রাউজান গেলে যে কারণে আশীষ কুমারের প্যাড়া খেতেই হবে

চট্টগ্রামের রাউজানের ফকিরহাটে ছোট্ট এক দোকানে আশীষ কুমার দে তৈরি করেন ঐতিহ্যবাহী প্যাড়া মিষ্টি। বাবার কাছ থেকে শেখা পুরোনো রেসিপিতে তৈরি এই প্যাড়ার স্বাদে মুগ্ধ স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি প্রবাসীরাও। শুধু দুধ ও চিনি দিয়ে তৈরি এই প্যাড়া এখন মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপেও যাচ্ছে।

কারখানায় নিজের তৈরি প্যাড়া মিষ্টি হাতে চট্টগ্রামের রাউজানের আশীষ কুমার দেপ্রথম আলো

দেখতে ঝরনার পানিতে ক্ষয়ে যাওয়া ছোট আর মসৃণ নুড়ির মতো। তাতে দুধ জ্বাল দিয়ে তৈরি ঘন ক্ষীরের বাদামি একটা আভা। মুখে দিলে নিজের অজান্তেই স্বাদের কথা জানান দেবে জিব। চট্টগ্রামের রাউজানের আশীষ কুমারের প্যাড়া মিষ্টি যাঁরা খেয়েছেন, তাঁদের প্রায় সবার অভিজ্ঞতা এমনই। বলা হয়, রাউজান গেলেন আর আশীষের প্যাড়া চেখে দেখলেন না তো সমুদ্রপাড়ে দাঁড়িয়েও আপনি পানিতে পা ভেজালেন না। কিন্তু কেন এই প্যাড়ার এত খ্যাতি? এর উত্তর এককথায় দেওয়া যায়, স্বাদের কারণে।

রাউজান সদরের ফকিরহাটে ছোট সাধারণ এক দোকানে এই অসাধারণ প্যাড়া বিক্রি হয়। দোকানের কোনো নাম, সাইনবোর্ড নেই। সবার কাছে আশীষের প্যাড়ার দোকান হিসেবে পরিচিত। দোকানের এক পাশে চুলায় নিজ হাতে দুধ আর চিনি দিয়ে প্যাড়া তৈরি করেন আশীষ। বলতে যত সহজ, বাস্তবে ততই কঠিন প্যাড়া বানানোর কাজ। বড় ডেকচিতে লাকড়ির চুলায় তৈরি হয় প্যাড়া। দুধ নাড়তে হয় ক্রমাগত। গনগনে তাপে এই কঠিন কাজটাই দীর্ঘ সময় ধরে করতে হয়। ধীরে ধীরে ঘন হতে হতে সাদা দুধ বদলে লালচে বাদামি ঘন ক্ষীরে পরিণত হয়। সেটি আরও পাক দেওয়ার পর পাওয়া যায় প্যাড়ার মণ্ড। এরপর হাতে লেচি কেটে তৈরি হয় প্যাড়া।

আশীষের বাবা কালীপদ দে–ও প্যাড়া বানাতেন। বাবার কাছ থেকে আশীষের প্যাড়া তৈরির হাতেখড়ি। বাবার দেওয়া সেই ছোট দোকান আর টিনশেডের কারখানায় প্যাড়া বানিয়ে চলেছেন আশীষ। তাঁর শৈশবে দেখা অনেক কিছু পাল্টালেও বাবার দেওয়া প্যাড়ার রেসিপি পাল্টাননি তিনি। এই প্যাড়া এখন মধ্যপ্রাচ্যসহ নানা দেশে নিয়েও যাচ্ছেন প্রবাসীরা। আবার বিয়েশাদিসহ সামাজিক অনুষ্ঠানেও এই প্যাড়ার চাহিদা আছে।

দোকানের কোনো নাম, সাইনবোর্ড নেই। সবার কাছে আশীষের প্যাড়ার দোকান হিসেবে পরিচিত। দোকানের এক পাশে চুলায় নিজ হাতে দুধ আর চিনি দিয়ে প্যাড়া তৈরি করেন আশীষ। বলতে যত সহজ, বাস্তবে ততই কঠিন প্যাড়া বানানোর কাজ। বড় ডেকচিতে লাকড়ির চুলায় তৈরি হয় প্যাড়া। দুধ নাড়তে হয় ক্রমাগত। গনগনে তাপে এই কঠিন কাজটাই দীর্ঘ সময় ধরে করতে হয়। ধীরে ধীরে ঘন হতে হতে সাদা দুধ বদলে লালচে বাদামি ঘন ক্ষীরে পরিণত হয়। সেটি আরও পাক দেওয়ার পর পাওয়া যায় প্যাড়ার মণ্ড। এরপর হাতে লেচি কেটে তৈরি হয় প্যাড়া।

আশীষ দে জানান, ১৯৮৬ সালে তিনি ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়তেন। তখন বাবা কালীপদ তাঁকে প্যাড়া বানাতে শেখান। এর কিছুদিন পর বাবা মারা যান। বাবার মৃত্যুর কারণে পড়ালেখা আর প্যাড়ার দোকান একসঙ্গে সামলেছেন আশীষ। ১৯৯০ সালে এসএসসি পাস করে পুরোদমে লেগে যান বাবার মিষ্টান্নের ব্যবসায়।

শুধু প্যাড়া নয়, আশীষের হাতে বানানো মাখন আর ঘিয়েরও প্রচুর চাহিদা। দাম বেশি হলেও ক্রেতারা লাইন ধরে কিনে নিয়ে যান। গতকাল সোমবার সকাল ১০টায় আশীষের দোকানে ঢুকতেই দেখা গেল, বড় একটি ডেকচিতে লাকড়ির চুলায় দুধ গরম করছেন তিনি। পাশে মুঠোফোনে চলছে গান। তিনি ডেকচিতে লম্বা একটি হাতা দিয়ে দুধ নাড়ছিলেন। ঘন হয়ে আসা ক্ষীর পাকানো হলে সেটা ঠান্ডা হতে দিয়ে মাখন তোলার কাজে ব্যস্ত হয়ে যান তিনি। মাখন তুলতে দড়ি দিয়ে বড় ঘুঁটনি ঘোরাতে, অর্থাৎ মন্থন করতে থাকেন তিনি। আর মন্থনে অমৃতের মতো উঠে আসে মাখন।

বিদেশেও যাচ্ছে আশীষ কুমারের তৈরি এই প্যাড়া
প্রথম আলো

বেলা ১১টা নাগাদ প্যাড়া তৈরি শেষ হওয়ার আগেই ক্রেতাদের ভিড় জমতে থাকে। কেউ মাখন, কেউ ঘি আর কেউ প্যাড়া নিতে এসেছেন। সদ্য তৈরি প্যাড়া নিজেই মেপে প্যাকেট করে দেন আশীষ। মিষ্টি তৈরি থেকে বিক্রি—সবকিছু একাই করেন তিনি।

আশীষ জানান, তাঁর বাড়ি দোকান থেকে দুই কিলোমিটার দূরের রাউজান পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের পালিতপাড়ায়। এক মেয়ে ও এক ছেলের বাবা তিনি। মেয়ে বড়। নাম তিন্নি দে। এবার এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছেন। ছেলে তুহিন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। ছেলে–মেয়েদের পড়ালেখা আর সংসারের খরচ মিটিয়েও প্রতি মাসে কিছু সঞ্চয় হচ্ছে তাঁর। সব মিলিয়ে ব্যবসা বেশ ভালো চলছে। মাসে ৩০–৩৫ হাজার টাকা লাভ থাকে তাঁর।

১৯৮৬ সালে আশীষ দে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়তেন। তখন বাবা কালীপদ তাঁকে প্যাড়া বানাতে শেখান। এর কিছুদিন পর বাবা মারা যান। বাবার মৃত্যুর কারণে পড়ালেখা আর প্যাড়ার দোকান একসঙ্গে সামলেছেন আশীষ। ১৯৯০ সালে এসএসসি পাস করে পুরোদমে লেগে যান বাবার মিষ্টান্নের ব্যবসায়।

আশীষের দোকানে দিনে ১২ থেকে ১৫ কেজি প্যাড়া বিক্রি হয়। কোথাও নিজে তিনি প্যাড়া সরবরাহ করেন না। সবাই এসে নিয়ে যান। কথার ফাঁকে বলেন, গত রোববার একজন আমিরাতপ্রবাসী একসঙ্গে ছয় কেজি প্যাড়া কিনে সে দেশে নিয়ে গেছেন। মধ্যপ্রাচ্য আর ইউরোপের সব দেশেই যাচ্ছে তাঁর তৈরি প্যাড়া।

দুধ আর চিনি ছাড়া প্যাড়া তৈরিতে অন্য কোনো উপাদান ব্যবহার করেন না আশীষ। ১২ কেজি দুধে ৪ কেজি ২৫০ গ্রাম প্যাড়া হয়। চিনি লাগে আড়াই কেজি। ৫০০ টাকা কেজিতে বিক্রি করেন। মাখন কেজি ১ হাজার ৮০০ আর ঘি প্রতি কেজি ২ হাজার ৮০০ টাকা। আড়াই ঘণ্টা গামলার মধ্যে হাতে চাকা ঘুরিয়ে ১২ কেজি দুধ থেকে ১ কেজি মাখন তৈরি হয়। প্রতিদিন অন্তত দুই হাজার টাকার মাখন বিক্রি হয়। তাঁর ঘি বানানোর আগেই অর্ডার হয়। হিসাব করলে মাসে ১০ কেজির বেশি ঘি বিক্রি হয়।

প্যাড়া তৈরি সহজ কাজ নয়। চুলায় ডেকচি বা কড়াই বসিয়ে বড় হাতা দিয়ে নাড়তে হয় ক্রমাগত। উপাদান দুধ আর চিনি
প্রথম আলো

চট্টগ্রাম নগরের দামপাড়া থেকে প্যাড়া কিনতে এসেছিলেন কুয়েতপ্রবাসী ইকবাল চৌধুরী। তিনি বলেন, তাঁর পরিবার এবং কুয়েতের অনেক বন্ধু এই প্যাড়ার ভক্ত। তিনি ২০ বছর ধরে এখান থেকে বিদেশে প্যাড়া নিয়ে যান। তিনি বলেন, ‘১ হাজার টাকা গাড়ি ভাড়া খরচ করে ৫০০ টাকার প্যাড়া কিনতেও চলে আসি। কারণ, এর গুণমান ভালো।’