
১৯৩০ সালে মন্টেভিডিওর সেই ধূসর বিকেলে বিশ্বকাপ নামে যে মহাযাত্রার শুরু হয়েছিল, তা আজ শতবর্ষের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। এই যাত্রার কোথাও পেলে-গারিঞ্চার সাম্বার ছন্দ, কোথাও ম্যারাডোনার ঈশ্বরপ্রদত্ত জাদুকরি ছোঁয়া, আবার কোথাও জিনেদিন জিদান কিংবা লিওনেল মেসির অমরত্বের পথে হেঁটে যাওয়া—সব মিলিয়েই তো এই ফুটবল-পুরাণ। ইতিহাসের ধুলো ঝেড়ে সেই সব রোমাঞ্চকর স্মৃতি ফেরানোর আয়োজন—ফিরে দেখা বিশ্বকাপ।
একাদশ বিশ্বকাপের আসর যখন আর্জেন্টিনায় বসল, দেশটির শাসনক্ষমতায় সামরিক জান্তা জেনারেল হোর্হে ভিদেলা। ‘কমিউনিস্ট গেরিলা’ দমনের নামে তখন সেখানে চলছে নির্মম নির্যাতন, হত্যা ও গুম। সবচেয়ে কুখ্যাত টর্চার সেলগুলোর একটি ছিল নেভি মেকানিকস স্কুলে, যা ফাইনালের ভেন্যু রিভার প্লেটের মনুমেন্তাল স্টেডিয়াম থেকে মাত্র কয়েক শ মিটার দূরে! এ রকম একটি দেশে বিশ্বকাপ খেলতে রাজি হয়নি ইউরোপের অনেক দেশ। নেদারল্যান্ডসের লেবার পার্টি তাদের দলকে টুর্নামেন্ট বয়কটের ডাক দিল। যদিও শেষ পর্যন্ত ডাচরা খেলতে গিয়েছিল, কিন্তু তারা পাশে পায়নি তাদের ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড় ইয়োহান ক্রুইফকে।
টুর্নামেন্টের এক মাস আর্জেন্টিনার গেরিলা গোষ্ঠীগুলো একধরনের ‘যুদ্ধবিরতি’ ঘোষণা করে। তবে খেলা সম্প্রচারের সময় মাঝেমধ্যেই রেডিও-টিভির সিগন্যাল হ্যাক করে ইউরোপে লুকিয়ে থাকা গেরিলা নেতা মারিও ফিরমেনিখের ভাষণ প্রচার করা হতো। ফাইনাল শেষে ৩-১ গোলে নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে আর্জেন্টিনা যখন প্রথমবার বিশ্ব জয় করল, পরদিন খুনে একনায়ক হোর্হে ভিদেলা প্রেস সেন্টারে এসে সাংবাদিকদের সামনে এসে বললেন, ‘আমরা বিশ্বকে দেখিয়েছি আর্জেন্টিনা আজ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে।’
ডিয়েগোকে বাদ দেওয়ার সেই নির্ঘুম রাত
‘আমাকে এমন তিনটা নাম বলতে হচ্ছে, যারা আমাদের সঙ্গে বিশ্বকাপে থাকছে না। সারা রাত আমি ঘুমাতে পারিনি…’ সে এক ভারী বিকেল। ১৯৭৮ সালের ১৯ মে আর্জেন্টিনার সালভাতোরি ফাউন্ডেশনের অনুশীলন মাঠে যেন পিনপতন নীরবতা। ২৫ জন তরুণের সামনে দাঁড়িয়ে কোচ সিজার লুইস মেনোত্তির গম্ভীর কণ্ঠস্বর। স্কোয়াডে জায়গা হবে ২২ জনের, বাদ পড়বেন তিনজন। সহকারী কোচ রবের্তো সাপোরিতি মেনোত্তিকে এক কিশোরের নাম কেটে দেওয়ার আগে দ্বিধায় পড়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আজকের প্র্যাকটিসে ও কী করল দেখেছেন? তিনটা গোল দিল!’
মেনোত্তির চুরুটপোড়া গলার জবাব ছিল সংক্ষিপ্ত, ‘আর বিরক্ত কোরো না।’ তারপর একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে উচ্চারণ করলেন সেই তিন অভাগা তরুণের নাম—হুমবার্তো ব্রাভো, ভিক্টর বোত্তানিজ আর...ডিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা!
কান্নায় ভেঙে পড়ে সেদিনই ক্যাম্প ছেড়ে চলে যান ১৭ বছরের কিশোর ম্যারাডোনা। তবে ফাইনালের আগের রাতে ঠিকই মেনোত্তিকে ফোন করে দলের জন্য শুভকামনা জানিয়ে বলেছিলেন, তাঁরও সময় আসবে। মেনোত্তি অবশ্য চার দশক পর স্বীকার করেছিলেন, ‘জীবন তো সিদ্ধান্তের নাম। ’৭৮-এ আমি ডিয়েগোকে বাইরে রেখেছিলাম। আজ যদি কেউ জিজ্ঞেস করে আমি ভুল করেছিলাম কি না, আমি বলব সম্ভবত, খুবই সম্ভবত ভুল ছিল।’
ব্রাজিলের আক্ষেপ
টুর্নামেন্টের ফরম্যাটটা ছিল জার্মানির মতোই জটিল। দ্বিতীয় রাউন্ডে দুই গ্রুপের শীর্ষ দল যাবে ফাইনালে। আর এই নিয়মের খাঁচায় পড়েই ব্রাজিল ফুটবল ইতিহাসের এক অদ্ভুত ট্র্যাজেডির শিকার হলো। তারা পেরু ও পোল্যান্ডকে হারাল, আর্জেন্টিনার সঙ্গে করল ড্র। কিন্তু আর্জেন্টিনা গোল ব্যবধানে এগিয়ে থেকে ফাইনালে চলে যাওয়ায় ব্রাজিলকে সন্তুষ্ট থাকতে হলো ইতালির বিপক্ষে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ খেলে। পুরো টুর্নামেন্টে একটা ম্যাচও না হেরেও ব্রাজিল চ্যাম্পিয়ন হতে পারল না!
কত রকম রেকর্ড
নেদারল্যান্ডসের ডিক নানিঙ্গা গড়লেন বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম ‘বদলি খেলোয়াড়’ হিসেবে লাল কার্ড দেখার অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ড। জার্মানির বিপক্ষে ম্যাচের ৭৯ মিনিটে মাঠে নেমে মাত্র ৯ মিনিটে উরুগুইয়ান রেফারির কাছ থেকে দুটি হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন তিনি। ফ্রান্স গড়ল আরেক রেকর্ড, তাদের স্কোয়াডের ২২ জন খেলোয়াড়কেই মাঠে নামিয়েছিলেন কোচ হিদালগো, যার মধ্যে ছিলেন তিন–তিনজন গোলরক্ষক! আর ১১ জুন স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে গোল করে বিশ্বকাপের ইতিহাসের ১০০০তম গোলের মাইলফলক স্পর্শ করেন ডাচ তারকা রবেন রেনসেনব্রিংক। এই কীর্তির জন্য উপহার হিসেবে তিনি পেয়েছিলেন ঘড়ি, দামি পোশাক, আস্ত হ্যাম আর বুয়েনস এইরেসের এক বিলাসবহুল র্যাঞ্চে সাত দিন থাকার সুযোগ! ওদিকে জার্মান কোচ হেলমুট শোন বিশ্বকাপে ২৫টি ম্যাচে ডাগআউটে দাঁড়ানোর অনন্য রেকর্ড গড়লেন, যা আজও কেউ ভাঙতে পারেনি।
নানিঙ্গার ফুলদোকান
আর্জেন্টিনায় যাওয়ার ঠিক আগে ডাচ সহকারী কোচ ইয়ান জোয়ার্টক্রুইস আমস্টারডামে একটা জরুরি অনুশীলন সেশন ডেকেছিলেন। সবাই এলেও আসেননি উইঙ্গার ডিক নানিঙ্গা। কোচ ফোন করে কারণ জানতে চাইলে নানিঙ্গা খুব বিনীতভাবে বললেন, ‘আমায় ক্ষমা করবেন কোচ, কিন্তু আমি তো আমার দোকানটা ফেলে আসতে পারি না। সামনে মা দিবস, এই সময় মানুষ সবচেয়ে বেশি ফুল কেনে। ব্যবসার এই ভরা মৌসুম হাতছাড়া করা যাবে না। অনুশীলনের সময় পরে পাওয়া যাবে।’ সেই নানিঙ্গা পরে ডাবল শিফটে প্র্যাকটিস করে ঘাটতি পুষিয়ে নিয়েছিলেন এবং ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ডাচদের একমাত্র গোলটি করে খেলা অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। যদিও শেষ রক্ষা হয়নি।
‘সহনীয় সীমা’র ভদকা
পোল্যান্ড দল বুয়েনস এইরেসে যখন পা রাখল, তাদের অতিরিক্ত ব্যাগেজের ওজন দেখে কাস্টমসের চোখ চড়কগাছ। খেলোয়াড়েরা সঙ্গে এনেছিলেন ৩৮০ বোতল ভদকা! কোচ ইয়াচেক গমোচ ছেলেদের ধূমপান আর মদ্যপানের অনুমতি দিয়েছিলেন, তবে শর্ত ছিল—‘সবকিছু থাকবে সহনীয় সীমার মধ্যে।’ এই হিসাবে ৩৫ জনের পোলিশ বহরের প্রত্যেকে ভাগে পেয়েছিলেন ১০ বোতলের কিছু বেশি ভদকা।
আধ ডজন গোল
গ্রুপ পর্বে মেক্সিকোর বিপক্ষে জার্মানি তখন যেন এক ক্ষুধার্ত নেকড়ে। মাত্র ৩৮ মিনিটেই ৩-০ গোলে এগিয়ে গেল তারা। জার্মান ফরোয়ার্ড রুমেনিগের ধাক্কায় মেক্সিকোর গোলরক্ষক পিলার রেয়েস রক্তাক্ত অবস্থায় মাঠ ছাড়লেন, পরে পায়ে ১৬টি সেলাই লেগেছিল তাঁর । মাঠে নামলেন দ্বিতীয় গোলরক্ষক পেদ্রো সোতো। গল্প আছে, সোতো নাকি কোচকে বলেছিলেন বেঞ্চের আরাম ছেড়ে তিনি জার্মানির কামড় খেতে মাঠে নামতে চান না! নামার পাঁচ মিনিটের মাথায় হেইঞ্জ ফ্লোহে এক দূরপাল্লার কামানে সোতোকে স্বাগত জানালেন। ম্যাচ শেষ হলো ৬-০ ব্যবধানে, যা মেক্সিকোর ইতিহাসের অন্যতম বড় পরাজয়। ম্যাচ শেষে সোতো যখন ড্রেসিংরুমে ঢুকলেন, রক্তাক্ত রেয়েস ব্যথার চাদরে শুয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কিরে, ম্যাচ কততে শেষ হলো?’ সোতো নাকি হাসতে হাসতে জবাব দিয়েছিলেন, ‘টাই হয়েছে। তোকেও তিনটা দিয়েছিল, আমাকেও তিনটা!’
রোজারিওর সেই রহস্যময় ৬-০
আর্জেন্টিনা-পেরু ম্যাচের চেয়ে বিতর্কিত ম্যাচ খুব কমই আছে। ফাইনালের টিকিট পেতে আর্জেন্টিনার দরকার ছিল অন্তত ৪ থেকে ৫ গোলের জয়। ব্রাজিল ও পোল্যান্ডের ম্যাচটি আগে হয়ে যাওয়ায় আর্জেন্টিনা জানত, তাদের ঠিক কী করতে হবে। ফিকশ্চারের এই সময়ের কারচুপিই প্রথম সন্দেহের বীজ বুনে দেয়।
এরপর রোজারিওতে যা হলো, তা এক অবিশ্বাস্য নাটক। সন্দেহ করা হয়, পেরু ম্যাচটি ছেড়ে দিয়েছিল ৬-০ গোলে! গুঞ্জন ওঠে, আর্জেন্টিনার সামরিক সরকার পেরুকে করমুক্ত গমবোঝাই দুটি জাহাজ উপহার দিয়েছিল এবং পেরুর আর্জেন্টিনায় জন্ম নেওয়া গোলরক্ষক রামন কিরোগাকে বিপুল অর্থ দেওয়া হয়েছিল। তবে এই তত্ত্বের উল্টো পিঠও আছে। পেরুর অধিনায়ক হেক্টর চুম্পিতাজ ও রডলফো মানজো পরে স্বীকার করেছিলেন, ম্যাচটি যেন তারা বড় ব্যবধানে না হারে, সে জন্য ব্রাজিলের পক্ষ থেকেও প্রত্যেক খেলোয়াড়কে পাঁচ হাজার ডলার এবং বিলাসবহুল দ্বীপে ভ্রমণের টোপ দেওয়া হয়েছিল!
কেম্পেসের ‘ত্রিমুকুট’
সব অন্ধকার ছাপিয়ে মাঠের নায়ক হয়ে উঠলেন মারিও কেম্পেস। আকাশি-সাদা জার্সি গায়ে তিনি যেন একাই টেনে নিলেন পুরো দলকে। চ্যাম্পিয়ন হলেন, টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং জিতলেন সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারও । বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই ‘ত্রিমুকুট’জয়ী প্রথম খেলোয়াড় কেম্পেস।
১২০ মিনিটের সেই স্নায়ুক্ষয়ী লড়াইয়ে ৩-১ গোলে ডাচদের স্বপ্ন ভেঙে আর্জেন্টিনা প্রথমবার বিশ্বজয়ের আনন্দে ভাসল। অফিশিয়াল গালা ডিনার শুরুর কিছুক্ষণ আগে এক হোটেল কর্মচারী এসে জিজ্ঞেস করলেন, ‘চ্যাম্পিয়নরা কী খাবেন?’ মারিও কেম্পেস অর্ডার দিলেন, ‘আমাদের জন্য এক বড় গ্লাস স্কচ নিয়ে এসো, সবাই মিলে ভাগ করে খাব।’ বরফখণ্ডে ভাসতে থাকা সেই গ্লাসটি এক হাত থেকে অন্য হাতে ঘুরতে লাগল। আর সেই এক পাত্র হুইস্কিতেই চুমুক দিয়ে বুয়েনস এইরেসের রাতের স্তব্ধতা ভেঙে টোস্ট করলেন আর্জেন্টিনার প্রথম বিশ্বজয়ের নায়কেরা।
টুর্নামেন্টের ফরম্যাটটা ছিল জার্মানির মতোই জটিল। দ্বিতীয় রাউন্ডে দুই গ্রুপের শীর্ষ দল যাবে ফাইনালে। আর এই নিয়মের খাঁচায় পড়েই ব্রাজিল ফুটবল ইতিহাসের এক অদ্ভুত ট্র্যাজেডির শিকার হলো। তারা পেরু ও পোল্যান্ডকে হারাল, আর্জেন্টিনার সঙ্গে করল ড্র। কিন্তু আর্জেন্টিনা গোল ব্যবধানে এগিয়ে থেকে ফাইনালে চলে যাওয়ায় ব্রাজিলকে সন্তুষ্ট থাকতে হলো ইতালির বিপক্ষে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ খেলে। পুরো টুর্নামেন্টে একটা ম্যাচও না হেরেও ব্রাজিল চ্যাম্পিয়ন হতে পারল না!