
১-৭!
সংখ্যাটা যদি হয় ফুটবল ম্যাচের স্কোরলাইন, তাহলে সম্ভবত এ নিয়ে আর কিছু না বললেও চলে। প্রায় সবাই জানেন বিখ্যাত এই স্কোরলাইনের মর্ম। ২০১৪ বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল, ঘরের মাঠে জার্মানির মুখোমুখি ব্রাজিল, শেষ বাঁশি বাজার পর জন্ম হয়েছিল ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে অন্যতম শোকের এ স্কোরলাইনের।
বেলো হরিজেন্তের মিনেইরাও স্টেডিয়ামে সেদিন স্বাগতিকদের জালে গুনে গুনে ৭ গোল করেছিল জার্মানি। কেউ কেউ বলেন, ১৯৫০ বিশ্বকাপে ‘মারাকানাজ্জো’র পর এই হারই ব্রাজিলিয়ান ফুটবলে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়। ‘মারাকানাজ্জো’র মতো এ হারকেও ‘মিনেইরাজো’ নামে স্মরণে রেখেছেন ব্রাজিলিয়ানরা। আর পৃথিবীর এ গোলার্ধে ব্রাজিলের সে হারকে কেউ কেউ ‘সেভেনআপ’ বলেও মজা করেন।
কিন্তু লুই ফেলিপে স্কলারির কাছে সেই হার মজার তো নয়ই, বরং বলতে পারেন দগদগে এক ঘা। সম্ভবত এই ক্ষত তাঁর কখনো শুকাবে না। ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ সামনে রেখে ব্রাজিলিয়ানরা বড় আশা করে ‘বিগ ফিল’ স্কলারির কাঁধে তুলে দিয়েছিল জাতীয় দলের কোচের দায়িত্ব। ব্রাজিলকে সর্বশেষ (২০০২) বিশ্বকাপ জেতানো এ কোচ দল নিয়ে উঠেছিলেন সেমিফাইনালেও। কিন্তু ফাইনালে ওঠার আগের ধাপে নেমে এসেছিল সেই ‘চিরদুঃখ’। ডাগআউটে দাঁড়ানো স্কলারি সেই দুঃখ সয়েছেন সবচেয়ে বেশি। দলটির কোচ যে তিনি, স্কোরলাইনের সব দায় তো তাই তাঁরই!
ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যম গ্লোবোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ১২ বছর আগের সেই হার নিয়ে কথা বলেছেন স্কলারি। কোচিং ছেড়ে এখন ব্রাজিলের ক্লাব গ্রেমিওর টেকনিক্যাল কো-অর্ডিনেটরের দায়িত্ব পালন করছেন। ব্রাজিলের কোচ হিসেবে ৭৭ বছর বয়সী স্কলারির পরিচয় আসলে দুটি—এক. ২০০২ বিশ্বকাপ জয়। দুই. ২০১৪ বিশ্বকাপে ১-৭ গোলের সেই হার। লোকে কোনটা বেশি স্মরণে রেখেছেন? স্কলারির কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, লোকে বিশ্বকাপ জেতানোর চেয়ে ১-৭ গোলের সেই হারকেই বেশি মনে রেখেছেন বলে তাঁর কখনো মনে হয়েছে কি না?
স্কলারি তাঁর উত্তরে পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘একটি প্রশ্ন করি। ২০০২ সালে জিতেছে কারা?’ প্রতিবেদক উত্তর দেন, ‘জাতীয় দল।’ স্কলারি তারপরই কথাটা ধরে বলেন, ‘হ্যাঁ, জাতীয় দল। ২০১৪ সালে হারল কারা?’ প্রতিবেদক এবারও বলেন, ‘জাতীয় দল।’ স্কলারি এবার দ্বিমত পোষণ করে বলেন, ‘না, ফেলিপাও!’ অর্থাৎ, সেই ম্যাচে হারের দায় স্কলারি নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। এ তথ্য অবশ্য নতুন নয়। ২০১৪ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচের পর ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে কোচের পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন স্কলারি।
ব্রাজিলিয়ান এ কোচ সেই হারের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘আমরা এখনো পুরোনো স্মৃতি হাতড়ে ভাবি, হয়তো সেদিন অন্য কিছুও হতে পারত। বাস্তবতা হলো, অন্য কিছু করার উপায় ছিল না। কারণ, যা কিছু করা হয়েছিল, সেটাকেই সেরা মনে করে করা হয়েছিল। সেদিন আমাদের কোনো পরিকল্পনাই খাটেনি, সবকিছু ভুল ছিল, একদম ভুল ছিল।’
আরও একটি কারণ বলেছেন স্কলারি। তাঁর দাবি, ২০১৪ বিশ্বকাপে জার্মানির কাছে হেরে যাওয়া সেই দলটি বাইরের চাপ থেকে ততটা মুক্ত ছিল না, যতটা ২০০২ বিশ্বকাপের দলটি ছিল। কোয়ার্টার ফাইনালে চোট পেয়ে নেইমার ছিটকে পড়ার পর পুরো ব্রাজিল শোকাতুর হয়ে পড়েছিল, যার ছাপ পড়েছিল জাতীয় দলেও।
স্কলারি বলেন, ‘২০০২ সালে জাতীয় দলকে যেভাবে বাইরের চাপ থেকে পুরোপুরি আড়াল বা সুরক্ষিত রাখতে পেরেছিলাম, সেবার আর তা করা সম্ভব হয়নি। এটা বেশ বড় সমস্যা তৈরি করেছিল... এর মধ্যে ব্যক্তিগত স্বার্থ যেমন ছিল, তেমনি জাতীয় দলের ভেতরে থাকা বিভিন্ন গোষ্ঠীর স্বার্থও জড়িত ছিল।’
স্কলারি শুরুর দিকে চেষ্টা করতেন সেই হার নিয়ে কথা না বলতে। পরের ধীরে ধীরে সয়ে এসেছে। গ্রেমিওর তৎকালীন সভাপতি ফাবিও কফ তাঁকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, সেই হারকে স্কলারি যেন আজীবনের কান্না বানিয়ে না রাখেন। শেষ পর্যন্ত ১-৭–এর বিষণ্নতা থেকে বের হয়ে আসতে পারেন স্কলারি। সে জন্য ধন্যবাদ দিয়েছেন পরিবার ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের।
তবু কথা থেকে যায়। অমন এক হারের ম্যাচে কী কী ভুল করেছিলেন, সেটা কি স্কলারির কখনো জানতে ইচ্ছা করেনি? সে জন্য কি ম্যাচটির ভিডিও পরে টিভি কিংবা ল্যাপটপে দেখেছিলেন?
স্কলারির উত্তর, ‘আমি ওই ম্যাচটা তো বটেই, ক্যারিয়ারের কোনো ম্যাচই পরে আর কখনো পুরোটা দেখিনি। টুকটাক হাইলাইটস হয়তো মাঝেমধ্যে অন্য কোনো প্রসঙ্গে চোখের সামনে চলে আসে...তবে ম্যাচ শেষ হওয়ার পরের দিন কিংবা দুই-তিন-চার বছর পর পুরো খেলা আবার বসে বসে দেখার স্বভাব আমার নেই।’
স্কলারির কি মনে আছে, সেই রাত বা পরের দিনটি কেমন ছিল? ‘বিগ ফিল’ নামে খ্যাত এই কোচের উত্তর, ‘আমার মনে নেই। সম্ভবত আমি ঘুমাতে পারিনি, খুব মন খারাপ হয়েছিল অথবা খুব কম ঘুমিয়েছিলাম। তবে ঘুমানোর জন্য তো আর আমাকে কর দিতে হয় না!’
২০২৬ বিশ্বকাপের স্কোয়াড ঘোষণা করেছেন ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তি। স্কলারির কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, এবার ব্রাজিলের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের আশা করেন কি না? ব্রাজিলকে পঞ্চম বিশ্বকাপ ট্রফি জেতানো সাবেক এ কোচের উত্তর, ‘আমি আশা করি। আশা করি, কার্লো এটা অর্জন করতে পারবে। তবে একটা ব্যাপার আছে। বিশ্বকাপের আসল লড়াইটা আসলে নকআউট পর্বে, যা নিয়ে এখনো কেউ তেমন একটা কথা বলছে না।’
কিছুদিন আগে অন্য এক সাক্ষাৎকারে স্কলারি দাবি করেছিলেন, তাঁর অধীনে ২০০২ সালে খেলোয়াড়দের সেই প্রজন্ম এবং বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে বেশ মিল আছে। তবে খেলার মানের দিক থেকে বর্তমান প্রজন্ম একটু পিছিয়ে। স্কলারির কাছে তাই জানতে চাওয়া হয়েছিল, ২৪ বছর আগের সে প্রজন্ম থেকে রাফিনিয়া-ভিনিসিয়ুসরা যদি পিছিয়েই থাকবেন, তাহলে তিনি কীভাবে এবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার আশা করছেন?
স্কলারির উত্তর, ‘জেতা সম্ভব। অনেক সময় দল সেরা না হলেও নির্দিষ্ট সেই দিনটিতে যদি সবার মধ্যে বোঝাপড়া আর ভারসাম্য থাকে, তবে ঠিকই পার পাওয়া যায়। ম্যাচে ভারসাম্য ধরে রাখাটা বড্ড জরুরি।’
নেইমারকে নিয়েও কথা বলেন স্কলারি। চোট থেকে পুরো সেরে না উঠলেও নেইমারকে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে রেখেছেন আনচেলত্তি। স্কলারির কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, ২৪ বছর আগে এমন পরিস্থিতিতে তিনি নেইমারকে বিশ্বকাপ দলে রাখতেন কি না?
স্কলারির উত্তর, ‘আমি যদি জাতীয় দলের কোচ হতাম, তবে নেইমারকে কীভাবে আরও উজ্জ্বল করে তোলা যায়, সেই পথ খুঁজতাম। কেন, কোথায়, কী করতে হবে এবং কোন পরিস্থিতিতে কে নেইমারকে সাহায্য করবে—সবকিছু বিশ্লেষণ করে দেখতাম। কাউকে দলে নেওয়া বা কারও নাম সুপারিশ করার আগে আমরা এ ধরনের একগুচ্ছ চুলচেরা বিশ্লেষণ করে থাকি।’
স্কলারি এরপর স্পষ্ট করে বলেন, ‘নেইমারকে আমি দলে নিতাম কি নিতাম না—সেটা এখন নিশ্চিত করে বলতে পারছি না। কারণ, তার বর্তমান পরিস্থিতি আমার জানা নেই, আর ম্যাচের কৌশল নিয়ে কার্লোর মাথায় কী চলছে, তা–ও আমি জানি না।’