
>করোনাভাইরাসের এই কঠিন সময়ে নিজের ৪৭তম জন্মদিনটা আজ পালন করছেন না শচীন টেন্ডুলকার। বরং তাঁর ভাবনার জগত দখল করে রাখল ৪৭ বছরের প্রায় পুরোটা জুড়ে তাঁর ধ্যানজ্ঞান হয়ে থাকা ক্রিকেটই
সেই ১৫ মার্চ থেকে নিজেকে ঘরবন্দী করে রেখেছেন। করোনাভাইরাস থেকে বাঁচতে বাইরের কারও সঙ্গে দেখাই করেননি এ কয়দিনে। করোনার বিরুদ্ধে তহবিলে অনুদান দিয়ে ভারতীয় ব্যাটিং কিংবদন্তি শিরোনামে অবশ্য এসেছেন ঠিকই।
কঠিন এই সময়ে জন্মদিন-টন্মদিনের উৎসবে আর কার-ই বা তেমন মন টানে! টেন্ডুলকারেরও টানেনি। বিশ্বকে মৃত্যুপুরী বানিয়ে রাখা সময়টাতে নিজের ৪৭তম জন্মদিন এবার পালন করবেন না টেন্ডুলকার, তা আগেই জানা গিয়েছিল। আজ তাঁর জন্মদিনে কোনো কেক হয়তো কাটা হবে না, হলেও সেটা শুধু স্ত্রী-সন্তানদের পাশে নিয়ে।
গৃহবন্দী এই জন্মদিনে ক্রিকইনফোর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে টেন্ডুলকারের ভাবনায় বরং চলে এল ৪৭ বছরের এই জীবনের প্রায় পুরোটাজুড়ে তাঁকে স্বস্তি দিয়ে যাওয়া ক্রিকেট। খেলাটার অতীত-বর্তমানে পার্থক্য, করোনার পর খেলাটায় কী বদল আসতে পারে...সেসব। যে আলোচনায় গিয়ে টেন্ডুলকারের মনে হচ্ছে, কোহলি-ডি ভিলিয়ার্সদের এ যুগে, টি-টোয়েন্টির এই দাপটের সময়ে খেললেও তাঁর ব্যাটিংটা থাকত আগের মতোই। দিলস্কুপ, সুইচ হিট খেলা বা ৩৬০ ডিগ্রি ব্যাটসম্যান হতে চাওয়ার চেষ্টা তেমন থাকত না তাঁর।
বাড়ির পাশের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে তাঁর আবেগঘন শেষ বিদায়ের সাত বছর হয়ে গেছে। তা টি-টোয়েন্টি তো টেন্ডুলকার নিজেই খেলে গেছেন, কিন্তু বিশ্বজুড়ে ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগগুলোর আগমণে সংস্করণটার আধিপত্য আরও বেড়েছে। টেস্ট-ওয়ানডেতে সেটির প্রভাব পড়ছে। ব্যাটসম্যানদের ব্যাটিংয়ের ধরণ বদলাচ্ছে, মানিয়ে নিচ্ছেন বোলাররাও। এ যুগে খেললে টেন্ডুলকারের ব্যাটিংয়ে কী বদল আসত? 'আমি যেমন ছিলাম, আজকের ক্রিকেটেও তেমনি থাকতাম। মনে হয় না কিছু বদলাতাম' – ২০১১ বিশ্বকাপজয়ী ভারতীয় কিংবদন্তির নির্বিকার উত্তর।
ক্রিকেট ছাড়ার পর থেকে খেলাটা নিয়ে সারাক্ষণ হয়তো পড়ে থাকেন না টেন্ডুলকার, টিভিতে অত বেশি দেখেনও না বলেই জানালেন। তবে ইউটিউবে নাকি নিজের পুরোনো ভিডিও দেখেন। হয়তো খেলার দিনগুলো মিস করেন বলেই! তা নিজের পুরোনো ভিডিও দেখে এ সময়ের ক্রিকেটে নিজেকে যেভাবে দেখেন টেন্ডুলকার, তা এরকম, 'আমার একেবারে চিরাচরিত ভাবনার বাইরে গিয়ে কিছু করতে হতো বলে মনে হয় না। কারণ, যেভাবে ব্যাটিং করতাম তা-ই যদি করে যেতাম...বাউন্ডারি লাইন তো এখনো ৭০ গজ দূরেই আছে (হাসি)। বাউন্ডারি পার করার ব্যাপারে যদি মনস্থির করেই ফেলি, সে ক্ষেত্রে অন্য কিছুর চেয়ে ধারাবাহিকতা নিয়েই বেশি কাজ করতে হবে। এখানে অবশ্য উইকেটটা (সারফেইস) কেমন সেটাও একটা ব্যাপার। কিছু কিছু উইকেট আপনাকে ভিন্নভাবে খেলতে বাধ্য করবে। নিজের মনে, ভাবনায় এতটুকু নমনীয়তা অবশ্যই থাকত।'
তবে তাঁর মাঠে না থাকার এই সাত বছরে ক্রিকেট অনেক বদলেছে। সামনে আরও বদলাবে। টেন্ডুলকারের নজর তা এড়িয়ে যাওয়ার কোনো কারণ ঘটেনি। ক্রিকেটে দুই দিকে দুই নতুন বল, ফিল্ডিংয়ের নিয়মে বদল নতুন নতুন অনেক উদ্ভাবন নিয়ে আসছে। সাত-দশ বছর পরের ক্রিকেটকে অন্যরকমই দেখেন টেন্ডুলকার, 'বোলাররা এখন স্লোয়ার বল বাউন্সার দিচ্ছে, নাকল বল করছে, ওয়াইড ইয়র্কার করছে...নতুন অনেক কিছুই এনেছে। ব্যাটসম্যানরাও। সামনের দিনে, হয়তো আট-দশ বছর পর আমরা সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরণের ক্রিকেট দেখব।' সেটা কেমন? টেন্ডুলকারের ভাবনা, 'হয়তো ব্যাটের সুইংয়ের ধরন বদলাবে, ব্যাটসম্যানের স্টান্স (দাঁড়ানোর ভঙ্গি) হয়তো অন্যরকম হবে। অনেক কিছুই বদলাবে, যেসব হয়তো আজ আমরা ভাবতে পারছি না, কারণ খেলাটা এখনো সেটা দাবি করেনি।'
অত দূরের বদলে নিকট ভবিষ্যতে চোখ ফিরল আবার। করোনার পরের ক্রিকেট কেমন হতে পারে? আর যা-ই হোক, দর্শকহীন স্টেডিয়ামে ক্রিকেট চান না টেন্ডুলকার, 'খুবই অদ্ভুত হবে সেটা। দর্শকদের কাছ থেকে একটা অন্যরকম শক্তি পাওয়া যায়। যদি ভারত একটা গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ জেতার মতো অবস্থায় থাকে, আপনি অবশ্যই চাইবেন সেটা উদ্যাপন করার জন্য মাঠে দর্শক থাকুক, জয়ের আনন্দটা বাড়িয়ে দিক। কিন্তু স্টেডিয়ামে কেউ না থাকলে? কারও-ই তখন নিজেকে বিশেষ কিছু মনে হবে না। অদ্ভুত একটা অনুভূতি হবে। জানি না খেলোয়াড়দের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে।'
শুধু ক্রিকেট নয়, কোনো খেলাই দর্শকবিহীন দেখতে চান না টেন্ডুলকার, 'ভাবতে পারেন, রজার ফেদেরার আর রাফায়েল নাদাল উইম্বলডনের সেন্টার কোর্টে খেলবে, কিন্তু সেখানে দেখার কেউ নেই? দেখতে কী অদ্ভুতই না লাগবে! শুধু ক্রিকেট নয়, যে কোনো খেলাতেই দর্শকদের এই শক্তিটা দরকার।'
সাক্ষাৎকার গড়ায়, ক্রিকেটে বদল, তাঁর অতীত নিয়ে আলোচনা হয়। যেমন শারজাতে ১৯৯৮ সালে ভারত-অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডকে নিয়ে টুর্নামেন্টের সেমিফাইনাল-ফাইনালে তাঁর টানা দুই সেঞ্চুরি, ১৯৯৯-০০ মৌসুমে ভারত সফরে এসে জিম্বাবুয়ের অ্যান্ডি ফ্লাওয়ারের রিভার্স-সুইপ...স্মৃতির দুয়ার খুলে দিয়েছেন টেন্ডুলকার।
অতীত আর বর্তমানের একটা মিলও খোঁজার প্রসঙ্গ চলে এল তাতে। অতীত, মানে টেন্ডুলকারের ব্যাটিংয়ের ধরণ। বর্তমান, মানে এ দলে কার ব্যাটিং দেখে তাঁর তরুণ টেন্ডুলকারের কথা মনে পড়ে। তাঁর উত্তর, 'উঠতি তারকাদের কথা যখন আসছে, পৃথ্বী (শ), শুভমান (গিল), (সাঞ্জু) স্যাম্পসনের মতো অনেকেই আছে। সবারই ধরন ভিন্ন। আমাদের সময়ে যেমন রাহুল (দ্রাবিড়) আর আমার চেয়ে ভিন্ন ছিল, আমি সৌরভের (গাঙ্গুলী) চেয়ে ভিন্ন ছিলাম, (ভিভিএস) লক্ষণ আমাদের সবার চেয়ে ভিন্ন ছিল। এই ছেলেগুলোও সবাই সবার চেয়ে আলাদা, তবে সবারই উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ সামনে। সবারই নিজ নিজ একটা স্টাইল আছে।'
টেন্ডুলকারসুলভ নির্লিপ্ত উত্তর। ৪৭ বছর ধরেই যা হয়তো তেমন বদলায়নি।