ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশে নতুন সরকার এলেও পশুর হাটের ইজারা ও নিয়ন্ত্রণকে ঘিরে সেই পুরোনো ‘দখলদারি’ ও ‘দলীয়করণের’ সংস্কৃতিই আমরা দেখতে পাচ্ছি। রাজধানীর ২১টি অস্থায়ী পশুর হাটের ইজারা তালিকার দিকে তাকালে দেখা যায়, দুটি ছাড়া সব হাট পেয়েছেন সরকারি দল বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা ও তাঁদের ঘনিষ্ঠজনেরা। এর মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতাচর্চা ও আধিপত্য বিস্তারের বিষয়টিই স্পষ্ট হয়।
প্রথম আলোর প্রতিবেদন জানাচ্ছে, ঢাকা উত্তরের ১১টি হাটের সব কটি এবং দক্ষিণের ১০টির মধ্যে ৮টিই পেয়েছেন বিএনপির নেতা ও তাঁদের ঘনিষ্ঠজনেরা। বাকি দুটির একটি জামায়াত এবং অন্যটি এনসিপি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির হাতে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যেভাবে দলীয় পরিচয় ইজারা পাওয়ার প্রধান মাপকাঠি ছিল, এবারও প্রায় সব হাট ঘুরেফিরে রাজনৈতিক পরিচয়েই বণ্টিত হয়েছে। যখন যে দল ক্ষমতার ছায়ার কাছাকাছি থাকে, পশুর হাটের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে চলে যাওয়া—এই নিয়ন্ত্রণমূলক চর্চার কি অবসান হবে না?
যদিও সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ইজারা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, অনেক ক্ষেত্রে সমঝোতার মাধ্যমে দর ঠিক করা হয়েছে, যাতে নির্দিষ্ট ব্যক্তির বাইরে অন্য কেউ প্রতিযোগিতায় না আসতে পারে। কোথাও সরকারি দরের চেয়ে মাত্র ১০ হাজার টাকা বেশি মূল্যে ইজারা দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে, যা প্রতিযোগিতামূলক বাজারের ধারণাকে উপহাস করার শামিল। ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর যদি কেবল ‘ব্যক্তির’ পরিবর্তন হয়, কিন্তু ‘প্রক্রিয়ার’ আমূল সংস্কার না ঘটে, তবে তাকে প্রকৃত পরিবর্তন বলা যায় না।
নগর-পরিকল্পনাবিদদের মতে, প্রায় সব হাট রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় থাকা ব্যক্তিদের দখলে যাওয়া ভালো ইঙ্গিত দেয় না। পশুর হাট কেবল একটি মৌসুমি ব্যবসা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জনভোগান্তি ও নগর-ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন। প্রতিবছরই ইজারাদারেরা নির্ধারিত সীমানা ছাড়িয়ে মূল সড়ক ও আবাসিক এলাকায় পশুর হাট বসান, যা তীব্র যানজট ও পশুর বর্জ্য ছড়ানোর অন্যতম কারণ। ইজারাদার যখন রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাধর হন, তখন সিটি করপোরেশন বা পুলিশের পক্ষে তাঁদের শর্ত মানতে বাধ্য করা কঠিন হয়ে পড়ে।
আমরা মনে করি, পশুর হাটের এই রাজনৈতিক সিন্ডিকেট ভাঙা জরুরি। ইজারাপ্রক্রিয়াকে প্রকৃত অর্থেই দলমত-নির্বিশেষে সব পেশাদার ব্যবসায়ীর জন্য উন্মুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে আবাসিক এলাকা ও মূল সড়কে হাট বসানোর যে প্রবণতা, তা কঠোরভাবে দমন করতে হবে। আমরা আশা করি, সিটি করপোরেশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের তোয়াক্কা না করে জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবে এবং শর্ত ভঙ্গকারী ইজারাদারদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেবে।