লোকালয়ে বন্য প্রাণী, এক মাসে মারা পড়ল চারটি

এখন বন্য প্রাণী ধরা পড়লে কেউ মেরে ফেলছেন না। প্রশাসন বা বন বিভাগকে খবর দিচ্ছেন। এটা ইতিবাচক দিক।

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলা থেকে এক মাসে ১৩টি বিভিন্ন প্রজাতির বন্য প্রাণী উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে চারটি মারা গেছে। যেগুলো প্রাণে রক্ষা পাচ্ছে, সেগুলো উদ্ধার করে বনে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। বন বিভাগের বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ এবং মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে অবস্থিত বাংলাদেশ বন্য প্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন সূত্রে এ তথ্য জানা যায়।

বন্য প্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব বলেন, এত ঘন ঘন বিভিন্ন প্রাণী মানুষের হাতে ধরা পড়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে, বন্য প্রাণীর আবাসস্থল নষ্ট হয়ে গেছে। ঝোপঝাড় কমে যাওয়া, আবাসস্থল নষ্ট হওয়া—এসব কারণে তাদের খাদ্যসংকটও বেড়েছে। যে কারণে প্রাণীগুলো খাদ্যের খোঁজে গ্রামাঞ্চলের ঘরবাড়িতে ছুটে আসছে এবং নানাভাবে ধরা পড়ছে।

সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, চলতি বছরের জুলাই মাসে শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন স্থান থেকে ১৩টি জীবিত ও মৃত বন্য প্রাণী উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে আছে গুইসাপ, লজ্জাবতী ও বাদামি বানর, মেছো বাঘ, দাঁড়াশ, খৈয়া গোখরাসহ বিভিন্ন প্রজাতির সাপ। লোকালয়ে আসা একটি লজ্জাবতী ও একটি বাদামি বানর এবং দুটি সাপ মারা গেছে। বাংলাদেশ বন্য প্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন, বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ এবং স্ট্যান্ড ফর আওয়ার এনডেঞ্জার্ড ওয়াইল্ডলাইফ টিম (সিউ) একক ও সম্মিলিতভাবে প্রাণীগুলোকে উদ্ধার করেছে।

স্থানীয় ব্যক্তিরা জানান, গত ২৯ জুলাই শ্রীমঙ্গলের রাজাপুর গ্রামের জসিম উদ্দিনের বাড়ি থেকে একটি গুইসাপ উদ্ধার করা হয়। স্থানীয় ব্যক্তিদের ধারণা, গুইসাপটি খাবারের খোঁজে এসে বাড়ির লোকজনের হাতে ধরা পড়ে। ২৭ জুলাই শ্রীমঙ্গলের নয়াগাঁও-আখতারপাড়া গ্রামের সুরুজ মিয়ার সবজিখেতের জালে একটি দাঁড়াশ সাপ আটকা পড়ে। স্থানীয়ভাবে খবর পেয়ে পরে সাপটিকে উদ্ধার করা হয়েছে। ২৪ জুলাই শ্রীমঙ্গল শহরের ভিক্টোরিয়া উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে বিদ্যুতের তারে স্পৃষ্ট হয়ে একটি বাদামি বানর মারা গেছে। বানরটি দলছুট হয়ে শহরের মধ্যে চলে এসেছিল।

২৩ জুলাই শ্রীমঙ্গলের ডলুবাড়ি এলাকার একটি প্রসাধনীর দোকান থেকে একটি দাঁড়াশ সাপ উদ্ধার করা হয়েছে। সাপটি দোকানের মধ্যে একটি বাক্সে ঠাঁই নিয়েছিল। ১৮ জুলাই জেরিন চা-বাগানের বিষামনি এলাকার একটি বাড়ি থেকে বিভিন্ন জাতের পাঁচটি সাপ উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে একটি খৈয়া গোখরা ও একটি কিং কোবরা মৃত ছিল। জীবিত তিনটি সাপের মধ্যে ছিল দুটি দাঁড়াশ ও একটি কালনাগিনী।

এর আগে ১৭ জুলাই শ্রীমঙ্গলের নোয়াগাঁওয়ের ধানখেত থেকে অসুস্থ অবস্থায় একটি মেছো বাঘ উদ্ধার করা হয়েছে। মেছো বাঘটি কোমরে আঘাত পেয়েছিল। উদ্ধারকারীদের ধারণা, মেছো বাঘটির কোমরে কেউ লাঠি দিয়ে আঘাত করেছে। নতুবা সড়ক পার হওয়ার সময় গাড়ির চাকায় আঘাত লেগেছে। পরে মেছো বাঘটিকে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে তোলা হয়। ১৪ জুলাই কমলগঞ্জ উপজেলার তিলকপুর গ্রামের পদ্মমোহন সিংহের বাড়ি থেকে ১৫টি ডিমসহ একটি খৈয়া গোখরা সাপ উদ্ধার করা হয়েছে।

* বিধিনিষেধের কারণে বনের ভেতর মানুষের আনাগোনা নেই। প্রাণীরা সড়কের কাছে চলে আসছে। * খাদ্যের অভাবেও কিছু প্রাণী বন থেকে বেরিয়ে আসতে পারে।

৫ জুলাই শ্রীমঙ্গল উপজেলার আশ্রিদ্রোন এলাকা থেকে একটি বিপন্ন প্রজাতির লজ্জাবতী বানর উদ্ধার করা হয়। বানরটি বিদ্যুতের তারে স্পৃষ্ট হয়ে আহত হয়। লজ্জাবতী বানরটির চিকিৎসা করা হলেও বাঁচানো যায়নি। উদ্ধার করা প্রাণীগুলোর মধ্যে যেগুলো বেঁচে ছিল, সেগুলো লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে অবমুক্ত করা হয়েছে।

স্বপন দেব বলেন, ‘একটা ভালো দিক হচ্ছে, এখন বন্য প্রাণী ধরা পড়লেই কেউ মেরে ফেলছেন না, আমাদের খবর দিচ্ছেন। মানুষের মধ্যে বন্য প্রাণী সম্পর্কে সচেতনতা বেড়েছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীরাই আমাদের তথ্য দিচ্ছেন বেশি।’

বন বিভাগের শ্রীমঙ্গলের সহকারী বন সংরক্ষক শ্যামল কুমার মিত্র বলেন, এখন বিধিনিষেধের কারণে বনের ভেতর মানুষের আনাগোনা নেই। সড়ক দিয়ে বড় গাড়িও যাচ্ছে না। এ কারণে লাউয়াছড়া ও সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের প্রাণীরা সড়কের একদম কাছে চলে আসছে। কোনো কোনোটি লোকালয়ের দিকেও চলে আসছে। এই তিন মাস (জুন-আগস্ট) বন্য প্রাণীদের প্রজনন মৌসুম। এরা এ সময়ে এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করে। মাঝেমধ্যে একটু বাইরের দিকেও চলে আসে। এ ছাড়া খাদ্যের অভাবের কারণেও কিছু প্রাণী বন থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। তাঁরা খবর পেলেই সেগুলো উদ্ধারের জন্য ছুটে যাচ্ছেন।