এখনো বেড়িবাঁধে জীবন, ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি প্রতাপনগর

২০২০ সালের ২০ মে ঘূর্ণিঝড় আম্পান সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগরসহ কয়েকটি এলাকায় আঘাত হানে। ওই সময় বাড়িঘর হারিয়ে কয়েক শ পরিবার বসবাস করছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধে কিংবা ঢালে। রোববার বিকেলে উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়নের দুর্গাতলারআটি এলাকায়ছবি: প্রথম আলো

২০২০ সালের ২০ মে। বিকেলের পর থেকেই আকাশের রং বদলাতে শুরু করেছিল। সন্ধ্যা নামার আগেই খোলপেটুয়া ও কপোতাক্ষ ভয়ংকর হয়ে উঠেছিল। তারপর রাতভর তাণ্ডব। ঘূর্ণিঝড় আম্পানের জলোচ্ছ্বাসে একের পর এক ভেঙে যায় বেড়িবাঁধ। নদী ঢুকে পড়ে মানুষের ঘরে, উঠোনে, শস্যক্ষেতে। এক রাতেই বদলে যায় সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়নের মানচিত্র। সেই ঘটনার ছয় বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু প্রতাপনগরের বহু মানুষের কাছে আম্পান যেন এখনো শেষ হয়নি।

রোববার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত সাতক্ষীরা থেকে ৮৫ কিলোমিটার দূরে প্রতাপনগর ইউনিয়নের শ্রীপুর, কুড়িকাউনিয়া, হরিশখালি, বন্যতলা, দিঘলারআইট ও দুর্গাতলারআটি গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, ভাঙা বেড়িবাঁধের ঢালে, সড়কের পাশে কিংবা নদীর কিনারে ছোট ছোট ঝুপড়িতে এখনো বাস করছেন শত শত মানুষ। বর্ষায় পানি পড়ে, প্রচণ্ড গরমের সময় হাঁসফাঁস অবস্থা।

আম্পানে প্রতাপনগর ইউনিয়নের প্রায় ৫৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে প্রায় ৩০ কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ইউনিয়নের ১৪টি গ্রামই কমবেশি ক্ষতগ্রস্ত হয়। এখনো অন্তত ৫০০ থেকে ৬০০ পরিবার নিজেদের ভিটেমাটিতে ফিরতে পারেনি। কাজের অভাবে সহস্রাধিক পরিবার এলাকা ছেড়ে চলে গেছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।

দুর্গাতলারআটির পাশে কপোতাক্ষ নদ এখনো গিলে খাচ্ছে ভাঙা বাঁধের অংশ। কুড়িকাউনিয়ায় নদীতে বিলীন হয়ে গেছে সড়কের অংশ। প্রতাপনগর ও হাওলাদারপাড়ার মধ্যে সংযোগ রাখতে আম্পানের পর যে ভাসমান সেতু তৈরি করা হয়েছিল, মানুষ এখনো সেটির ওপর দিয়েই চলাচল করছে।

শ্রীপুর গ্রামের আবুল হাসেম গাজী (৪২) নদীর দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘বাপ-দাদার দুইটা ভিটা ছেলো। কপোতাক্ষর পারে ১০ বিঘা জমি ছেলো। আম্পানের রাতে অপদারের (পানি উন্নয়ন বোর্ড) বাঁধ ভাঙে, পানি ঢুকে সব নদী নিয়ে গেল। তারপর থ্যাকে এই বাঁধের ঢালে ঘর কুরে থাকতি আছি।’

একই গ্রামের ফিরোজ গাজী (৬৫) বলেন, ‘১৮ বিঘা জমি আছিল। সুখের সংসার আছিল। এক রাতেই সব শেষ। পানি ঢুকতি শুরু করলে জান বাঁচাইয়া ছেলেপুলা নিয়ে পালাইছি। এখন কাজ নি, ঘর নি। আল্লাহ যেভাবে চালাতে, সেভাবেই চলতে।’

দুর্গাতলারআটি গ্রামের রিজিয়া খাতুন (৬০) বলছিলেন, ‘ছয় বছর ধুরে এই বাঁধের উপর থাকতি। কেউ খোঁজ নেয় না। সরকার যদি একটু সাহায্য করত, তাহলে বাঁচি যেতাম।’ পাশে বসে থাকা মোবারক আলী (৭৫) দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘একসময় সব ছিল। আম্পান সব কাইড়া নিছে। এলাকার অনেক মানুষ ঢাকায় গেছে, কেউ খুলনায় গেছে। আমি আর কই যামু? বয়স হইছে। এখন শুধু আগের দিনের কথা মনে কইরা থাকি।’

এই জনপদে জীবিকার ছবিটাও কঠিন। অনেকেই নদী বা সাগরে মাছ ধরতে যান। কেউ সুন্দরবনে কাঁকড়া, মাছ, মধু সংগ্রহ করেন, কেউ গোলপাতা কাটেন। কিন্তু তাতেও অনিশ্চয়তা কাটে না। আধুনিকতার ছোঁয়া পৌঁছায়নি এখানে। বছরের পর বছর মানুষ টিকে থাকার লড়াই করে যাচ্ছেন।

প্রতাপনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু দাউদ বলেন, আম্পানে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৬০০ পরিবার এখনো পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধের ওপর বসবাস করছে। আশ্রয়ণ প্রকল্পে প্রায় ২০০ পরিবারকে ঘর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কাজের অভাবে অনেক মানুষ এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছে। প্রতিবছর এই সংখ্যা বাড়ছে। ৫৫ কিলোমিটার বাঁধের মধ্যে অন্তত আট কিলোমিটার এখনো খুব ঝুঁকিপূর্ণ। পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বারবার বলা হচ্ছে, কিন্তু স্থায়ী সমাধান হয়নি।

আশাশুনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শ্যামানন্দ কুন্ডু বলেন, ‘আম্পানে ঘরবাড়ি হারিয়ে লোকজন অন্য এলাকায় চলে গেছেন। অনেকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধের ওপর মানবেতর জীবনযাপন করছেন বলে শুনেছি। আমি এলাকা পরিদর্শন করে জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে দ্রুত তাঁদের কীভাবে আবাসনের ব্যবস্থা করা যায়, সে ব্যাপারে উদ্যোগ নেব।’