দুর্যোগপূর্ণ এই করোনাকালে ইতিবাচক খবরের চেয়ে নেতিবাচক খবরই বেশি। ঘুম থেকে ওঠার পর যেদিকে চোখ বুলাবেন, শুধু দুঃসংবাদ। টিভি, রেডিও, পত্রিকা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম—সর্বত্রই মৃত্যু সংবাদ। মৃত্যুর হালনাগাদ তথ্য, আক্রান্তের হালনাড়াদ তথ্য। মানুষ এখন পরিণত হয়েছে সংখ্যায়। সংখ্যা নির্ধারণ করে এর ভয়াবহতা। প্রতিদিন, প্রতিক্ষণে বাড়ছে এই সংখ্যা। কেউ জানে না সর্বশেষ সংখ্যাটি কত হবে। কোথায়, কখন থামবে এই তাণ্ডব।
এসব সংবাদ শুনতে শুনতে, দেখতে দেখতে কেমন যেন একটু উদ্বেগ, অনিশ্চয়তা, হতাশা, দুশ্চিন্তা, বিষন্নতা, ভয় ভর করে মনে। অবশ্য এটি খুবই স্বাভাবিক।এ বিষয়টিকে গভীরভাবে না নিয়ে ভাবতে হবে অন্যভাবে। প্রতিকূলতা! দুর্যোগ! এ যে ঘটনাবহুল জীবনেরই অংশ। এতে হতাশ হয়ে পড়লে চলবে না। ইতিবাচক চিন্তা ও কাজ করে এ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
ভোরে শুয়ে শুয়ে চিন্তা করুন, আজ সারাদিন কী করবেন। প্রথমত, আপনি আপনার নিজের মনকে চাঙা করতে হবে, সারাদিন হাসিখুশী, খোশমেজাজে থাকতে হবে। আপনার এই হাসিখুশী, চাঙাভাব দেখে পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যে তা সংক্রামিত হবে। সবার সঙ্গে মন খুলে কথা বলুন, বাচ্চাদেরে তাদের ছোটবেলার গল্প শোনান, কে কেমন কথা বলতো, হাসতো, কান্না করতো, ভূল করতো। সবাই শৈশবের, কৈশোরের গল্প শুনতে খুব ভালবাসে। তাদের সঙ্গে একটু সময় লুডু বা দাবা, ক্যারম খেলুন. দেখুন তারা কত খুশি। বাচ্চারা দেখতে পারে শিক্ষামূলক কার্টুন বা প্রতিযোগিতামূলক অনুষ্ঠান, বিতর্ক প্রতিযোগিতা।
এই কোয়ারেন্টিনের সময়ে সবার অগাধ অবসর থাকলেও বাড়ির নারীদের কোনো অবসর নেই। তাদেরে এখন আরো বেশি কাজ করতে হয়। সেই প্রিয়তমা স্ত্রীকে নিয়ে একটু বসুন। গল্প করুন। প্রথম দেখার মধুর সেই স্মৃতি, বিয়ে, বাসর রাত, প্রথম বাচ্চা হওয়ার আনন্দের সেই দিন, প্রথম বিয়েবার্ষিকী। বসে বসে দেখতে পারেন বিয়ের সেই ভিডিও। সেই প্রথম কবিতা। একটু নষ্টালজিয়া । দেখবেন ভাল লাগবে। একবেলা যদি সবাইকে রান্না করে খাওয়াতে পারেন তবে তো বাজিমাৎ।
বাড়িতে যদি থাকেন মা–বাবা তাদের সঙ্গে কথা বলুন। তাদের একটু সময় দেন। তাদের বলুন আপনার ছোটবেলার কথা বলতে, দেখবেন কত সুন্দর করে তারা আপনার জীবনের গল্পগুলো বলছেন। আপনার মনে হবে এই তো সেদিনের কথা। দেশে–বিদেশে আত্মীয়স্বজন, বন্ধু–বান্ধবদের সঙ্গে ফোনে, ভিডিও কলে কথা বলতে পারেন। বই পড়তে পারেন, বিখ্যাত মানুষের আত্মকথা বা স্মৃতিকথা। এখন ইন্টারনেটে সবকিছুই পাওয়া যায়। গান শুনতে পারেন, পুরানো দিনের গান। ইউটিউবে দেখতে পারেন হাসির নাটক, সিনেমা, স্বল্প দৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, আর্ট ফিল্ম, দেশ–বিদেশের বিভিন্ন অ্যাওয়ার্ড শো, ডকুমেন্টারি, বিখ্যাত পরিচালকদের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মুভিগুলো। ক্রিকেটপ্রেমীরা দেখতে পারেন পৃথিবীর বিখ্যাত ক্রিকেটারদের খেলা, ওয়ার্ল্ড কাপ ফাইনাল, টি–টোয়েন্টির টানটান উত্তেজনার ফাইনাল ম্যাচগুলো।
ফুটবলপ্রেমিরা দেখতে পারেন ওয়ার্ল্ড কাপ ফাইনালের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলো বা ইউরোপিয়ান কাপের উত্তেজনাপূর্ণ খেলাগুলো। দেখতে পারেন রান্না–বান্নাসহ শিক্ষনীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠান। ফেসবুকে শিক্ষামূলক কিছু নিয়ে বন্ধুদের চ্যালেঞ্জ জানাতে পারেন, দেখবেন বন্ধুদের প্রতিক্রিয়া।
ডায়েরিতে লিখতে পারেন এ সময়ের কথা। এই দুর্যোগে আশপাশের মানুষের আচরণ, কথাবার্তায় কী পরিবর্তন হয়েছে, এই দুর্যোগ থেকে নিজে কী শিখলেন। নিয়মিত ৮ ঘন্টা ঘুমান। গোসল করে রংবেরঙের কাপড় পড়ুন। পর্দা তুলে জানালার ধারে দাঁড়িয়ে দেখুন আকাশের খণ্ড খণ্ড মেঘগুলো কত দ্রুত উত্তর থেকে দক্ষিণে চলে যাচ্ছে। দেখুন প্রকৃতি। ঘরের ভেতর বা বাড়ির সামনের বারান্দায় একটু হাঁটুন। কিছুক্ষণ নিজে নিজের সঙ্গে কথা বলুন। বেসুরো হলেও একটু গান করুন।পারলে কবিতা আবৃতি। সারা দিন নিজে ব্যস্ত থাকুন, পরিবারের অন্যদেরে ব্যস্ত রাখুন। রাতে বিছানায় শুয়ে ভাবুন আজ সারা দিনের কথা। মনে হবে, আজ ছিল জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দিনের একটি দিন।