সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

নাম পরিবর্তন সমাধান নয়

র‍্যাব বিলুপ্তি প্রশ্নে দ্বিধা থাকতে পারে না

র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব) সঙ্গে পদ্ধতিগত ও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি যেভাবে যুক্ত হয়ে পড়েছে, তাতে করে নাম ও পোশাক পাল্টিয়ে বাহিনীটির অতীত কলঙ্ক মুছে ফেলা সম্ভব নয়। গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, ভিন্নমত দমনসহ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে যখন জাতিসংঘসহ মানবাধিকার সংস্থা, বিভিন্ন দল ও সংগঠনের দিক থেকে র‍্যাব বিলুপ্তির দাবি জোরালোভাবে এসেছে, সে সময়ে বাহিনীটির কিছু পোশাকি পরিবর্তনের কথা ভাবা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আমরা মনে করি, এটা বিএনপি সরকারের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

গত সোমবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ র‍্যাবের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে মতবিনিময় সভায় নতুন আইনের অধীন একটি এলিট ফোর্স হিসেবে এটি (র‍্যাব) থাকবে বলে ঘোষণা দেন, তা একই সঙ্গে বিস্ময়কর ও উদ্বেগজনক। এর এক দিন পর প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানও বলেছেন, র‍্যাব সেভাবে থাকছে না, বাহিনীটির নামও সম্ভবত পাল্টে যাচ্ছে।

২০০৪ সালে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরুর পর থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন পর্যন্ত বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে বৈশ্বিক পরিসরে যে উদ্বেগ, তার বড় অংশ ছিল র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র‍্যাবকে ঘিরে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০২১ সালে র‍্যাবের সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। আইনিভাবে দায়মুক্তি ভোগ করা এই বাহিনী জঙ্গিবাদ, মাদক, সন্ত্রাসসহ নানা অপরাধ নিয়ন্ত্রণে দক্ষতার পরিচয় দিলেও শুরু থেকেই বিচারবহির্ভূত হত্যাসহ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল।

আওয়ামী লীগ (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) আমলে র‍্যাবকে আরও প্রকটভাবে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল। গুমসহ রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বী দমনের কাজে বাহিনীর সদস্যরা জড়িয়ে পড়েছিলেন। গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন থেকে দেখা যাচ্ছে, আওয়ামী লীগ আমলে মোট গুমের ঘটনার ২৪ শতাংশের সঙ্গে র‍্যাব জড়িত ছিল। সারা দেশে আয়নাঘর নামে পরিচিত যে ৪০টি গোপন বন্দিশালার সন্ধান পাওয়া যায়, তার ২২-২৩টি ছিল র‍্যাবের। এ ছাড়া পুলিশের বিশেষ শাখার নথি থেকে দেখা যাচ্ছে, ২০১৫ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত এই সাত বছরে দেশে যে ১ হাজার ২৯৩টি ক্রসফায়ারের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, তার ২৯৩টির সঙ্গে যুক্ত ছিল র‍্যাব। এ ছাড়া বাহিনীটির সদস্যরা নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থে নাগরিক হত্যাসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়েছিলেন, এর বড় দৃষ্টান্ত নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনা।

২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘ মানবাধিকার–বিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের তথ্যানুসন্ধান দল যে প্রতিবেদন দেয়, সেখানে র‍্যাবের বলপ্রয়োগ ও গ্রেপ্তারের প্রসঙ্গ উঠে আসে। তারা সুস্পষ্টভাবে র‍্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করেছিল এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সশস্ত্র বাহিনীর ব্যবহার সীমিত করার পরামর্শ দিয়েছিল। এ বছরের শুরুতে হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনও র‍্যাব বিলুপ্তির দাবি জানায়। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত গুম কমিশন র‍্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করেছে। সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের বাদ দিয়ে কেবল পুলিশ সদস্যদের নিয়ে একটি নতুন এলিট বাহিনী গঠন করে র‍্যাব প্রতিস্থাপনের কথা বলেছিল। এ ছাড়া ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর বিএনপি সংবাদ সম্মেলন করে র‍্যাব বিলুপ্তির দাবি জানিয়েছিল।

এরপরও র‍্যাব বিলুপ্তি কিংবা কমপক্ষে বাহিনীটির বর্তমান কাঠামো পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সরকারের দ্বিধার কোনো কারণ থাকতে পারে বলে আমরা মনে করি না। কেননা, বাহিনীটির সঙ্গে মানবাধিকার লঙ্ঘনের যে গুরুতর অভিযোগ, তার জন্য বৈশ্বিক পরিসরে ও নাগরিকদের কাছে সরকারকে বড় প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে। র‍্যাব প্রশ্নে গুমসংক্রান্ত কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে সরকারকে অবশ্যই সাহসী হতে হবে।