
১৯৩০ সালে মন্টেভিডিওর সেই ধূসর বিকেলে বিশ্বকাপ নামে যে মহাযাত্রার শুরু হয়েছিল, তা আজ শতবর্ষের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। এই যাত্রার কোথাও পেলে-গারিঞ্চার সাম্বার ছন্দ, কোথাও ম্যারাডোনার ঈশ্বরপ্রদত্ত জাদুকরি ছোঁয়া, আবার কোথাও জিনেদিন জিদান কিংবা লিওনেল মেসির অমরত্বের পথে হেঁটে যাওয়া—সব মিলিয়েই তো এই ফুটবল-পুরাণ। ইতিহাসের ধুলো ঝেড়ে বিশ্বকাপের সব রোমাঞ্চকর স্মৃতি ফেরানোর আয়োজন—ফিরে দেখা বিশ্বকাপ।
ফুটবলের জনক নাকি তারা। অথচ বিশ্বমঞ্চে নিজেদের সেরা প্রমাণ করতে ইংল্যান্ডের সময় লেগে গেল দীর্ঘ ৩৬ বছর! ১৯৫০ থেকে ১৯৬২ বিশ্বকাপ পর্যন্ত প্রতিবারই চরম অহংকার নিয়ে এসে খালি হাতে ফিরেছে ইংলিশরা। অবশেষে ১৯৬৬ সালে ফুটবল ঘরে ফিরল। স্যার আলফ রামসের সেই ‘উইংলেস ওয়ান্ডারস’ দলকে নিয়ে উন্মাদনার কমতি ছিল না। কিন্তু ‘ফুটবল জনকদের’ সেই একমাত্র বিশ্বজয় আজও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত অধ্যায় হয়ে আছে।
ফাইনালটা ছিল জার্মানির বিপক্ষে। নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলা ২-২ সমতায় শেষ হওয়ার পর ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। ১০১ মিনিটে ঘটল সেই অবিশ্বাস্য কাণ্ড। ইংলিশ স্ট্রাইকার জিওফ হার্স্টের একটি জোরালো শট জার্মানির ক্রসবারে লেগে গোললাইনের ঠিক ওপরে বা সামান্য সামনে ড্রপ খেয়ে মাঠে ফিরে আসে। জার্মান ডিফেন্ডাররা বল ক্লিয়ার করলেও সুইস রেফারি গটফ্রিড ডিনস্ট লাইন্সম্যানের সঙ্গে পরামর্শ করে এটাকে ‘গোল’ বলে ঘোষণা করেন! জার্মানির তুমুল প্রতিবাদ সত্ত্বেও গোল বহাল থাকে। পরে হার্স্ট আরেকটি গোল করে হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন এবং ইংল্যান্ড ৪-২ ব্যবধানে ম্যাচ জেতে। তবে ওই একটি ‘ভুতুড়ে’ গোল ফুটবল ইতিহাসের চিরন্তন এক বিতর্ক হয়েই থেকে গেছে।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে ইংল্যান্ডই একমাত্র চ্যাম্পিয়ন, যারা তাদের প্রতিটি ম্যাচ খেলেছে একই শহরে এবং একই মাঠে—লন্ডনের বিখ্যাত ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে। ১৯৩০ সালে উরুগুয়েও অবশ্য মন্টেভিডিওর বাইরে যায়নি, কিন্তু সেবার সবার জন্যই নিয়মটা এক ছিল। ১৯৬৬ সালে কিন্তু তা ছিল না। ইংল্যান্ড ও পর্তুগালের মধ্যকার সেমিফাইনালটি প্রথমে লিভারপুলে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে ফিফা সচিব হেলমুট ক্যাসারের প্রচ্ছন্ন ইশারায় ম্যাচটি ওয়েম্বলিতে নিয়ে আসা হয়। যুক্তি দেওয়া হয়েছিল, বেশি দর্শক যাতে খেলা দেখতে পারেন, তাই এই বদল। ঘরের মাঠের এমন সুবিধা আর কোনো দল কখনো পায়নি।
এই বিশ্বকাপে দক্ষিণ আমেরিকান দেশগুলোর ঘোর আপত্তি ছিল ইউরোপীয় রেফারিদের পক্ষপাতিত্ব নিয়ে। ইংল্যান্ড বনাম আর্জেন্টিনা ম্যাচের রেফারি ছিলেন রুডলফ ক্রেইটলেইন (জার্মান), আর জার্মানি বনাম উরুগুয়ে ম্যাচের রেফারি ছিলেন জেমস ফিনি (ইংলিশ)! কাকতালীয় নাকি কোনো নিখুঁত ছক? মাঠের ফল কিন্তু ইউরোপের পক্ষেই গেল। আর্জেন্টাইন অধিনায়ক আন্তোনিও রাত্তিনকে ৩৫ মিনিটেই লাল কার্ড দিয়ে মাঠছাড়া করেন জার্মান রেফারি। রাত্তিনের অপরাধ? রেফারি পরে বলেছিলেন, ‘ওর তাকানোর ভঙ্গিটা আমার ভালো লাগেনি!’ ওদিকে ইংলিশ রেফারি ফিনি উরুগুয়ের দুজনকে লাল কার্ড দেখান। পরদিন জার্মান পত্রিকায় ছবি ছাপা হয়, উরুগুয়ে যখন ১-০ গোলে পিছিয়ে, তখন জার্মান ডিফেন্ডার কার্ল-হাইঞ্জ শ্নেলিঙ্গার গোললাইনে হাত দিয়ে বল আটকেছিলেন, যা রেফারি এড়িয়ে যান। লাতিন সংবাদমাধ্যমগুলো একযোগে লিখেছিল—এটি লাতিন ফুটবলের বিরুদ্ধে ইউরোপীয়দের এক সুগভীর ষড়যন্ত্র!
পেলের কান্নাও দেখেছিল লিভারপুলের গুডিসন পার্ক। পর্তুগালের ডিফেন্ডাররা যখন একের পর এক ফাউল করে পেলের পা ভেঙে দেওয়ার উপক্রম করছিলেন, ইংলিশ রেফারি জর্জ ম্যাককেব তখন পকেটে হাত দেওয়ার প্রয়োজনই মনে করেননি। চোট পেয়ে পেলেকে মাঠ ছাড়তে হয় এবং টানা দুবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয়। আয়োজকদের পথের কাঁটা কি এভাবেই দূর হলো!
পর্তুগিজ দল তো যেন যুদ্ধ জয়ের রসদ নিয়ে এসেছিল! চেশায়ারের উইমসলো হোটেলের বেজমেন্টে তারা মজুত করেছিল নিজস্ব ৬০০ বোতল পর্তুগিজ ওয়াইন, অলিভ অয়েলের ব্যারেল আর বিপুল পরিমাণ মাছ। ওদিকে হাঙ্গেরিয়ানরা তাদের ফুটবলারদের পাতে গরুর মাংস তোলাই নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল। দলের সেক্রেটারি গিওর্গি হন্টির সাফ কথা ছিল, ‘গরুর মাংস হলো দ্বিতীয় শ্রেণির খাবার!’
চিলির ফুটবলাররা নিউক্যাসলে হোটেলে পৌঁছেই থ বনে যান। স্থানীয় প্রতিবেশীদের পক্ষ থেকে স্বাগত উপহার হিসেবে প্রত্যেকের জন্য অপেক্ষা করছিল এক বোতল করে স্কচ হুইস্কি! জার্মানদের জন্য প্রতিদিন সকালে জার্মানি থেকে বিমানে করে আসত তাজা রুটি ও কেজি কেজি বেকন। মেক্সিকান কোচ ইগনাশিও ত্রেলেস আবার ছিলেন কড়া মানুষ। হোটেলের দেওয়া টেকিলার বোতল দেখেই তিনি রেগে আগুন, ‘আমার ছেলেদের জন্য কোনো মদ নয়!’ উপরন্তু মেক্সিকান ফুটবলারদের জন্য পুরো লন্ডন শহর চষে ছাগলের দুধ জোগাড় করতে হয়েছিল বেচারা হোটেলের বাবুর্চিকে।
উরুগুয়ের ফুটবলারদের ভরসা ছিল পালংশাক আর ডিমের কেক। সেই যুগে কার্টুন চরিত্র ‘পপাই’ পালংশাক খেয়ে শক্তি পেত, উরুগুয়ের ফুটবলাররাও তাই সারা দিন ওটাই গিলতেন। ফরাসি বাহিনী আবার সঙ্গে এনেছিল এক হাজার বোতল ওয়াইন। তবে মাঠের পারফরম্যান্স ছিল যাচ্ছেতাই, প্রথম রাউন্ডেই বিদায়। ফরাসির দল শূন্য হাতে দেশে ফিরলেও লন্ডনে রেখে গিয়েছিল সেই এক হাজার খালি বোতল! স্প্যানিশ কোচ হোসে ভিয়ালঙ্গা কড়া নিয়ম করে দিয়েছিলেন, চারজনের টেবিলে মাত্র এক বোতল ওয়াইন ভাগ করে খেতে হবে। আর আর্জেন্টিনার কোচ হুয়ান কার্লোস লরেঞ্জো ছিলেন আরও কঠোর, প্রতি বেলা খাবারে মাত্র এক গ্লাস ওয়াইন বরাদ্দ ছিল। ৯ জুলাই দেশের স্বাধীনতা দিবসেও এই নিয়মের নড়চড় হয়নি। তবে সুইজারল্যান্ডকে হারিয়ে কোয়ার্টারে ওঠার রাতে খুশি হয়ে ছেলেদের দুই গ্লাস রেড ওয়াইন পানের অনুমতি দিয়েছিলেন লরেঞ্জো।
আর ওয়েম্বলিতে প্রথম ম্যাচের দিন গ্যালারিতে কী পরিমাণ খাওয়াদাওয়া হয়েছিল জানেন? ২০ হাজার স্যান্ডউইচ, ৪ হাজার ক্যান বিয়ার, ২০ হাজার কাপ চা আর ৫০০ বোতল হুইস্কি!
১১ জুলাই উরুগুয়ের বিপক্ষে ইংল্যান্ডের উদ্বোধনী ম্যাচটি শুরু হতে বেশ কয়েক মিনিট দেরি হয়েছিল। কারণ? ইংল্যান্ডের সাতজন ফুটবলার হোটেলেই তাঁদের পরিচয়পত্র ফেলে এসেছিলেন! ঘরের মাঠে খেলতে এসে এমন কাণ্ড! শেষে এক পুলিশ অফিসার মোটরসাইকেল নিয়ে সাইরেন বাজিয়ে লন্ডনের জ্যাম ঠেলে হোটেল থেকে সেই আইডি কার্ড উদ্ধার করে আনেন। তবেই মাঠে নামতে পারেন ববি চার্লটনরা। ম্যাচটি অবশ্য গোলশূন্য ড্র হয়েছিল।
ফুটবল মাঠে আজ যে হলুদ ও লাল কার্ডের ব্যবহার আমরা দেখি, তার জন্ম কিন্তু এই ১৯৬৬ বিশ্বকাপের ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা ম্যাচেই। সেই হিংস্র ও মারকুটে ম্যাচে ফাউল আর তর্কের কারণে খেলা বারবার থামছিল। জার্মান রেফারি রুডলফ ক্রেইটলেইন যখন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক আন্তোনিও রাতিনকে বের করে দিলেন, ভাষার দূরত্বের কারণে রাতিন বুঝতেই পারছিলেন না কেন তাঁকে বের করা হলো। মাঠ ছাড়ার সময় ক্ষুব্ধ রাতিন ব্রিটিশ রাজপরিবারের লালগালিচায় বসে পড়েন এবং কর্নারের পতাকায় হাত মোছেন, যা ব্রিটিশ দর্শকদের খেপিয়ে তোলে। ইংল্যান্ড ম্যাচটি ১-০ গোলে জেতে ঠিকই, কিন্তু মাঠের বাইরে রেফারি কেন অ্যাস্টন ভাবলেন—ভাষার এই জটিলতা দূর করতে এমন কিছু দরকার, যা বিশ্বজনীন। বাড়ি ফেরার পথে ট্রাফিক সিগন্যালের লাল ও হলুদ আলো দেখে তাঁর মাথায় আইডিয়া আসে। তিনি ফিফাকে প্রস্তাব দেন এবং ১৯৭০ মেক্সিকো বিশ্বকাপে প্রথম অফিশিয়ালি কার্ডের প্রবর্তন হয়।
বিশ্বকাপ শুরুর আগে ব্রাজিলের সালভাদর দে বাহিয়ার এক তান্ত্রিক বা ভবিষ্যদ্বক্তা বাজি ধরে ঘোষণা করেছিলেন—ব্রাজিল যদি এবার হ্যাটট্রিক বিশ্বকাপ না জেতে, তবে তিনি আত্মহত্যা করবেন! পর্তুগালের কাছে ৩-১ গোলে হেরে ব্রাজিলের বিদায়ঘণ্টা বাজার ঠিক কয়েক মিনিটের মাথায় সেই তান্ত্রিক মহাশয় এলাকা ছেড়ে হাওয়া হয়ে যান। পাছে মানুষ বাজি ধরার টাকা ফেরত চায় কিংবা সত্যি সত্যি আত্মহত্যা করতে বাধ্য করে! ওদিকে ব্রাজিলে এই পরাজয়ের শোকে একজন সত্যি সত্যি আত্মহত্যা করেন এবং এক পর্তুগিজ ব্যবসায়ী আনন্দ উদ্যাপন করার কারণে ক্ষুব্ধ জনতার পিটুনির শিকার হন।