পরীক্ষার ফলাফল বের হলো। রোল নম্বরটা খুঁজছেন—নেই। অথবা ইন্টারভিউ দিয়ে বাসায় ফিরলেন। ফোন এল, ‘আপনাকে সিলেক্ট করা হয়নি।’ অথবা মাসের পর মাস খেটে গড়া ব্যবসাটা ডুবে গেল। যে মানুষটাকে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করেছিলেন, সে চলে গেল। সেই মুহূর্তে ভেতরে একটাই কথা বাজে, ‘সব শেষ।’
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী ক্যারল ডোয়েক দীর্ঘ গবেষণায় দেখিয়েছেন, ব্যর্থতার মুখে মানুষ দুইভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়। একদল ভাবেন, ‘এই ব্যর্থতাই প্রমাণ করে দিল, আমাকে দিয়ে হবে না।’ তাঁরা থেমে যান। আরেকদল ভাবেন, ‘এই ব্যর্থতা আমাকে কিছু শেখাচ্ছে।’ তাঁরা এগিয়ে যান।
ডোয়েক এই দ্বিতীয় মানসিকতাকে বলেছেন ‘গ্রোথ মাইন্ডসেট’। তাঁরা ব্যর্থতাকে পরিচয় হিসেবে নেন না, অভিজ্ঞতা হিসেবে নেন। তাই পার্থক্যটা মেধায় নয়, দৃষ্টিভঙ্গিতে। (ডোয়েক, সি. এস., ২০০৬, মাইন্ডসেট: দ্য নিউ সাইকোলজি অব সাকসেস, র্যান্ডম হাউস, নিউইয়র্ক)
চৌদ্দ শ বছর আগে কোরআন দৃষ্টিভঙ্গির এই ‘গ্রোথ মাইন্ডসেট’–এর কথাই বলেছে, তবে আরও গভীরভাবে।
যত বেশি ‘যদি করতাম, যদি যেতাম, যদি বলতাম’ বলবেন, তত বেশি শক্তি খরচ হবে এমন এক জায়গায়, যেখান থেকে কিছুই ফেরত আসার নেই। ‘যদি’ বলা মানে শয়তানকে একটা দরজা খুলে দেওয়া।
আল্লাহ–তাআলা সুরা ইউসুফে বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর রহমত থেকে কাফের সম্প্রদায় ছাড়া কেউ নিরাশ হয় না।’ (আয়াত: ৮৭)
এই আয়াতে তিনটি শব্দ আছে, একসঙ্গে পড়লে পুরো দর্শনটা স্পষ্ট হয়।
নিরাশ হওয়া: আরবিতে এসেছে ‘ইয়াইআসু’ এই শব্দটা শুধু হতাশার কথা বলে না, বলে সম্পূর্ণ সম্ভাবনা ছেড়ে দেওয়ার কথা। যেন দরজাটা নিজেই বন্ধ করে দেওয়া।
রহমত: মূল শব্দের অর্থ আরও সুন্দর—‘রাওহ’ মানে বাতাস, প্রশান্তি, শ্বাস নেওয়ার জায়গা। অর্থাৎ আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া মানে নিজের শ্বাস নেওয়ার জায়গাটাই বন্ধ করে দেওয়া।
‘কাফিরুন’: মানে যারা আবৃত করে রাখে। আল্লাহ বলছেন, শুধু তারাই নিরাশ হয় যারা সত্যকে ঢেকে রাখে। মুমিনের পরিচয়ই হলো, সে জানে, এই অন্ধকার চিরন্তন নয়।
এই কথাটা কে বলেছিলেন? ইয়াকুব (আ.)। যিনি প্রিয় ছেলেকে হারিয়েছিলেন। বছরের পর বছর কেঁদে তাঁর দুই চোখের দৃষ্টি হারিয়েছিলেন, কিন্তু আশা হারাননি। আর মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যদি তোমার কোনো বিপদ আসে, তখন বোলো না, যদি আমি এটা করতাম তাহলে এমন হতো। বরং বলো, আল্লাহ কর্তৃক আমার তাকদিরে যা লেখা ছিল, তা-ই হয়েছে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৬৪)
আপনি যত বেশি ‘যদি করতাম, যদি যেতাম, যদি বলতাম’ বলবেন, তত বেশি শক্তি খরচ হবে এমন এক জায়গায়, যেখান থেকে কিছুই ফেরত আসার নেই। ‘যদি’ বলা মানে শয়তানকে একটা দরজা খুলে দেওয়া—সে সেই দরজা দিয়ে ঢুকে আপনাকে হতাশায় ডুবিয়ে রাখে।
১. ব্যর্থতা শেষ নয়, সিঁড়ি
ইউসুফ (আ.)–এর জীবনের দিকে তাকান। ভাইয়েরা কূপে ফেলে দিল। কাফেলা তুলে নিয়ে গিয়ে দাস হিসেবে বিক্রি করল। মিথ্যা অভিযোগে জেলে গেলেন। তারপর? মিসরের মন্ত্রী হলেন। আল্লাহ পুরো গল্পটা কোরআনে রেখে দিয়েছেন শুধু এই একটা কারণে, যেন আপনি আপনার ‘কূপের’ মধ্যে বসেও জানতে পারেন, এটা শেষ নয়।
২. কষ্টের সঙ্গেই আছে সুখ
আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে সহজতা রয়েছে।’ (সুরা শারহ, আয়াত: ৫-৬)
লক্ষ করুন, আল্লাহ ‘সঙ্গে’ বলেছেন, ‘পরে’ নয়। তিনি বলেন নি, কষ্ট শেষ হলে স্বস্তি আসবে; বলছেন, কষ্টের সঙ্গেই সহজতা আছে। অর্থাৎ অন্ধকারের ভেতরেই আলোর ব্যবস্থা আছে। আপনি দেখেন না, কিন্তু আছে।
আবার দেখুন, আল্লাহ এই সহজতার কথাটা পরপর দুইবার বলেছেন, মানে এক কষ্ট, দুই সহজতা। সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেছেন, একটি কষ্ট কখনো দুটো সহজতাকে পরাজিত করতে পারবে না। (তাবারি, জামিউল বায়ান ফি তাফসিরিল কুরআন, ২৪/৫১০, কায়রো: দারুল মাআরিফ)
ছোট ভাইকে নিজেদের হাতে তুলে নিয়ে অন্ধকার কূপে ছুড়ে দেওয়া—এর চেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতা কী হতে পারে? তিনি ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি হয়েছিলেন, জেল খেটেছিলেন।
৩. তওবা মানে রিসেট
আল্লাহ বলেন, ‘বলো, হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর বাড়াবাড়ি করেছ, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।’ (সুরা জুমার, আয়াত: ৫৩)
লক্ষ করুন, তিনি বলছেন, ‘হে আমার বান্দারা।’ যারা পাপ করেছে, ভুল করেছে, নিজেদের ওপর জুলুম করেছে, তাদেরও তিনি ‘আমার বান্দা’ বলে ভালোবেসে ডাকছেন। সম্পর্কটা ছিন্ন হয়নি। তওবা মানে শুধু ক্ষমা চাওয়া নয়, ভালোবেসে তওবা মানে নতুন করে শুরু করার অনুমতি নেওয়া।
৪. ক্ষমা করার শক্তি
নবী ইউসুফের ভাইয়েরা তাঁকে কূপে ফেলেছিল। ছোট ভাইকে নিজেদের হাতে তুলে নিয়ে অন্ধকার কূপে ছুড়ে দেওয়া—এর চেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতা কী হতে পারে? তিনি ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি হয়েছিলেন, জেল খেটেছিলেন। বছরের পর বছর পার হয়ে গেল।
তারপর একদিন সেই ভাইয়েরাই অভুক্ত হয়ে মিসরে এল, তাঁরই দরবারে। ইউসুফ (আ.) তখন বললেন, ‘আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই।’ (সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৯২)
কারণ, তিনি বুঝেছিলেন, পুরোনো কষ্ট বুকে আঁকড়ে রাখা মানে নিজেকেই সেই কূপে আটকে রাখা। যে মানুষ আপনাকে কষ্ট দিয়েছে, সে হয়তো এগিয়ে গেছে। কিন্তু আপনি সেই রাগ আর ক্ষোভ বহন করতে করতে পিছিয়ে পড়ছেন। ক্ষমা করা অন্যের জন্য নয়, এটা নিজেকে মুক্ত করার সিদ্ধান্ত।
৫. ভুল থেকে ফেরা যায়
মুসা (আ.) একটি ভুলের কারণে মিসর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছিলেন। মনে হয়েছিল সব শেষ—রাজপ্রাসাদের আশ্রয় গেছে, দেশ গেছে, ভবিষ্যৎ গেছে। কিন্তু সেই মরুভূমির নির্জনতায়, মাদইয়ানের কূপের পাশে, রাখালের জীবনে তিনি যে প্রস্তুতি পেলেন, সেটাই তাঁকে ফেরাউনের মুখোমুখি দাঁড়ানোর যোগ্য করে তুলল।
আল্লাহ সুরা কাসাসে সেই পুরো যাত্রাটা বর্ণনা করেছেন, ‘তিনি ভয়ে বের হয়ে গেলেন, চারদিকে তাকাতে তাকাতে।’ (সুরা কাসাস, আয়াত: ২১)
আল্লাহ লুকাননি যে মুসা (আ.) ভয় পেয়েছিলেন, বিপর্যস্ত হয়েছিলেন। কারণ, আল্লাহ দেখাতে চান, ভয় পাওয়া, হোঁচট খাওয়া, এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হওয়া—এটা গল্পের শেষ নয়, গল্পের একটা অধ্যায় মাত্র।
রাত তিনটায় যখন মনে হয় সব শেষ, তখন মনে করুন, ইয়াকুব (আ.) দশকের পর দশক অপেক্ষা করেছিলেন। দৃষ্টি হারিয়েছিলেন। তবু বলেছিলেন, ‘আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হোয়ো না।’
উঠে দাঁড়াতে চাইলে এখনো শুরু করার সুযোগ আছে:
অতীত থেকে শিক্ষা নিন, কিন্তু অতীতে বাস করবেন না। ‘যদি করতাম’ বলে সময় নষ্ট না করে ভাবুন, এরপর কী করব।
প্রতিদিন ইস্তিগফার পড়ুন। মহানবী (সা.) বলেছেন, যে বেশি ইস্তিগফার করে আল্লাহ তার সব সংকট থেকে বের হওয়ার পথ করে দেন এবং তার রিজিকে বরকত দেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৫১৮)
ছোট ছোট লক্ষ্য ঠিক করুন। বড় স্বপ্ন ভালো, কিন্তু আজকের একটা ছোট পদক্ষেপই আপনাকে চলমান রাখবে।
দোয়া করুন, হে আল্লাহ, আমার হৃদয়কে উন্মুক্ত করে দাও। (সুরা ত্বহা, আয়াত: ২৫) এই দোয়া মুসা (আ.) করেছিলেন, ঠিক তখন, যখন তাঁর সামনে সবচেয়ে কঠিন দায়িত্ব ছিল।
রাত তিনটায় যখন মনে হয় সব শেষ, তখন মনে করুন, ইয়াকুব (আ.) দশকের পর দশক অপেক্ষা করেছিলেন। দৃষ্টি হারিয়েছিলেন। তবু বলেছিলেন, ‘আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হোয়ো না।’ আপনার গল্পও এখনো শেষ হয়নি। আল্লাহ এখনো লিখছেন।
মুহাম্মাদ মুহসিন মাশকুর: খণ্ডকালীন শিক্ষক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়