করোনায় অর্থনৈতিক পরিকল্পনা

বৈশ্বিক করোনা মহামারিতে Forbearance শব্দটি অনেক বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে যার বাংলা অর্থ হচ্ছে ধৈর্য, বিরতি বা আত্মসংযম। অনেকে forbearance কে forgiveness (মওকুফ) এর সমার্থক শব্দ হিসেবে শব্দটি যোগ করে চমকপ্রদ সব সংবাদ শিরোনাম করছে। পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে ‘মওকুফ’ বলতে আমরা যা বুঝে থাকি, তার ব্যবহার খুবই কম হয় এবং এর প্রভাব বিস্তর হয়ে থাকে। বৈশ্বিক করোনা মহামারিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে সবাই অর্থনৈতিকভাবে কঠিনতম দিন যাপন করছে।এই দুর্দিনে হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে হা–হুতাশ করলে কোন লাভ হবে না, বরং ধৈর্য সহকারে পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে। মর্টগেজ, ক্রেডিট কার্ড, গাড়ি ঋণ, স্টুডেন্টলোনসহ সব ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। Forbearance এর একটি প্রচলিত ইংরেজি গল্পের বাংলার রূপ এরকম—

রহিম সাহেবের মাসিক ১৫০০ ডলারের বাড়ির মর্টগেজ পেমেন্ট ছিল। করোনা মহামারিতে অন্য সবার মত তাঁরও চাকরি চলে গেল। তিনি ব্যাংকে ফোন করে তার অর্থনৈতিক দুরবস্থার কথা জানালেন এবং ছয় মাসের জন্য মর্টগেজ পেমেন্ট বন্ধ করে দিলেন। ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সপ্তম মাসে রহিম সাহেব কাজে যোগ দিলেন। ইতিমধ্যে তার মর্টগেজের পেমেন্ট শুরু হয়ে গেল। তিনি ব্যাংক থেকে ফোন পেলেন—
ব্যাংক : রহিম সাহেব, আপনার আবেদনকৃত সময়সীমা অনুযায়ী চলতি মাস থেকে মর্টগেজ পেমেন্ট শুরু হয়েছে। ছয় মাসের বকেয়াসহ আপনার মোট পেমেন্ট ১০ হাজার ৫০০ ডলার।
রহিম: কি বলেন? কীভাবে এটা হিসাব করলেন?
ব্যাংক: ছয় মাসের বকেয়া ৯ হাজার ডলার এবং বর্তমান চলতি মাসের মধ্যে ১ হাজার ৫০০ ডলার।
রহিম: এত অর্থ আমার পক্ষে পরিশোধ করা সম্ভব নয়। আপনি আমাকে অন্য কোনোভাবে সহযোগিতা করতে পারেন কিনা?
ব্যাংক: অবশ্যই, আমরা আপনার বকেয়া ৯ হাজার ডলার আগামী ১২ মাসের মধ্যে কিস্তি করে দিতে পারি।
রহিম: ধন্যবাদ, সেক্ষেত্রে আমার কিস্তির পরিমাণ কত হবে?
ব্যাংক: আপনার আগামী ১২ মাস কিস্তির পরিমাণ মাসিক ২ হাজার ২৫০ ডলার করতে হবে।
রহিম: আমার আয় তো বাড়েনি, এটা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
ব্যাংক: দুঃখিত, এর চেয়ে বেশি কিছু আমাদের করার নেই।
রহিম: আমি কি রিফাইনান্স করতে পারি?
ব্যাংক: আপনার ঋণের Forbearance নেওয়ার কারণে রিফাইনান্স করা সম্ভব নয়।
রহিম সাহেব চিন্তায় পড়ে গেলেন। নিরুপায় হয়ে বাড়ি হারানের ভয় ঢুকে গেল তাঁর মধ্যে।
Forbearance মানে মওকুফ নয়, বরং সাময়িক বিরতি যা পরবর্তীতে আপনাকে পরিশোধ করতে হবে। একই পরিস্থিতি ক্রেডিট কার্ড, গাড়ি ঋণ ও স্টুডেন্ট লোনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
করোনা মহামারিতে অর্থনৈতিক দুরবস্থা মোকাবিলায় যেসব করণীয় ঠিক করতে হবে—
১. আপনার ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে সুবিধাজনক বিকল্প গ্রহণ করুন। কোন প্রতিষ্ঠানই স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপনাকে এই সুবিধা দেবে না। যোগাযোগের সব নথিপত্র সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করুন। ফোনে যোগাযোগের ক্ষেত্রে কনফারমেশন ইমেইল চাইতে পারেন।
২. ক্রেডিট কার্ড একান্ত প্রয়োজন না হলে ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন। আপনার অব্যবহৃত ক্রেডিট কার্ড অল্প পরিমাণে ব্যবহার করুন, কারণ ব্যাংক ইতিমধ্যে অব্যবহৃত কার্ড বন্ধ করা শুরু করেছে যা আপনার ক্রেডিট স্কোরকে প্রভাবিত করবে। সম্ভব হলে মিনিমাম পেমেন্ট পরিশোধ করুন।
৩. সাময়িক লাভের আশায় আকর্ষণীয় কোন অফার যেমন: ক্রেডিট কার্ড সেটেলমেন্ট, ডেট রিলিফ ইত্যাদি গ্রহণ করা থেকে সম্ভব হলে বিরত থাকুন। আপনার অর্থনৈতিক অবস্থার দ্রুত উন্নতি হতে পারে, কিন্তু সাময়িক সুবিধা গ্রহণ ভবিষ্যৎকে কঠিনভাবে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
৪. অপ্রয়োজনীয় ব্যয় সংকোচন করুন, ইন্টারনেট, টিভি চ্যানেল, মোবাইলফোনসহ বিলাসবহুল খরচ সাময়িক প্রত্যাহার করুন।
৫. লকডাউন খুললেই আপনি নিশ্চিন্তে চাকরিতে যোগদান করতে পারবেন, এরকম নাও হতে পারে। চাকরি কিংবা ব্যবসার ক্ষেত্রে বিকল্প চিন্তা করে রাখুন।
৬. মিথ্যা তথ্য কিংবা গোঁজামিল দিয়ে কোন রকম সুবিধা গ্রহণ করবেন না, কারণ ভবিষ্যতে এটি আপনার গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
৭. মনে রাখা জরুরী, প্রতিটি সমস্যাই কিছু সুযোগ নিয়ে আসে। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের পরিকল্পনা করুন, নির্ভরযোগ্য তথ্য নিয়ে বিনিয়োগ করুন এবং ভবিষ্যতের জন্য সেভিংস করা শুরু করুন।

লেখক: রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী