তরুণ উদ্যোক্তার গরুর খামার: ২০ লাখ টাকা দিয়ে শুরু, ৩ বছরে পুঁজি দেড় কোটি
ঢাকার ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি থেকে ইলেকট্রনিকস ও টেলিকমিউকেশন কোর্সে স্নাতক এবং আহ্ছানউল্লা ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেও চাকরির পেছনে দৌড়াননি আবদুর রউফ। গ্রামে ফিরে বাড়িতে গড়ে তোলেন বাণিজ্যিক গরুর খামার। তিন বছর আগে ২০ লাখ টাকা দিয়ে শুরু করা খামারে এখন দেড় কোটি টাকার গরু রয়েছে। প্রতি মাসে ৫০ হাজারের বেশি টাকা বেতন দিচ্ছেন তিনজন কর্মচারীকে।
এবারের কোরবানি ঈদে রউফের খামারে বিক্রয় উপযোগী এঁড়ে গরু ছিল ৪৩টি। এর মধ্যে ৩০ লাখ টাকায় ১৮টি গরু বিক্রি করেছেন। ঈদের আগেই বাকি গরুগুলো বিক্রি হয়ে যাবে বলে আশাবাদী তিনি।
যশোরের শার্শা উপজেলার সদর ইউনিয়নের গাতিপাড়া গ্রামে সাড়ে তিন বিঘা জমিতে তিন বছর আগে গরু মোটাতাজাকরণের বাণিজ্যিক খামার গড়ে তোলেন রউফ। তখন তাঁর বয়স ছিল ২৭ বছর। তিন বছর ধরে কোরবানি ঈদে বিক্রির জন্য গরু প্রস্তুত করেন। এ বছরও বিক্রির জন্য ৪৩টি এঁড়ে গরু প্রস্তুত করেন। এসব গরুর প্রতিটির ওজন ২৪০ থেকে ৮০০ কেজি পর্যন্ত। ইতিমধ্যে মাঝারি আকারের ১৮টি গরু তিনি পশুর হাটে নিয়ে বিক্রি করেছেন। এসব গরুর ওজন ছিল ১৪০ কেজি থেকে ২২০ কেজির মধ্যে।
রউফ ২০২৪ সালে ঢাকা থেকে একাডেমিক লেখাপড়ার সর্বোচ্চ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি নিজের ব্যক্তিস্বাধীনতা কারও হাতে তুলে দিতে চান না। এ জন্য চাকরির জন্য কোথাও কোনো আবেদন করেননি। বাবার ইচ্ছায় তিনি গ্রামের বাড়িতে ফিরে যান। বাড়ির আঙিনায় গড়ে তোলেন গরুর খামার।
কোরবানি ঈদের আগে বিক্রির উদ্দেশ্যে প্রথম বছরে রউফ রাজশাহী থেকে ১১টি গরু কিনে মোটাতাজা করেন। প্রথম বছরেই তিনি গরু বিক্রি করে লাভবান হন। এরপর নতুন করেও আরও গরু কেনা শুরু করেন। দ্বিতীয় বছরেও তিনি কয়েক লাখ টাকা লাভ করেন। এর মধ্য থেকে ২০ লাখ টাকা দিয়ে খামার বাড়ানোর জন্য জমি কেনেন। সর্বশেষ তাঁর খামারে ৬০টি গরু ছিল। এর মধ্যে ১৮টি বিক্রি করেছেন। ৪২টি গরুর মধ্যে আটটি গাভিও রয়েছে।
গত মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা যায়, রউফ খামারে গরুর যত্ন নিচ্ছেন ও পরিচর্যার কাজ করছেন। খামারে কাজ করতে করতে তিনি উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার কাহিনি বলছিলেন।
আবদুর রউফ বলেন, ‘আমি মা–বাবার একমাত্র সন্তান। বাবা মালয়েশিয়াপ্রবাসী। বাড়িতে মা থাকেন। ইতিমধ্যে বিয়ে করেছি। তিন বছর বয়সী একটি ছেলেসন্তানও রয়েছে। মা–বাবা চেয়েছেন আমি বাড়িতে থাকি। তখন বাণিজ্যিকভাবে গরুর খামার করার পরিকল্পনা করি। ২০২৩ সাল থেকেই খামার শুরু করি। আমার খামারের বৈশিষ্ট হলো—আমি নিজেই গরুর খাবার প্রস্তুত করি। গরুর খাদ্য হিসেবে ঘাস বেশি খাওয়ানো হয়। প্রাকৃতিক খাবার বেশি ব্যবহার করায় আমার খামারের গরুর স্বাস্থ্য অন্য খামারের গরুর তুলনায় ভালো ও নিরাপদ। খামার সার্বক্ষণিক পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন রাখা হয়। খামারে কোনো দুর্গন্ধ নেই।’
রউফের খামার ইতিমধ্যে পরিদর্শন করেছেন উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা তপু কুমার সাহা। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘গরুর চেহারা দেখে গরুর স্বাস্থ্য বোঝা যায়। রউফের খামারের গরুর চেহারা দেখে মনে হয়েছে, গরুগুলোকে প্রাকৃতিক খাবার বেশি খাওয়ানো হয়। খামারটি বেশ পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন। কোনো দুর্গন্ধ নেই। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বেশ উন্নত। খামারে সুন্দর পরিবেশ।’
খামারে ঝুঁকির কথা বলতে গিয়ে উদ্যোক্তা রউফ বলেন, সার্বক্ষণিক পশু চিকিৎসক রাখতে হয়। গরুর ভাষা বুঝতে হবে। তারপরও তিন বছরে অন্তত পাঁচটি গরু মারা গেছে। আমি ১১ লাখ টাকা দিয়ে খামার শুরু করেছিলাম। পরে আরও কিছু টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে খামারে ২০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছি। এখন আমার খামারে দেড় কোটি টাকা মূল্যের গরু রয়েছে। খামার বাড়ানোর জন্য নতুন করে পাঁচ বিঘা জমি কেনা হয়েছে। এর মধ্যে তিন বিঘা জমিতে ঘাস রোপণ করা আছে। আরও ৪৪টি গরু রাখার জন্য নতুন ঘর তৈরি করা হচ্ছে। আমার স্বপ্ন খামারে ৫০০টি গরু থাকবে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর শার্শা উপজেলা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, শার্শা উপজেলায় ৫০টির মতো বাণিজ্যিক গরুর খামার রয়েছে। এর মধ্যে ১০০টি গরু রয়েছে এমন খামার রয়েছে চারটি।
আবদুর রউফ আরও বলেন, গোখাদ্য ও ওষুধের দাম প্রতিনিয়ত বাড়ছে। বছর তিনেক আগে এক কেজি গোখাদ্যের দাম ছিল ৩৭ থেকে ৪০ টাকা। এখন সেই খাবারের দাম ৫০ থেকে ৫৫ টাকা কেজি। প্রতি কেজিতে ১৩ থেকে ১৫ টাকা বেড়েছে। গোখাদ্য, ওষুধ ও ভিটামিনের দাম উদ্যোক্তাদের নাগালের মধ্যে রাখার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
গোখাদ্য ও ওষুধের দাম উদ্যোক্তাদের নাগালের মধ্যে রাখার বিষয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কোনো পদক্ষপ রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের শার্শা উপজেলা কর্মকর্তা তপু কুমার সাহা প্রথম আলোকে বলেন, ‘দানাদার খাবারের দাম বাড়ছে—এটা সত্য। এ জন্য আমার উদ্যোক্তাদের উন্নতজাতের “পাক চং” জাতের ঘাস চাষ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করছি। কাচা ঘাস বেশি খাওয়ালে গরুর স্বাস্থ্য যেমন ভালো থাকে তেমনি দানাদার খাবারের চাহিদাও কমে।’