পাহাড়ের মাকড়সাশিকারি

হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের মান্দারগাছে স্ট্রিকড স্পাইডার হান্টার
ছবি: লেখক

টানা দুদিন টাঙ্গুয়ার হাওর ঘুরে তিনটি নতুন পাখির ছবি তুলে গত ১৩ ফেব্রুয়ারি দুপুরে হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের ভেতরে ঢুকি। বড় পুকুর, ছোট পুকুর ও মান্দারগাছের টাওয়ার—তিন জায়গায় পালা করে বসে তিন দিনে মাত্র একটি নতুন পাখির ছবি তুলতে পারলাম।

শেষ দিন সূর্য ওঠার আগে আবার আস্তানা গাড়লাম মান্দারগাছের টাওয়ারে। কিন্তু পাক্কা দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করেও নতুন কোনো পাখির দেখা পেলাম না। ঘুরেফিরে পুরোনোগুলোরই আনাগোনা। ভোরে যখন টাওয়ারে উঠি, তখন আমরা মাত্র দুজন পক্ষী আলোকচিত্রী ছিলাম, কিন্তু ইতিমধ্যে টাওয়ারে এসেছেন ১০ থেকে ১২ জন।

নতুন পাখি না পেয়ে ক্যামেরা হাতে অলস ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইলাম। এমন সময় হঠাৎ পক্ষী আলোকচিত্রী আবু সাইয়েদ মোহাম্মদ সরওয়ারের সংকেত পেয়ে মান্দারগাছের দিকে তাকাই। মান্দারের কাঁটায় চোখ যেন আটকে গেল। এ কী দেখছি আমি! পাহাড়ের এই মাকড়সাশিকারিকে কত দিন ধরেই না খুঁজছি। আর সেটি এখন আমার এত কাছে!

তবে মান্দার ফুলের রসে জিব ভেজানোর আগেই পাখির রাজা ফিঙের তাড়া খেয়ে খুদে পাখিটিকে পালিয়ে বাঁচতে হলো। মাত্র ১২ সেকেন্ড সময় পেলাম, ১২টি ক্লিক করলাম। ১ মিনিট ২৪ সেকেন্ড পর পাখিটি আবার এল; কিন্তু মাত্র ৬ সেকেন্ডের মাথায় এক সিপাহি বুলবুলির তাড়া খেয়ে আবার সেটি পালাল।

এই ৬ সেকেন্ডে আরও ১২টি ক্লিক করতে পারলাম। তবে ছবি তুলতে পারলেও পাহাড়ের এই মাকড়সাশিকারির শিকারকৌশল দেখার সৌভাগ্য হলো না। বেচারা মান্দার ফুলের রসও পান করতে পারল না। ঠিক বুঝলাম না, এই ক্ষুদ্র পাখিটির প্রতি সবার এত আক্রোশ কেন?

তলোয়ারের মতো বাঁকা চঞ্চুর ক্ষুদ্র পাখিটি বেশ সুদর্শন। এ পাখির মাথাসহ দেহের ওপরের পালকের রং গাঢ় হলদে জলপাই। দেহের নিচটা হলদে সাদা। মাথা, পিঠ ও বুকে মোটা অসংখ্য কালো ডোরা রয়েছে। ডানায় ডোরা নেই। খাটো লেজের আগা পীতাভ; তাতে রয়েছে কালো বন্ধনী। চঞ্চু কালো। চোখ বাদামি। পা, পায়ের পাতা ও আঙুলের রং কমলা। স্ত্রী-পুরুষ পাখি দেখতে একই রকম। ১৭ সেন্টিমিটার লম্বা পাখিটির ওজন মাত্র ২৯ গ্রাম।

চট্টগ্রাম বিভাগের মিশ্র চিরসবুজ পাহাড়ি বনের বাসিন্দাটিকে মাঝেমধ্যে সিলেট বিভাগের বনাঞ্চলেও দেখা যায়। পাহাড়ি বন ছাড়াও পাহাড়সংলগ্ন কলাবাগান, আবাদি জমি ও বাগানেও দেখা যায়। দিবাচর পাখিগুলো সচরাচর একাকী বা জোড়ায় থাকে।

মাকড়সা, পোকামাকড়, বুনো কলার মধুরেণুসহ অন্যান্য ফুলের রস পান করে ফুলের পরাগায়নে সাহায্য করে। বেশ আকর্ষণীয়ভাবে ঢেউ খেলানোর মতো করে ওড়ে।

মার্চ থেকে জুলাই এ পাখির প্রজনন মৌসুম।

তলোয়ার চঞ্চুর সুদর্শন পাখিটি এ দেশের দুর্লভ আবাসিক পাখি। ইংরেজি নাম ‘স্ট্রিক্ড স্পাইডার হান্টার’। বাংলায় এখনো জুতসই নাম পাওয়া যায়নি।

আ ন ম আমিনুর রহমান, পাখি ও বন্য প্রাণী চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ