সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

পল্লবীতে শিশু ধর্ষণ ও হত্যা

ন্যায়বিচারের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে

রাজধানীর পল্লবীতে সাত বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা আরও একবার প্রমাণ করল আমাদের সমাজে কন্যাশিশুরা কতটা অনিরাপদ ও অরক্ষিত। শিশুটির ওপর ঘটে যাওয়া নৃশংসতা আমাদের বাক্‌রুদ্ধ করে। আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার অবনতি আর বিচারহীনতার দীর্ঘ সংস্কৃতি—সার্বিক পরিস্থিতিকে এতটাই ভয়াবহ পর্যায়ে নিয়ে গেছে যে ঘরে–বাইরে নারী ও শিশুরা কোথায় নিরাপদ, সেটাই এখন নাগরিকদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।

সদ্য সন্তান হারানো শোকার্ত বাবা গণমাধ্যমে, ‘আমি বিচার চাই না, কারণ আপনারা বিচার করতে পারবেন না’ বলে যে মন্তব্য করেছেন, খুব স্বাভাবিকভাবেই সেটি বৃহত্তর অর্থে নাগরিক ক্ষোভের প্রতিধ্বনি হয়ে উঠেছে। ফলে শুধু দৃষ্টান্তমূলক বিচারই নয়, সরকার ও রাষ্ট্রের গুরুদায়িত্ব হচ্ছে বিচারহীনতা নিয়ে নাগরিকদের মনে যে গুরুতর আস্থাহীনতা জন্ম হয়েছে, তা নিরসন করা।

পুলিশের বরাতে প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, মঙ্গলবার সকালে পাশের ফ্ল্যাটের ভাড়াটের হাতে খুনের শিকার হয় দ্বিতীয় শ্রেণিপড়ুয়া শিশুটি। ধর্ষণ ও হত্যার অপরাধ গোপন ও লাশ সরিয়ে ফেলার উদ্দেশ্যে মূল অভিযুক্ত শিশুটির মরদেহ খণ্ডবিখণ্ড করার চেষ্টা করেছিল। এ ঘটনায় মূল আসামি সোহেল রানা (৩৪) আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। অভিযুক্ত ব্যক্তির স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনারকে এক সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছেন। আমরা আশা করি, অভিযোগপত্র গঠনের মধ্য দিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হবে। যৌক্তিক সময়ের মধ্যে যথাযথ ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করাটাই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একমাত্র পথ।

পল্লবীতে ধর্ষণের পর শিশুহত্যাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। প্রায় প্রতিদিনই শিশুদের ওপর এমন নৃশংসতার চিত্র গণমাধ্যমের শিরোনাম হচ্ছে। ধর্ষণ, যৌন সহিংসতার মতো নৃশংস অপরাধের ক্ষেত্রে ছেলেশিশুরাও নিরাপদ নয়। দুঃখজনক হলেও সত্যি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে যেসব ঘটনা ভাইরাল হয় ও জনসমাজে আলোড়ন তোলে—এমন মামলার ক্ষেত্রেই সরকার সাড়া দেয় এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিতের প্রতিশ্রুতি দেয়। এর একটি উদাহরণ হলো ২০২৫ সালের মার্চ মাসে বোনের শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে গিয়ে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার মাগুরার আট বছরের শিশুটি। আলোচিত সেই ঘটনার ক্ষেত্রে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার দ্রুত বিচারের অঙ্গীকার করেছিল এবং নিম্ন আদালতে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে মামলাটি নিষ্পত্তিও হয়েছে। তবে বেছে বেছে আলোচিত মামলার বিচার অনেক ক্ষেত্রেই সামষ্টিক বিচারহীনতাকে আড়াল করার প্রবণতাও তৈরি করে।

চলতি মে মাসেই সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাকের যৌথ গবেষণার ফল আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার ক্ষেত্রে বিচারহীনতার শিকড় কতটা গভীর ও প্রাতিষ্ঠানিক। নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় সাজার হার মাত্র ৩ শতাংশ। এর বিপরীতে প্রায় ৭০ শতাংশ মামলায় খালাস পাচ্ছেন আসামিরা। ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বিধান থাকলেও বাস্তবে একটি মামলা শেষ হতে গড়ে তিন বছর সাত মাস সময় লাগছে। বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, দুর্বল প্রমাণ, সাক্ষীর অনুপস্থিতি ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, যদি অপরাধীরা জেনেই থাকে নারী ও শিশু নির্যাতনের অপরাধে তাদের শাস্তি পেতে হবে না, তাহলে পল্লবী, মাগুরা কিংবা দেশের অন্যত্র শিশুদের প্রতি যে নৃশংস অপরাধ ঘটে চলেছে, তা বন্ধের পথ কি আছে? শুধু আলোচিত ও বাছাই মামলা নয়, নারী ও শিশু নির্যাতনের প্রতিটি অপরাধের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা জরুরি।

নারী ও শিশু নির্যাতন মানেই বিচারহীনতা—এই দুষ্টচক্র থেকে সরকারকে বেরিয়ে আসতে হবে।