
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের চীন সফরের সময় একমুহূর্তের জন্য হলেও বেইজিংকে দেখে মস্কো বলে ভুল হতে পারে। চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং যখন পুতিনকে নিয়ে লালগালিচার ওপর দিয়ে হেঁটে গ্রেট হল অব দ্য পিপলে ঢুকছিলেন, তখন চীনের সামরিক বাহিনীর ব্যান্ড দল রোমান্টিক রুশ ক্ল্যাসিক ‘মস্কো নাইট’ বাজাচ্ছিল।
পুতিন সি চিন পিংকে বলেন, ‘আমার প্রিয় বন্ধু।’ আর সি পুতিনকে বলেন, ‘আমার পুরোনো বন্ধু।’
দুই নেতা পরস্পরের সঙ্গে এ ভাষাতেই কথা বলেন। তাঁরা বিশ্বকে দেখাতে চান, তাঁদের মধ্যে একটি বিশেষ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। এখন পর্যন্ত তাঁদের ৪০ বারের বেশি মুখোমুখি সাক্ষাৎ হয়েছে।
রাশিয়া ও চীনের নেতারা যে যৌথ বিবৃতি দিয়েছেন, এতে দুই দেশের মধ্যে অংশীদারত্ব, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বন্ধুত্ব ও আস্থার ক্ষেত্রে কৌশলগত সহযোগিতার কথা বলেছেন।
একই সঙ্গে তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ পারমাণবিক নীতির সমালোচনা করেছেন। সেই সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘গোল্ডেন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনা–সংক্রান্ত পরিকল্পনার নিন্দা জানিয়েছেন।
পুতিন চীন সফরে আসার আগে আগে রাশিয়ার সরকারি পত্রিকা নিজেদের প্রথম পাতায় দুটি বড় ছবি প্রকাশ করে। এর একটিতে দেখা যায়, গত সপ্তাহে চীন সফর শেষে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একা এয়ার ফোর্স ওয়ানের সিঁড়ি বেয়ে উঠছেন; সেটার পাশে ছাপানো হয় পুতিন ও সি চিন পিং একসঙ্গে হাঁটছেন—এমন একটি পুরোনো ছবি।
ছবিতে বার্তা ছিল স্পষ্ট—রাশিয়া ও চীন বিশ্ব মঞ্চে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলছে।
কিন্তু বৈশ্বিক ভূরাজনীতি এসব বার্তার ওপর নির্ভর করে চলে না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভূরাজনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তি হয় নিজস্ব স্বার্থ।
এই ভূরাজনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার করতে বুধবার চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে সির সঙ্গে বৈঠক করেন পুতিন। আগের দিন মঙ্গলবার রাতে দুই দিনের চীন সফরে পুতিন বেইজিং পৌঁছান।
পুতিনের এবারের চীন সফরে মস্কোর অন্যতম আগ্রহ ছিল তাদের নতুন পাইপলাইন—পাওয়ার অব সাইবেরিয়া–২–এর পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া। এই পাইপলাইনের মাধ্যমে পশ্চিম সাইবেরিয়া থেকে মঙ্গোলিয়া হয়ে উত্তর চীনে রাশিয়া বাড়তি গ্যাস সরবরাহ করতে সক্ষম হবে। এভাবে মস্কোর জন্য ইউরোপীয় বাজার হারানোর ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। ইউক্রেনে আক্রমণের পর পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
গত বছর রাশিয়া ও চীন পাওয়ার অব সাইবেরিয়া–২ প্রকল্প নিয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে। কিন্তু বেইজিংকে দেখে মনে হচ্ছে, দেশটি এই চুক্তি নিয়ে তাড়াহুড়া করতে চায় না। সঙ্গে বেইজিং দামের বিষয়েও কিছুটা ছাড় চায়। কয়েকজন বিশ্লেষকের মতে, চীন সম্ভবত রাশিয়ার জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা তৈরি হওয়াও এড়াতে চায়।
বুধবার ক্রেমলিন জানিয়েছে, রাশিয়া ও চীন প্রকল্পটির ‘মূল কাঠামো ও শর্তাবলি’ নিয়ে একটি ‘সাধারণ সমঝোতায়’ পৌঁছেছে। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি।
এ নিয়ে রাশিয়ার সরকারি পত্রিকায় বলা হয়েছে, ‘রাশিয়া ও চীনের অবস্থান এক নয়। তাদের স্বার্থও সব সময় একে অপরের সঙ্গে মিলে যায় না।’
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা স্পুতনিকের সরবরাহ করা ছবি অনুযায়ী, দুই দিনের চীন সফর শেষে পুতিন বুধবারই বেইজিং ছেড়েছেন।