশ প্রহরায় সেখানে কাজ চলছিল।

এ কারণে পুলিশের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করা এবং মাঠটি আগের মতোই থাকবে—মর্মে তাদের তরফ থেকে একটি ‘মুচলেকা’ দেওয়াটা সবচেয়ে জরুরি।