দিনে দেড় হাজার লিটার দুধ উৎপাদন, তিন বেলা খামারে লাইন ধরে কেনেন ক্রেতারা

বগুড়া শহরের রহমাননগরের আবেদিন ডেইরি ফার্মের সামনে লাইন ধরে ক্রেতারাই তিন বেলা দুধ কিনে নিয়ে যান। সম্প্রতি তোলাছবি : সোয়েল রানা

শখের বশে দেড় লাখ টাকায় গাভি কিনে দুগ্ধ খামার শুরু করেন সামসুল আবেদীন। শুরুতে দৈনিক ১৫-২০ লিটার দুধ হতো। কিন্তু সেই দুধের ক্রেতা পাওয়া যেত না। ফলে বিকেলে বালতিতে দুধ নিয়ে রিকশা ভাড়া করে বেরিয়ে পড়তেন। মহল্লা ঘুরে ঘুরে ফেরি করে ওই দুধ বিক্রি করে বাসায় ফিরতেন।

এই ঘটনা ১৯৯৪ সালের। ৩২ বছর পর এখন সামসুল আবেদীনের খামারে গরু আছে ২১৫টি; যা থেকে প্রতিদিন গড়ে দেড় হাজার লিটার দুধ পান তিনি। তবে এই দুধ বিক্রির জন্য তাঁকে আর ফেরি করতে হয় না। ক্রেতারাই তিন বেলা খামারের সামনে লাইন ধরে দুধ কিনে নিয়ে যান। প্রায়ই লাইনে দাঁড়িয়েও দুধ না পেয়ে ফিরে যান অনেক ক্রেতা।

খামারটি বগুড়া শহরের ১০ নম্বর ওয়ার্ডের রহমাননগর কাজী খানা লেনে অবস্থিত। নাম আবেদীন ডেইরি ফার্ম। শহরের বুকেই গরুর খামার করে সাফল্যের দেখা পেয়েছেন সামসুল আবেদীন (৬০)। ভোক্তার আস্থা অর্জনের পাশাপাশি সফল দুগ্ধ খামারি হিসেবে ২০০৫ সালে পেয়েছেন রাষ্ট্রপতি পদক। এর আগে ২০০০ সালে পান কৃষি পদক। সবশেষ ২০১৬ সালে পেয়েছেন জাতীয় যুব পুরস্কার। তিনি দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে দুগ্ধ খামারি অ্যাসোসিয়েশনের বগুড়া জেলা শাখার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।

আবেদীন ডেইরি ফার্মের ২১৫টি গরুর মধ্যে ১৭০টি গাভি, বাকি ৪৫টি বকনা। এসবের বাজারমূল্য ৪ কোটি টাকার ওপরে। ১১ জন নিয়মিত কর্মচারীসহ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে খামারে অন্তত ২০ জন মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। ৪৮ শতক আয়তনের এই খামারে প্রতিদিন লক্ষাধিক টাকার দুধ বিক্রি হয়। সামসুল আবেদীনের পরামর্শে অনেকেই দুগ্ধ খামার গড়ায় ঝুঁকেছেন।

শখ থেকে সফল খামারি
সচ্ছল পরিবারে জন্ম সামসুল আবেদীন অনেকটা ডানপিটে কিশোর ছিলেন। তাঁর বাবা জয়নাল আবেদীন ব্যাংক কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি পরে ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে আটা ও শর্ষে ভাঙার মিলের ব্যবসা গড়ে তোলেন। সামসুল আবেদীনরা সাত ভাই-বোন। ভাইদের মধ্যে তিনি সবার ছোট।

বগুড়া সেন্ট্রাল হাইস্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন। আজিজুল হক কলেজ থেকে করেন এইচএসসি পাস। আশির দশকে জেলা ছাত্রদলের রাজনীতিও করেছেন। পরে স্থানীয় পত্রিকার সাংবাদিক হিসেবে পেশাজীবন শুরু করেন। পাশাপাশি বাবাকে আটা ও শর্ষে ভাঙার মিলের ব্যবসায় সহযোগিতা করতেন। এর মধ্যে ১৯৯২ সালের দিকে ঠিকাদারি শুরু করেন। কিন্তু ঠিকাদারির কাজ তাঁর ভালো লাগছিল না। ১৯৯৪ সালে দেড় লাখ টাকায় দুটি গাভি কিনে খামার গড়ে তোলেন।

এখন প্রতিবছর খামার থেকে চার কোটি টাকার ওপরে দুধ বিক্রি করেন বলে জানালেন সামসুল আবেদীন। তিনি বলেন, খামারে প্রতিদিন ছয় হাজার থেকে সাড়ে সাত হাজার লিটার দুধের চাহিদা। বগুড়া শহর ছাড়াও আশপাশের এলাকা থেকে প্রতিদিন অনেক মানুষ দুধ কিনতে ভিড় করেন। সকাল আটটা, বেলা তিনটা এবং রাত আটটা—তিন পালায় দুধ সংগ্রহ করা হয়। চাহিদার তুলনায় খামারে দুধের উৎপাদন কম হওয়ায় ক্রেতা সামলাতে হিমশিম খেতে হয়।

আবেদীন ডেইরি ফার্মের ২১৫টি গরুর মধ্যে ১৭০টি গাভি, বাকি ৪৫টি বকনা। এসবের বাজারমূল্য ৪ কোটি টাকার ওপরে
ছবি : প্রথম আলো

আবেদীনের দুগ্ধ খামারে একদিন
বগুড়া শহরের প্রাণকেন্দ্র সাতমাথা থেকে প্রায় দুই কিলোমিটারের পথ রহমাননগর। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি দুপুরে খামারে গিয়ে দেখা যায়, দুধ কেনার জন্য কয়েক শ মানুষের লাইন। কারও হাতে প্লাস্টিকের বোতল, কারও হাতে ছোট কনটেইনার। খামারের ভেতরে ব্যস্ত সময় কাটছে কর্মীদের। কেউ গাভি-বাছুরের যত্ন নিচ্ছেন। কেউ খড়, ঘাস, ভুট্টার ডগার সঙ্গে খৈল-ভুসি মিশিয়ে গাভিকে খাওয়াচ্ছেন, কেউ গোসল করাচ্ছেন।
আবেদীন ডেইরি ফার্মে ২১ বছর ধরে কাজ করেন সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার ওমর ফারুক। প্রতি মাসে বেতন পান ২০ হাজার টাকা। তিনি জানালেন, আবেদীন তেল কারখানার নিজস্ব খৈল, গম, ভুট্টা ও ডালের ভুসি, ঘাস, ভুট্টার ডগা এবং গাজর খাওয়ানো হয়।

খামারের আটজন কর্মচারী গাভির দুধ সংগ্রহ করছিলেন। তাঁদের মুখে মাস্ক, হাতে গ্লাভস, পায়ে রাবারের মোজা এবং মাথায় চুলরোধক ক্যাপ। দুধ সংগ্রহ করে বড় বড় কনটেইনারে জমা করা হচ্ছে। এরপর সেই কনটেইনার চলে যায় খামারের ফটকে।
দুধের জন্য অপেক্ষা

খামারে দুধ সংগ্রহের আগে থেকে ফটকে দুধ কেনার জন্য ভিড় করেন ক্রেতারা। সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা ক্রেতাদের এক থেকে দুই লিটার করে দুধ মেপে মেপে দেওয়া হচ্ছে। কেউ কেউ এর বেশি দুধ নিতে চাইলেও দেওয়া হচ্ছে না।

ক্রেতাদের কাছ থেকে দুধের দাম সংগ্রহ করছিলেন খামারের মালিক সামসুল আবেদীন। প্রতি লিটারের দাম রাখা হচ্ছে ৮০ টাকা। তিনি জানালেন, অধিকাংশ ক্রেতা ৫ থেকে ১০ লিটার দুধ কিনতে আসেন। কিন্তু ক্রেতার উপস্থিতির ওপর মাথাপিছু এক থেকে দুই লিটার করে দুধ বিক্রি করা হয়। খামার থেকে দুধ সংগ্রহের পর সরাসরি বিক্রি করায় ক্রেতাদের আস্থা অর্জন সম্ভব হয়েছে। এ কারণে এই খামারের দুধের চাহিদা বেশি।

এক মাস আগেও খামারে প্রতি লিটার দুধের দাম ছিল ৭০ টাকা। এখন বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকায়। সব ধরনের গোখাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় দুধের দাম বাড়াতে হয়েছে বলে জানান সামসুল আবেদীন। তিনি বলেন, এক লিটার দুধ উৎপাদনে যে ব্যয় হয়, তার ৮০ শতাংশই যায় পশুখাদ্যে। সব মিলিয়ে প্রতি লিটার দুধে উৎপাদন খরচ ৭৫ টাকার বেশি।

শহরের সেউজগাড়ি এলাকার গৃহিণী মাধুরী জান্নাত প্লাস্টিকের কনটেইনার হাতে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। দেড় ঘণ্টা অপেক্ষার পর বিকেল সাড়ে চারটায় দুই লিটার দুধ পান তিনি। হতাশ কণ্ঠে বলেন, ‘রোজার মাসে পরিবারে প্রতিদিন দুই লিটার দুধ লাগে। এ কারণে ১০ লিটার দুধ কিনতে এসেছিলাম। পেলাম দুই লিটার।’

জলেশ্বরীতলা এলাকার গৃহিণী সাবরিনা রহমান বলেন, বিশ্বস্ততার কারণে এই খামারের দুধের চাহিদা বেশি। দেরিতে এলে দুধ পাওয়া যায় না—এ কারণে আগেই এসে লাইনে দাঁড়াতে হয়।

মালতীনগর বড়বাড়ির আবেদুর রহমানও চেয়েছিলেন পাঁচ লিটার দুধ কিনতে। পেয়েছেন দুই লিটার। তিনি বলেন, ‘পাঁচ বছর ধরে এ খামারের দুধ কিনি। প্রতিদিন লাইনে দাঁড়িয়ে দুধ কিনতে হয় এখানে।’

শহরের কালীতলা এলাকার হাবিবুর রহমান বলেন, ‘বাজারে তো দুধের অভাব নেই। অভাব শুধু ভেজালমুক্ত দুধের। এ খামারের দুধের সুনাম জেলাজুড়ে।’

দুধ সংগ্রহ করে বড় বড় কনটেইনারে জমা করা হয়। এরপর সেই কনটেইনার চলে যায় খামারের ফটকে
ছবি: প্রথম আলো

শহরেও বাড়ছে দুগ্ধ খামার
শামসুল আবেদীনের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে বগুড়া শহর এবং আশপাশে দুগ্ধ খামারে ঝুঁকেছেন অনেক খামারি। অনেকেই তাঁর কাছ থেকে নানা পরামর্শ নিচ্ছেন।
শহরের ঠনঠনিয়া এলাকায় ১২-১৫টি গাভি নিয়ে খামার শুরু করেছেন অর্ক ইসলাম। সামসুল আবেদীনের কাছে নিয়মিত পরামর্শ নিচ্ছেন তিনি। এ ছাড়া গাবতলী উপজেলার বাহাদুরপুর এলাকার মহিদুল ইসলাম, কাহালুর দেওগ্রামের হাবিল ইসলাম, গাজীপুরের এস এম জোবায়েরসহ অনেকেই তাঁর সাফল্যে দুগ্ধ খামার করে জীবনে সচ্ছলতা এনেছেন।

বগুড়া জেলা অতিরিক্ত প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা নাসরিন পারভিন প্রথম আলোকে বলেন, জেলায় প্রতি মাসে দুধের চাহিদা ৫২ হাজার ৬৫০ টন। জেলার ৫ হাজার ৮৯৪টি দুগ্ধ খামারে প্রতি মাসে উৎপাদিত হয় ৫৬ হাজার ৬৩৬ মেট্রিক টন দুধ। আবেদীন ডেইরি ফার্ম তিন দশক ধরে দুধের চাহিদার একটি অংশ জোগান দিয়ে যাচ্ছে।

স্ত্রী ও দুই মেয়ে নিয়ে সামসুল আবেদীনের সংসার। স্ত্রী শাহানারা গুলশান প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। বড় মেয়ে পড়ছেন মেডিক্যাল কলেজে, ছোট মেয়ে অষ্টম শ্রেণিতে। সামসুল আবেদীন প্রথম আলোকে বলেন, বগুড়া শহরে বর্তমানে ১০ লাখ মানুষের বসবাস। স্বপ্ন আছে ভবিষ্যতে খামার বড় করার মাধ্যমে বগুড়া শহরের প্রতিটি ঘরে ঘরে দুধ পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে প্রতিটি পরিবারকে দুধেভাতে রাখা নিশ্চিত করা।

বগুড়া সদর উপজেলা ভেটেরিনারি সার্জন মো. রায়হান প্রথম আলোকে বলেন, এ খামারের দুধের গুণগত মান ভালো হওয়ার অন্যতম কারণ এখানে গাভিকে খাওয়ানো পশুখাদ্যের মান ভালো। এ ছাড়া দুধ দোহনের পর সরাসরি বিক্রি করায় ক্রেতাদের আস্থা ও বিশ্বস্ততা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। প্রাণিসম্পদ বিভাগ সব সময় নানা সেবা দিয়ে তাঁদের সহযোগিতা করে থাকে।