
চলতি বছরের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের অর্ধেকের বেশি অঙ্গরাজ্যে ব্যবহৃত ভোটিং মেশিন নিষিদ্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ এক নির্বাচন নিরাপত্তা কর্মকর্তা। এ লক্ষ্যে গত বছর এসব মেশিনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশকে ‘জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ’ তকমা দেওয়ার বিষয়ে তিনি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনাও করেন। ঘটনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত দুই ব্যক্তির বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
হোয়াইট হাউসের উপদেষ্টা ও আইনজীবী কার্ট ওলসেন ছিলেন এই পরিকল্পনার নেপথ্যে। ট্রাম্প তাঁকে ভোট কারচুপির বিতর্কিত বিভিন্ন তত্ত্ব অসার বলে প্রমাণের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। ওলসেন মূলত ‘ডমিনিয়ন ভোটিং সিস্টেমস’ মেশিনগুলোকে লক্ষ্য করে এই পরিকল্পনা এগিয়ে নেন। সূত্রের খবর, ওলসেন ও অন্যান্য কর্মকর্তারা নির্বাচনের নিয়ন্ত্রণ অঙ্গরাজ্যগুলোর হাত থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে নেওয়ার উপায় খুঁজছিলেন। ট্রাম্প নিজেও বিষয়টি নিয়ে আগে জনসমক্ষে কথা বলেছিলেন।
ওলসেন দেশজুড়ে হাতে গোনা কাগজের ব্যালট–ব্যবস্থা চালু করতে চেয়েছিলেন। ট্রাম্প নিজেও বারবার এই দাবি তোলেন। তবে নির্বাচন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানের ডিজিটাল ব্যবস্থার চেয়ে হাতে গোনা পদ্ধতিটি অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এবং এতে ভুলের আশঙ্কাও বেশি থাকে।
এই পরিকল্পনা গত সেপ্টেম্বর নাগাদ বাণিজ্য মন্ত্রণালয় পর্যন্ত গড়িয়েছিল। কর্মকর্তারা বিষয়টি নিয়ে প্রাথমিক অনুসন্ধানও শুরু করেছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত ওলসেন বা তাঁর দলের সদস্যরা এর পক্ষে কোনো প্রমাণ দিতে পারেননি। ফলে পরিকল্পনাটি ভেস্তে যায়।
পুরো বিষয়টি ট্রাম্প প্রশাসনের একটি সুদূরপ্রসারী প্রচেষ্টার অংশ ছিল। এই কর্মকর্তারা মূলত নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে স্থানীয় ও অঙ্গরাজ্য সরকারের অধিকারে হস্তক্ষেপ করতে চেয়েছিলেন। মার্কিন সংবিধানে এই ক্ষমতা স্থানীয় সরকারের হাতে রাখা হয়েছে, যেন কেন্দ্রীয় সরকার একচেটিয়া ক্ষমতা দখল করতে না পারে। ওলসেন বর্তমানে শীর্ষ গোয়েন্দা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে মিলে ভোট কারচুপির দাবিগুলো তদন্ত করছেন।
রয়টার্সের এক অনুসন্ধানে জানা গেছে, অন্তত আটটি অঙ্গরাজ্যের কর্মকর্তারা গোপনীয় নথিপত্র এবং ভোটিং মেশিন দখলে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এ ছাড়া তাঁরা ভোটার জালিয়াতির এমন সব মামলা পুনরায় খতিয়ে দেখছেন। এর আগে আদালত এগুলো নাকচ করে দিয়েছিলেন। ট্রাম্প ও তাঁর রিপাবলিকান সহযোগীরা আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে সুবিধা পেতে নির্ধারিত সময়ের আগেই নির্বাচনী এলাকাগুলো নতুন করে সাজানোর পরিকল্পনা করছেন।
ডেমোক্র্যাট সিনেটররা ওলসেনকে তাঁর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছেন। তিনি মূলত মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেই এসব ভোটিং মেশিন বাতিল করার লক্ষ্য নিয়েছিলেন বলে দুটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে।
এই আলোচনাপ্রক্রিয়ায় আরও কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা যুক্ত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন ট্রাম্পের গোয়েন্দা প্রধান তুলসী গ্যাবার্ডের জ্যেষ্ঠ সহকারী পল ম্যাকনামারা। এ ছাড়া ট্রাম্পের ডোমেস্টিক পলিসি কাউন্সিলের বিশেষ সহকারী ব্রায়ান সিকমাও এতে জড়িত ছিলেন। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। ওলসেন মূলত তুলসী গ্যাবার্ডের দপ্তর ‘ডিরেক্টর অব ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স’ (ওডিএনআই)-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতেন।
রয়টার্সকে ওই দুটি সূত্র বলেছে, গত বছরের শুরুর দিকে ম্যাকনামারা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি ডমিনিয়ন মেশিনের চিপ এবং সফটওয়্যারকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসেবে ঘোষণা করার বিষয়টি বিবেচনা করতে বলেন।
সেই সময় ম্যাকনামারা ওডিএনআই-এর একটি টাস্কফোর্সের প্রধান ছিলেন। এই টাস্কফোর্স প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মিলে দেশের ভোটিং মেশিনগুলোর দুর্বলতা নিয়ে তদন্ত করছিল। দুই সূত্রের দাবি, ম্যাকনামারা এ বিষয়ে বাণিজ্যসচিব হাওয়ার্ড লুটনিকের নেতৃত্বাধীন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। বাণিজ্যসচিব লুটনিক নিজে এ আলোচনায় সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন কি না বা বিষয়টি জানতেন কি না, তা রয়টার্স নিশ্চিত হতে পারেনি।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, লুটনিক কখনো ম্যাকনামারার সঙ্গে নির্বাচন নিয়ে আলোচনা করেননি বা তাঁর সঙ্গে দেখাও করেননি। তবে লুটনিকের দপ্তর বা অন্য কোনো কর্মকর্তা এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন কি না, সে বিষয়ে ওই মুখপাত্র মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এ বিষয়ে মন্তব্য বা সাক্ষাৎকার চেয়ে ওলসেন, ম্যাকনামারা এবং সিকমার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাঁরা কোনো সাড়া দেননি।