কুলসুমার পরিবর্তে মিনুকে জেল খাটাতে ‘দেড় লাখ টাকার চুক্তি’
খুনের মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত কুলসুমা আক্তারের পরিবর্তে মিনু আক্তারকে জেল খাটাতে দেড় লাখ টাকার চুক্তি হয় দালাল চক্রের সঙ্গে। আর মিনুকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় এক মাস পর তাঁকে কারাগার থেকে বের করে আনা হবে। কুলসুমার সঙ্গে চুক্তি হয় মিনুর প্রতিবেশী স্থানীয় এক ‘সরদারের’ সঙ্গে। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী টাকা দিতে না পারায় কুলসুমার জায়গা দখল করে রাখেন নুরু কাওয়াল নামের ওই সরদার। আজ রোববার বিকেলে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট শফি উদ্দিনের আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এসব কথা বলেছেন আসামি কুলসুমা আক্তার।
দুই দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আদালতে হাজির করা হলে কুলসুমা জবানবন্দি দেন। তাঁর সহযোগী অপর দুই আসামি মর্জিনা আক্তার ও নুরু কাওয়ালকে রিমান্ড শেষে আদালতে হাজির করা হলে তাঁরা জবানবন্দি দেননি। পরে তাঁদের কারাগারে পাঠিয়ে দেন আদালত।
এদিকে মিনুকে জেলে পাঠানোর ঘটনায় গতকাল শনিবার শাহাদাত হোসেন নামের আরেক আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তিনি নুরু কাওয়ালের সহযোগী। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে রিমান্ডের আবেদন করা হলে একই আদালত আজ তাঁর এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম নগরের পতেঙ্গা এলাকা থেকে কুলসুমাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। একই দিন মর্জিনা আক্তারকে ইপিজেড থেকে এবং পরদিন শুক্রবার সীতাকুণ্ড ছিন্নমূল এলাকা থেকে নুরু কাওয়ালকে গ্রেপ্তার করা হয়।
আদালত সূত্র জানায়, জবানবন্দিতে কুলসুমা বলেন, খুনের মামলায় তাঁর যাবজ্জীবন সাজা হলে পূর্বপরিচিত মর্জিনা আক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন কুলসুমা। মর্জিনা তাঁকে সীতাকুণ্ড ছিন্নমূল এলাকার সরদার শাহাদাত হোসেনের সহযোগী নুরু কাওয়ালের কাছে নিয়ে যান। নুরু কাওয়াল তাঁদের শাহাদাতের কাছ নিয়ে যান।
শাহাদাত তাঁদের বলেন, দেড় লাখ টাকা দিলে কুলসুমার পরিবর্তে আরেকজন জেল খাটবেন। এতে রাজি হন কুলসুমা। পরে শাহাদাত, নুরু কাওয়াল ও মর্জিনা আক্তার মিলে ছিন্নমূল এলাকার ভিক্ষুক স্বামীহারা মিনু আক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাঁরা তাঁকে আশ্বস্ত করেন যে এক মাসের বেশি জেলে থাকতে হবে না। তাঁরা মিনুকে ছাড়িয়ে আনবেন। বিনিময়ে মিনুকে কিছু টাকাও দেবেন। সন্তানদের ভরণপোষণের জন্য দরিদ্র মিনু রাজি হয়ে যান। কথামতো ঘটনার দিন মিনুকে আদালতে নিয়ে আসেন শাহাদাত ও মর্জিনা আক্তার। তাঁদের শেখানো মতে মিনু নিজেকে কুলসুমা পরিচয় দেন। পরে মিনুকে কারাগারে পাঠানো হয়।
জবানবন্দিতে কুলসুমা আরও বলেন, শাহাদাত ও নুরু কাওয়ালকে কথামতো দেড় লাখ দিতে দেরি হওয়ায় তাঁরা ছিন্নমূল এলাকায় থাকা মর্জিনা ও কুলসুমার প্লট দখল করে রাখেন। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়ভাবে কয়েকবার সালিস বৈঠকও হয়। পরে বিষয়টি জানাজানি হয়ে যাওয়ায় নগরের রহমতগঞ্জের বাসা ছেড়ে পতেঙ্গা এলাকায় আত্মগোপন করেন কুলসুমা।
‘সাজা কুলসুমার, খাটছেন মিনু’ শিরোনামে গত ২৩ মার্চ প্রথম আলোয় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটি প্রকাশের দিনই চট্টগ্রামের চতুর্থ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মামলাটি হাইকোর্টে বিচারাধীন আছে বলে উচ্চ আদালতে প্রতিবেদন পাঠান। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রকৃত আসামি কুলসুমা আক্তারের পরিবর্তে আরেক আসামি মিনু আক্তার সাজা ভোগ করছেন। পরে উচ্চ আদালতের নির্দেশে গত ১৬ জুন চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান মিনু।
কারামুক্তির ১৩ দিনের মাথায় দুর্ঘটনায় আহত হয়ে পৃথিবী ছেড়ে যান তিনি। ২৮ জুন দিবাগত রাতে চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী ফৌজদারহাট সংযোগ সড়কের আরেফিন নগর এলাকায় দ্রুতগতির একটি ট্রাক মিনুকে চাপা দিয়ে পালিয়ে যায়।
ট্রাকচাপায় গুরুতর আহত হন তিনি। খবর পেয়ে তাঁকে উদ্ধার করে পুলিশ। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাঁকে ভর্তি করা হয়। সেখানে ২৯ জুন ভোরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। কোনো পরিচয় না পাওয়ায় এক দিন পরে অজ্ঞাতনামা হিসেবে তাঁর লাশ দাফন করে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম। পরে মিনুর ভাই রুবেল হোসেন ছবি দেখে বোনের পরিচয় নিশ্চিত করেন।
পুলিশ সূত্র জানায়, মুঠোফোন নিয়ে কথা-কাটাকাটির জেরে ২০০৬ সালের ৯ জুলাই চট্টগ্রাম নগরের রহমতগঞ্জ এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় পোশাককর্মী কোহিনুর বেগমকে হত্যা করা হয়। ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর এই মামলার রায়ে কুলসুমাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আদালত। প্রকৃত আসামি কুলসুমা আক্তার মামলায় সাজা হওয়ার আগে ২০০৭ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত কারাগারে ছিলেন। সাজা হওয়ার পর ২০১৮ সালের ১২ জুন কুলসুমা সেজে মিনু কারাগারে আসেন। পরে কুলসুমা উচ্চ আদালতে জামিনের আবেদন করেন।
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের জ্যেষ্ঠ তত্ত্বাবধায়ক মো. শফিকুল ইসলাম খান জানান, কারা রেজিস্টারে থাকা দুজনের ছবির মিল ছিল না। বিষয়টি নজরে আসার পর লিখিতভাবে আদালতকে জানানো হয়। পরে তিনি মুক্তি পান।
মুক্তির পর মিনু প্রথম আলোকে বলেছিলেন, মর্জিনা আক্তার নামের পূর্বপরিচিত এক নারী তাঁকে টাকা দেওয়ার কথা বলে কারাগারে যেতে বলেন। তিনি কুলসুমাকে চিনতেন না। কিন্তু ভয়ে কাউকে কিছু বলেননি।
কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নেজাম উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, দেড় লাখ টাকার বিনিময়ে একটি চক্রের সাহায্য কুলসুমা যাবজ্জীবন সাজা না খেটে মিনু নামের এক অসহায় নারীকে খাটান। ইতিমধ্যে চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জড়িত বাকি ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।