বানভাসিদের আশ্রয়স্থল আরমানের পাঁচতলা বাড়ি

বন্যায় নিরাপদ আশ্রয় খোঁজা মানুষদের জন্য বাড়িটি উন্মুক্ত করে দিয়েছেন এক তরুণ। মঙ্গলবার সুনামগঞ্জ শহরের উপত্যকা এলাকায়
ছবি: প্রথম আলো

পাঁচতলা বিশাল বাড়িটির নির্মাণকাজ শেষে সবে রং করা হয়েছে। ভেতরে টাইলস, দরজা-জানালার কাজও শেষ। শুধু বিদ্যুৎ–সংযোগ দেওয়া বাকি। সুনামগঞ্জ শহরে বন্যায় নিরাপদ আশ্রয় খোঁজা মানুষদের জন্য বাড়িটি উন্মুক্ত করে দিয়েছেন আবু গওহর মোহাম্মদ আরমান (৩০) নামের এক তরুণ।

আরমানের বাড়িতে গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে ৩০টি পরিবারের অন্তত ২০০ মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। শুধু আরমান একা নন, শহরের এমন অনেকেই বানভাসি মানুষকে নিজেদের ঘরে আশ্রয়ের পাশাপাশি খাবার দিয়েছেন। বানভাসি অনেকে এখনো এসব বাড়িতে অবস্থান করছে।

আজ মঙ্গলবার শহরের উপত্যকা এলাকায় আরমানের বাড়িতে গিয়ে ১৫ থেকে ২০টি পরিবারকে পাওয়া যায়। একেকটি কক্ষে দুই থেকে তিনটি পরিবারের লোকজন ভাগাভাগি করে আছে। মিলেমিশে খাবার খাচ্ছে।

আরমান জানালেন, তাঁর পরিবারের সদস্যরা যুক্তরাজ্যে থাকেন। তিনিও সেখানে ছিলেন। ঘরের কাজ শেষ হওয়ায় তা দেখতে সম্প্রতি দেশে এসেছেন। তিনি থাকছেন হাসননগর এলাকায় নিজেদের পুরোনো বাড়িতে।

বৃহস্পতিবার বন্যার পানিতে যখন সুনামগঞ্জ শহর ভেসে যায়, তখন রাতে ঘরের কাজে থাকা এক শ্রমিক আরমানকে মুঠোফোনে জানান, দরজায় অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে আছে, আশ্রয় চাইছে। আরমান তখন আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য দরজা খুলে দিতে বলেন। এ সময় ১০টির মতো পরিবার তাঁর বাড়িতে আশ্রয় নেয়। বাকি পরিবারগুলো আসে গত শুক্রবার। বাড়িটিতে গ্যাসের সিলিন্ডারের মাধ্যমে রান্নার ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

আরমানের ভবনে আশ্রয় নেওয়া হাসননগর এলাকার বাসিন্দা বাদশা মিয়া (৪৫) বলেন, ‘বউ-বাচ্চা নিয়া কোথাও যাওয়ার জায়গা পাচ্ছিলাম না। পরে এই ঘরে উঠতে পেরে জানটা বাঁচছে।’

মরাটিলা এলাকার বাসিন্দা ও রিকশাচালক রহিবুল মিয়া বলেন, ঘর যখন পানিতে ডুবে যায়, তখন উঁচু এই ভবনের কথা তাঁর মনে পড়ে। রাতের অন্ধকারে ঝড়–বৃষ্টি মাথায় নিয়ে এখানে এসে ওঠেন।

আবু গওহর মোহাম্মদ আরমান বলেন, ‘লন্ডনে থেকে আব্বা-আম্মা আমার জন্য চিন্তায় ছিলেন। পরে যখন যোগাযোগ হয় আর বিষয়টি তাঁদের জানাই, তখন তাঁরা খুশি হয়েছেন। বিপদের সময় মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়াবে, এটাই তো স্বাভাবিক।’

সুনামগঞ্জ সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সদস্য রাজু আহমেদ বলেন, এবারের বন্যায় এমন অনেক মানবিক কাজ দেখা গেছে। মানুষ মানুষকে উদ্ধার করেছেন, আশ্রয় দিয়েছেন, খাবার দিচ্ছেন, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করছেন। সবার চেষ্টা না থাকলে পরিস্থিতি আরও ভয়ানক হতো।

সুনামগঞ্জে গত মাসের ১৩ তারিখ প্রথম দফা বন্যা হয়। মানুষ এই বন্যার ধকল কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই ১০ জুন থেকে আবার শুরু হয় ভারী বৃষ্টি। একই সঙ্গে ভারতের মেঘালয় ও চেরাপুঞ্জি থেকে নেমে আসে পাহাড়ি ঢল। ১৩ জুন থেকে আবার বন্যাকবলিত হয়ে পড়ে জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলাগুলো। ১৫ মে ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলা প্লাবিত হয়। ১৬ জুন পানি প্রবেশ করে সুনামগঞ্জ পৌর শহরে। দুপুর থেকে শুরু হয় তুমুল বৃষ্টি। রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে সঙ্গে পুরো শহর প্লাবিত হয়ে যায়। এখন পানি কিছুটা কমেছে। শহর থেকেও পানি নামছে। তাতে স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে মানুষের মনে।