প্রতিক্রিয়া

আমাদের নিয়োগপ্রক্রিয়াগুলো কি যথেষ্ট প্রার্থীবান্ধব

আমাদের চাকরিতে নিয়োগপ্রক্রিয়াগুলো আরও প্রার্থীবান্ধব হওয়া দরকার। কারণ, একটি চাকরির আবেদন শুধু একটি ফরম পূরণ করা নয়; একজন প্রার্থী এর জন্য সময় দেন, মানসিক চাপ নেন, ভবিষ্যৎ নিয়ে আশা করেন, অফিস থেকে ছুটি নেন, দূরদূরান্ত থেকে যাতায়াত করেন। অথচ পুরো নিয়োগপ্রক্রিয়ায় প্রার্থীর দিকটা খুব কমই ভাবা হয়।

নিয়োগপ্রক্রিয়ায় একই তথ্য বারবার চাওয়ার বিষয়টি খুব সাধারণ। আবেদন করার সময় দেওয়া তথ্য আবার লিখিত পরীক্ষা বা ইন্টারভিউয়ের আগে চাওয়া হয়। কোথাও দীর্ঘ অনলাইন ফরম পূরণ করার পর আবার সিভি আপলোড করতে বলা হয়। চাকরি নিশ্চিত হওয়ার আগে একজন প্রার্থীর পরিশ্রম যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা উচিত।

দীর্ঘ নিয়োগপ্রক্রিয়াও বড় একটি সমস্যা। অনেক সংস্থা আলাদা সময়ে লিখিত পরীক্ষা ও কয়েক ধাপের ইন্টারভিউ নেয়। ঢাকার বাইরে থাকা বা অন্য কোথাও চাকরি করা মানুষের জন্য এটি খুব কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। বারবার ছুটি নেওয়া, যাতায়াত খরচ, যানজট, থাকা-খাওয়ার খরচ এবং মানসিক চাপ মিলিয়ে পুরো প্রক্রিয়া ক্লান্তিকর হয়ে ওঠে। নারীদের জন্য এই চ্যালেঞ্জ আরও বেশি হতে পারে। অনেক নারী সন্তানদের বাসায় রেখে পরীক্ষায় অংশ নেন।

ইন্টারভিউ বোর্ডের আচরণ নিয়েও অনেকের খারাপ অভিজ্ঞতা আছে। কোনো প্রশ্নের উত্তর জানা না থাকলে প্রার্থীকে ছোট করা, ব্যঙ্গ করা বা অস্বস্তিতে ফেলার ঘটনাও ঘটে। কখনো কখনো পুরো ইন্টারভিউ আলাপের বদলে জেরার মতো মনে হয়। অথচ একজন মানুষ সব প্রশ্নের উত্তর জানবেন না, সেটাই স্বাভাবিক। গুরুত্বপূর্ণ হলো শেখার আগ্রহ ও কাজ করার সক্ষমতা।

আরেকটি সাধারণ অভিজ্ঞতা হলো ফলাফলের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা। ইন্টারভিউ শেষে প্রায়ই বলা হয়, উই উইল লেট ইউ নো সুন। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরে আর কোনো খবরই দেওয়া হয় না। এমনকি প্রার্থীরা ই–মেইল করলেও অনেক সময় উত্তর পান না। অথচ নির্বাচিত না হওয়ার তথ্য জানাতে একটি ছোট ই–মেইলই যথেষ্ট।

অভ্যন্তরীণ নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন আছে। প্রতিষ্ঠানের ভেতরের কাউকে প্রোমোট করা বা নিয়োগ দেওয়া স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু বাইরে বিজ্ঞাপন দিয়ে শেষে আগে থেকেই নির্ধারিত কাউকে নিয়োগ দিলে সেটি অন্য প্রার্থীদের সময় ও আশার প্রতি অবিচার হয়ে দাঁড়ায়।

বেতন নিয়েও অনেক চাকরিপ্রার্থী খোলামেলা কথা বলতে সংকোচ বোধ করেন। অনেক সংস্থা এখনো আগের বেতনের ভিত্তিতে নতুন বেতন নির্ধারণ করে। অথচ একজন মানুষকে মূল্যায়ন করা উচিত তাঁর দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও দায়িত্বের ভিত্তিতে।

আবার অনেকেই গ্রস স্যালারি, নেট স্যালারি বা বেসিক স্যালারির পার্থক্য না বুঝেই অফার লেটারে স্বাক্ষর করেন। পরে দেখা যায়, হাতে পাওয়া বেতন প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম। এসব বিষয় শুরুতেই পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব।

রেফারেন্স চেকও অনেক সময় অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করে। কিছু সংস্থা ইন্টারভিউ পর্যায়েই বর্তমান অফিসে যোগাযোগ করে, অথচ পরে চাকরিটিই আর হয় না। এতে কর্মক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় অস্বস্তি তৈরি হতে পারে।

আরেকটি হতাশাজনক বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে, দীর্ঘ নিয়োগপ্রক্রিয়ার শেষে হঠাৎ পুরো নিয়োগ বাতিল করে দেওয়া হয়। অথচ প্রার্থীরা এর জন্য সময়, শ্রম ও অর্থ ব্যয় করেন। অবশ্যই যেকোনো প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের অধিকার আছে। তবে নিয়োগ শুরু করার আগে পরিকল্পনা ও প্রয়োজন নিয়ে আরও নিশ্চিত হওয়া উচিত।

সমাধান অবশ্যই সম্ভব। সংস্থা চাইলেই একই দিনে লিখিত ও ইন্টারভিউ শেষ করা যায়। তা ছাড়া অনলাইন ইন্টারভিউ, অনলাইন পরীক্ষা বা ভার্চ্যুয়াল অ্যাসেসমেন্টের ব্যবহার বাড়ানো যায়। এতে সময়, খরচ ও ভোগান্তি কমবে। বিশেষ করে ঢাকার বাইরে থাকা প্রার্থী ও নারীদের জন্য এটি অনেক সহায়ক হতে পারে।

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতেই পুরো প্রক্রিয়ার টাইমলাইন জানিয়ে দেওয়া যেতে পারে। কত ধাপের ইন্টারভিউ হবে, ফলাফল কবে জানানো হবে, অনলাইন নাকি সরাসরি—এসব তথ্য আগেই পরিষ্কার থাকলে প্রার্থীদের অনিশ্চয়তা কমে।

ভালো উদাহরণও আছে। কিছু প্রতিষ্ঠান নির্বাচিত না হলেও প্রার্থীকে গঠনমূলক মতামত দেয়। কোথায় উন্নতি দরকার, সেটি জানায়। আবার কেউ কেউ চাকরির অফার দেওয়ার আগেই বেতন, সুবিধা ও চুক্তির বিষয়গুলো পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করে।

চাকরি না হলেও এসব ছোট বিষয় একজন প্রার্থীর কাছে অনেক বড় বিষয় হয়ে থাকে।

একটি ভালো নিয়োগপ্রক্রিয়া শুধু দক্ষ কর্মী খুঁজে বের করে না, মানুষের প্রতিও সম্মান দেখায়। কারণ, চাকরি শুধু সংস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, এটি একজন মানুষের জীবন, পরিবার, আত্মবিশ্বাস এবং ভবিষ্যতের সঙ্গেও জড়িয়ে থাকে।

  • মাসুদ রানা যোগাযোগ পেশাজীবী। আফগানিস্তানের কাবুলে কর্মরত