সুনামগঞ্জে ত্রাণ কার্যক্রমে সমন্বয় ও তদারকি বাড়ানোর তাগিদ
সুনামগঞ্জে বন্যার্তদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমে সরকারি–বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বয় এবং তদারকি বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার মানুষ।
আজ রোববার দুপুরে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন আয়োজিত জেলার সামগ্রিক বন্যা পরিস্থিতি ও ত্রাণ কার্যক্রম নিয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে বিশেষ সমন্বয় সভায় এই আহ্বান জানানো হয়। জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে এই সভা হয়।
সভায় বক্তারা বলেন, বেসরকারিভাবে অনেকেই সুনামগঞ্জের বন্যার্তদের মধ্যে বিতরণের জন্য ত্রাণ নিয়ে আসছেন। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, কেবল শহর কিংবা শহরতলির সুবিধাজনক স্থানে তাঁরা ত্রাণ বিতরণ করছেন বেশি। এতে একই ব্যক্তি একাধিবার ত্রাণ পাচ্ছেন। জেলার দুর্গম হাওর এলাকায় ত্রাণ পৌঁছাচ্ছে কম। অথচ গ্রামের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত বেশি। তাই ত্রাণ কার্যক্রমে সবার সমন্বয় ও তদারকি বাড়ানো জরুরি।
সভার সভাপতি জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, এখন থেকে বেসরকারিভাবে জেলা কিংবা জেলার বাইরে থেকে যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ত্রাণ নিয়ে আসছেন, তাঁরা আর তাঁদের ইচ্ছামতো স্থানে ত্রাণ বিতরণ করতে পারবেন না। এ জন্য শুক্রবার থেকে জেলার শান্তিগঞ্জ উপজেলায় সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কে বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেখানে প্রশাসনের দুজন কর্মকর্তা ও পুলিশ দায়িত্ব পালন করছেন। ত্রাণ নিয়ে আসা লোকজনকে সেখানে আগে নিবন্ধন করতে হবে। এরপর সেখান থেকেই নির্ধারণ করে দেওয়া হচ্ছে তাঁরা কোথায়, কোন উপজেলায় ত্রাণ বিতরণ করবেন। স্থানীয়ভাবেও এই ত্রাণ নির্ধারিত স্থানে যাচ্ছে কি না সেটি দেখভাল করা হবে।
সভায় জেলা শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক মো. শামসুল আবেদীন বলেন, ‘সুনামগঞ্জে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারিভাবে প্রচুর ত্রাণসামগ্রী নিয়ে আসছেন লোকজন। আমরা চাই প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা এই সহায়তা পাক। এ জন্য ত্রাণ কার্যক্রমে কঠোর তদারকি ও সমন্বয় প্রয়োজন।’
জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এনামুল কবির বলেন, ‘কেউ কেউ এসে দেখছি কিছু ত্রাণ নিয়ে ছবি তুলে হাওরে ঘুরছেন। এটা ঠিক নয়। এটি আমাদের কষ্ট দেয়। চেষ্টা করা উচিত দুর্গম হাওর এলাকায় যাওয়া। যাঁরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত তাঁদের পাশে দাঁড়ানো।’
সুনামগঞ্জের সব উপজেলাই কমবেশি বন্যাকবলিত। সরকারি হিসাবে বন্যায় ৯০ হাজার পরিবারের সাড়ে চার লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অসংখ্য বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ ক্ষয়ক্ষতির চিত্র পেতে আরও কয়েক দিন সময় লাগবে। জেলা প্রশাসক ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘরের তালিকা করতে উপজেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন।
সভায় জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় জেলার সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে। জেলায় ত্রাণ তৎপরতা অব্যাহত আছে। সপ্তাহখানেক পর থেকে পুনর্বাসন কাজ শুরু করা হবে।
সভায় বক্তব্য দেন সুনামগঞ্জের সিভিল সার্জন মো. আহম্মদ হোসেন, স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক মোহাম্মদ জাকির হোসেন, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহবুব আলম, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) অসীম কুমার বণিক, সুনামগঞ্জ পৌরসভার মেয়র নাদের বখত, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সুমন মিয়া, তাহিরপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান করুনা সিন্ধু চৌধুরী, শাল্লা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আল আমিন চৌধুরী, ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মামুনুর রহমান, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাদি উর রহিম জাদিদ, জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিশ্বজিত দেব, জেলা শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক মো. শামসুল আবেদীন প্রমুখ।
১৬ জুন সুনামগঞ্জে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। জেলার প্রতিটি উপজেলা বন্যাকবলিত হয়ে পড়ে। অসংখ্য বাড়িঘর, অফিস-আদালত, সরকারি–বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট বন্যার পানিতে তলিয়ে যায়। সুনামগঞ্জ টানা চার দিন সারা দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। এ সময় মুঠোফোনের নেটওয়ার্ক ছিল বন্ধ। সুনামগঞ্জ পৌর শহরে চার থেকে সাত ফুট পানি হয়। হাজারো মানুষ আশ্রয় নেন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা ও আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে।
পাঁচ দিন ধরে বৃষ্টি না হওয়ায় এখন পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। মানুষের বাড়িঘর, রাস্তাঘাট থেকে পানি নামছে। তবে এখনো অনেক আশ্রয়কেন্দ্রে শ্রমজীবী মানুষ আছেন। অনেকেই বাড়ি ফিরেছেন, আবার যাঁদের বাড়িঘরের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, তাঁরা ফিরতে পারছেন না। সরকারি হিসাবেই জেলার সাড়ে চার লাখ মানুষ বন্যায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বন্যায় মারা গেছেন ১৫ জন।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, জেলায় এ পর্যন্ত ১ হাজার ১৫৬ মেট্রিক টন চাল, ১ কোটি ৮৫ লাখ নগদ টাকা, ১৯ হাজার খাবারের প্যাকেট, সাড়ে ১৪ কেজি ওজনের শুকনো খাবারের ২৩ হাজার বস্তা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৭৬৩ মেট্রিক টন চাল, নগদ ১ কোটি ২৮ লাখ টাকা, ১৭ হাজার প্যাকেট খাবার, ১৭ হাজার সাড়ে ১৪ কেজির খাবারের বস্তা বিতরণ করা হয়েছে। এখনো মজুত আছে ৩৯২ মেট্রিক টন চাল ও নগদ ৪৪ লাখ টাকা। এ ছাড়া অগ্রণী ব্যাংক বিতরণের জন্য জেলা প্রশাসনকে পাঁচ লাখ, রাঙামাটি জেলা প্রশাসন দুই লাখ টাকা এবং আরও বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ৮০ হাজার টাকা দিয়েছেন।