গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা
গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা

আন্তর্জাতিক জলসীমায় গাজাগামী সুমুদ ফ্লোটিলার বহরে ইসরায়েলি অভিযান

ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী ভূমধ্যসাগরের মাঝখানে আন্তর্জাতিক জলসীমায় আবারও গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার নৌবহরে অভিযান চালিয়েছে। এই অভিযানে ইসরায়েল ড্রোন ও যোগাযোগব্যবস্থা বিঘ্নিত করার প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে, পাশাপাশি সশস্ত্র অভিযানকারী দলও কাজ করেছে।

গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার আয়োজক ও ইসরায়েলি গণমাধ্যম এ খবর জানিয়েছে। গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা গাজার ফিলিস্তিনিদের জন্য ত্রাণ এবং মানবিক সহায়তা নিয়ে যাচ্ছিল।

আজ বৃহস্পতিবার গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা সহায়তা মিশন এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘আমাদের নৌযানগুলোর কাছে সামরিক স্পিডবোটগুলো আসে। তারা নিজেদের ‘ইসরায়েলি’ বলে পরিচয় দেয়। তারপর তারা লেজার ও আধা–স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র তাক করে নৌযানে থাকা সবাইকে সামনে চলে যেতে বলে। তাদের হাতে ও হাঁটুতে ভর দিয়ে থাকতে বলে।’

ফ্লোটিলার পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে বলা হয়, ‘আন্তর্জাতিক জলসীমায় ইসরায়েলের সামরিক নৌযানগুলো অবৈধভাবে ফ্লোটিলাকে ঘিরে ফেলেছে। অপহরণ ও সহিংসতার হুমকি দিয়েছে।’

ওই পোস্টে আরও বলা হয়, ‘বহরে থাকা ১১টি নৌযানের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ইসরায়েলি গণমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে, তারা ৭টি নৌযান আটক করেছে। ফ্লোটিলার সুরক্ষায় বিভিন্ন দেশকে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে।’

ইসরায়েলি আর্মি রেডিও সরকারি এক সূত্রের বরাতে বলেছে, গাজাগামী ত্রাণবাহী নৌযানগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিতে অভিযান শুরু করেছে ইসরায়েল। ইসরায়েলি বাহিনী গ্রিসের ক্রিট দ্বীপের কাছে ফ্লোটিলার ৫৮টি নৌযানের মধ্যে সাতটি নৌযান এরই মধ্যে দখলে নিয়েছে।

গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার মুখপাত্র গুর সাবার তাদের নৌযানগুলোতে ইসরায়েলের উঠে আসাকে ‘আন্তর্জাতিক জলসীমায় নিরস্ত্র বেসামরিক নৌযানের ওপর সরাসরি আক্রমণ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

২০২৫ সালের অক্টোবরে গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার একটি নৌযান থেকে গ্রেটা থুনবার্গকে নিয়ে যান ইসরায়েলি নিরাপত্তাকর্মীরা

কানাডার টরন্টো থেকে আল–জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সাবার বলেন, ‘ইসরায়েল থেকে শত শত মাইল দূরে’ সমুদ্রে এই নৌ-অভিযান চালানো হচ্ছে; ফ্লোটিলাকে ‘ঘিরে ফেলা হয়েছে এবং অস্ত্রের মুখে হুমকি দেওয়া হচ্ছে’।

সাবার আরও বলেন, ‘আন্তর্জাতিক আইনে এটি অবৈধ। এই জলসীমায় ইসরায়েলের কোনো এখতিয়ার নেই। এসব নৌযান তাদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া অবৈধ আটক হিসেবে গণ্য হয়—গভীর সমুদ্রে যা সম্ভাব্য অপহরণের শামিল।’

এখনই সব দেশের সরকারের পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলেও মনে করেন সাবার। তিনি বলেন, ‘এ মুহূর্তে সব সরকারের পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। প্রতিটি সরকারেরই দায়িত্ব রয়েছে জাহাজে থাকা ৪০০–র বেশি বেসামরিক নাগরিককে সুরক্ষা দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক আইন রক্ষা করা। এই মুহূর্তে নীরবতা মানে অপরাধের সম্পূর্ণভাবে অংশীদার হওয়া।’

‘আমরা আমাদের অনেক নৌকার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছি না’

ফ্লোটিলার একটি নৌযানে থাকা লেখক ও অধিকারকর্মী তারিক রা’উফ আল–জাজিরাকে বলেন, বড় বড় ইসরায়েলি সামরিক জাহাজ দিয়ে পুরো বহরকে ঘিরে ফেলা হয়েছে, যেগুলো থেকে পরে রিজিড ইনফ্ল্যাটেবল বোট (আরআইবি) বা শক্ত কাঠামোর ছোট আকারের রাবারের নৌকা মোতায়েন করা হয়েছে।

পরিস্থিতির বর্ণনায় তারিক আরও বলেন, ‘সামরিক জাহাজগুলো থেকে অনেক ছোট সামরিক আরআইবি আমাদের নৌযানগুলোর চারপাশ ঘিরে ফেলতে শুরু করে। ড্রোনগুলো আমাদের চারপাশে ঘোরাফেরা করছে এবং আলো ঝলকাচ্ছে। আর ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী রেডিওর মাধ্যমে আমাদের বার্তা পাঠাচ্ছে। আমাদের বারবার বলা হচ্ছে, আমরা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করছি এবং আমাদের থেমে যেতে হবে।’

নৌবহরে থাকা নৌযান আটক করে অধিকারকর্মীদের দিকে অস্ত্র উঁচিয়ে আছেন ইসরায়েলি সেনারা। ০৩ অক্টোবর, ২০২৫

ইসরায়েলের এই অভিযান কয়েক ঘণ্টা ধরে চলেছে বলেও জানান তারিক। তিনি আরও বলেন, ফ্লোটিলাটি আন্তর্জাতিক জলসীমায় (গ্রিসের দ্বীপ) ক্রিটের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, সে সময় ইসরায়েলি নৌবাহিনীর অভিযান শুরু হয়।

‘আমরা আমাদের অনেক নৌকার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছি না’, যোগ করেন তারিক।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী রেডিও চ্যানেলে গান বাজিয়ে তাদের যোগাযোগব্যবস্থা জ্যাম করে দিচ্ছিল বলেও আল–জাজিরাকে জানান এই লেখক ও অধিকারকর্মী। তিনি বলেন, তারা এটিকে ‘একধরনের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধকৌশল’ হিসেবে ব্যবহার করছিল।

তারিক বলেন, ‘আমরা আন্তর্জাতিক জলসীমায় রয়েছি। তাই সত্যি বলতে, বাস্তবে, এটা ইসরায়েলের একটি নজিরবিহীন পদক্ষেপ। কারণ, আমরা গাজার কাছাকাছিও নেই।’

এবার ফ্লোটিলা গাজা থেকে আনুমানিক ৬০০ নটিক্যাল মাইল (১ হাজার ১১১ কিলোমিটার) দূরে রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আল–জাজিরার সাংবাদিক জ্যাক বার্টন বলেন, এর আগে কোনো ত্রাণবাহী ফ্লোটিলাকে ইসরায়েল সর্বোচ্চ ৭২ নটিক্যাল মাইল (১৩৩ কিলোমিটার) দূরত্বে আটক করেছিল।

ইতালির উপকূল থেকে গত রোববার বিভিন্ন দেশের অধিকারকর্মীদের নিয়ে ৫০টির বেশি নৌযান গাজা উপত্যকার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। আয়োজকদের ভাষায়, এটি এখন পর্যন্ত গাজায় পৌঁছানোর চেষ্টা করা সবচেয়ে বড় মানবিক সহায়তাবাহী ফ্লোটিলা।

গত বছরের অক্টোবরে গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার প্রায় ৪০টি নৌযান অবরুদ্ধ গাজায় যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিনিদের জন্য ত্রাণসামগ্রী নিয়ে যাওয়ার সময় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী তাদের আটক করে। সেবার ৪৫০ জনের বেশি সহায়তাকর্মী ও অধিকারকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়, যাঁদের মধ্যে ছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার নাতি, সুইডিশ পরিবেশকর্মী গ্রেটা থুনবার্গ এবং ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য রিমা হাসান।

ফ্লোটিলা থেকে তাঁদের আটক করে ইসরায়েলে নেওয়ার পর কয়েকজন অধিকারকর্মী অভিযোগ করেন, তাঁদের ইসরায়েলি হেফাজতে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। পরে ইসরায়েল গ্রেপ্তার হওয়া নৌযানের ক্রু ও অধিকারকর্মীদের বহিষ্কার করে।